শিশুর সেবায় ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার

  কেয়া আমান

২৪ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ০০:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’- অপরিণত ও কম ওজনে জন্ম নেওয়া নবজাতককে বাঁচাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যা এখন সারাবিশ্বেই জনপ্রিয়। বাংলাদেশ সরকারও এ ব্যাপারে জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। যার আওতায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ পদ্ধতিতে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার হলো পূর্ণ সময়ের আগে (৩৭ সপ্তাহের আগে) ও স্বল্প ওজন (আড়াই কেজির কম) নিয়ে জন্ম নেওয়া কিংবা শারীরিকভাবে দুর্বল নবজাতককে মায়ের বুকের ওপর চামড়ার সঙ্গে মিশিয়ে রেখে সুস্থ করে তোলার একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে মায়ের দুই স্তনের ত্বকের সঙ্গে শিশুটির ত্বকের সংস্পর্শ ঘটাতে হয়। অর্থাৎ ক্যাঙ্গারু যেভাবে পেটের থলিতে শাবককে আগলে রেখে প্রাণ বাঁচায়, তেমনি কম ওজন ও অপরিণত নবজাতককে মা তার বুকে আগলে রেখে সুস্থ করে তোলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশে বছরে ৩১ লাখ শিশু জন্ম নেয়। এর মধ্যে ৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কম ওজন ও অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়। যার মধ্যে ৩১ হাজার ৫শ শিশু প্রতিবছর মারা যায়। কম ওজন ও অপরিণত নবজাতকের শরীরের তাপমাত্রা কম থাকাই এই মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এ ধরনের অপরিণত ও স্বল্প ওজনের নবজাতককে সুস্থ করে তোলার বিজ্ঞানসম্মত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার। ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতিতে মা নবজাতককে বুকে জড়িয়ে রাখায় মায়ের শরীরের তাপমাত্রা নবজাতকের শরীরে প্রবাহিত হয়। ফলে শিশু মায়ের দেহের তাপেই গরম অনুভব করে। পর্যাপ্ত তাপ পাওয়ায় ধীরে ধীরে শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। এ পদ্ধতিতে নবজাতক মায়ের শরীরের তাপমাত্রা ব্যবহার করে বলে শিশুর নিজ দেহের চর্বি ব্যবহৃত হয় না ; এতে শিশুর দেহের ক্যালোরি সংরক্ষিত হয়, ফলে ওজন দ্রুত বাড়ে।

নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি কমাতে কলম্বিয়ার চিকিৎসক ‘নাথালি চারপাক’ ১৯৭৮ সালে প্রচলন করেন ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার বা কেএমসি পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে ৩০-৪০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, সুইডেন, ভারত, ব্রাজিলসহ পুরো বিশ্বে নবজাতকের মৃত্যুহার অনেক কমে গেছে। বিশ্বের উন্নয়নশীল ১৫টি দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতিতে ইনকিউবেটরের চেয়েও শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।

আমাদের দেশে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) উদ্যোগে মতলব হাসপাতালে এই পদ্ধতি চালু করা হয়। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বারডেম জেনারেল হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা ও উপজেলায় মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অপরিণত শিশুকে মাদার কেয়ার পদ্ধতি প্রয়োগে বেশ সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু প্রচারণার অভাবে এটি মানুষের কাছে তেমন পরিচিত নয়।

স্বল্প ওজন এবং অপরিণত নবজাতককে ইনকিউবেটরে রাখলেও শিশু অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে ইনকিউবেটরের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া ইনকিউবেটরেও পর্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। বারডেম হাসপাতালের গাইনি রোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক ডা. শামসাদ জাহান শেলী বলেন, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতির কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এ পদ্ধতি ইনকিউবেটরের চেয়েও অধিক কার্যকর। ক্যাঙ্গারু কেয়ার পদ্ধতিতে মায়ের স্তনের কাছাকাছি শিশুকে রাখা হয় বলে তা মাতৃদুগ্ধ উৎপাদনে সহায়তা করে। হৃৎপি- স্বাভাবিক গতি ফিরে পায়। ফলে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। এ পদ্ধতিতে শিশুর মস্তিষ্ক দ্রুত বিকাশ ঘটে, মা ও শিশুর বন্ধন দৃঢ় হয়, শিশু পরিবেশের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতাল থেকে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার শুরু করতে হবে এবং প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ ঘণ্টা শিশুকে বুকের সঙ্গে লাগিয়ে রাখতে হবে। মেডিক্যাল চিকিৎসা যেমন, শিরায় স্যালাইন বা অক্সিজেন গ্রহণরত অবস্থায়ও এই পদ্ধতি চলতে পারে।

এ জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন হয় না বলে কোনো খরচও হয় না। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা নার্স মাকে নিজের শরীরের তাপমাত্রায় সন্তানকে রাখার সঠিক পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। তাই অপরিণত ও কম ওজনে জন্ম নেওয়া শিশুকে এখন মায়েরা নিশ্চিন্তে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে পারেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে