বিশ্বে প্রতি তিন নারীর মধ্যে একজন শারীরিক মানসিকসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন

  আঞ্জুমান আরা

০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ পক্ষ’ পালন করা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্যÑ ‘অরেঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড : হ্যাশট্যাগ হেয়ার মি টু’। জানাচ্ছেনÑ আঞ্জুমান আরা

নারীর ওপর সহিংসতা শুরুর নির্দিষ্ট দিন-তারিখ না থাকলেও এই সহিংসতা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানবজাতির জন্যই একটি অমর্যাদাকর ও অবমাননাকর জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর মাত্রা অনেক বেশি। এখনো বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন শারীরিক, মানসিকসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এসব সহিংসতার বিরুদ্ধে কেউ তেমনভাবে প্রতিবাদ করে না। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ শুধু নারী ও মেয়েদের কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্যও জরুরি। এই বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২৫ নভেম্বর নারীর প্রতি সহিংসতা অবসানে আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণা করেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১৬ দিনব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মতৎপরতা শুরু হয় এবং শেষ হয় ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসে। প্রতিবছরের মতো এবারও ২৫ নভেম্বর থেকে এই প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ১৬ দিনব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা বিরোধ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘অরেঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড : হ্যাশট্যাগ হেয়ার মি টু’। প্রতিপাদ্যটি গত বছরে নারীর অধিকার আদায়ের জন্য উত্থাপিত মি টু আন্দোলনের ধারাবাহিকতার অংশ। মি টু আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সাহসী নারীরাও জানান দিচ্ছেন তাদের দুঃখের কথা, এগিয়ে আসছেন তাদের হয়রানি ও সহিংসতার গল্প নিয়ে।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসর এই একুশ শতকে এসেও নারীর প্রতি সহিংসতার অবসান ঘটেনি। এটা আমাদের জন্য বিরাট গ্লানির বিষয়। শুধু তা-ই নয়, নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধও বটে। এসব অপরাধের বিচার করার উদ্দেশ্যে দেশে দেশে কঠোর আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নারীর প্রতি সহিংসত আচরণের অবসান ঘটছে না। বরং বেড়েই চলেছে।

বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবছর স্বামী বা প্রেমিকের হাতেই গড়ে ৩০ হাজার নারী খুন হন। আর পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হন প্রায় ২০ হাজার নারী। এ হিসেবে বিশ্বে দৈনিক গড়ে ১৩৭ (প্রতি ঘণ্টায় ৬ জন) নারী স্বামী, প্রেমিক বা পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হন। গত ২৫ নভেম্বর জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদও নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন চিত্র নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে। ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদ পরিচালিত ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র ২০১৮’ শীর্ষক এই সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৬৫ জন নারী, যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১১৫ জন নারী ও শিশু এবং শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন ৫৫ জন নারী। এ ছাড়া উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন ১৪০ জন নারী এবং উত্ত্যক্তের শিকার হওয়ার কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন নারী। আর পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৬০ জন নারী।

নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম। তিনি বলেন, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমাদের সমাজে নারীকে ছোট করে দেখা হয়। যে কারণে নারী নির্যাতন বাড়ছে। এ ছাড়া নারীবান্ধব অবকাঠামোর অভাব, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রক্রিয়া ও ব্যয়বহুলতার কারণেও নারী নির্যাতন ও সহিংসতা বাড়ছে।

তাই নারী ও শিশুর প্রতি জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাকে কেবল নারীর ইস্যু বলে ভাবলে চলবে না। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এটিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে নারী-পুরুষ-দলমত নির্বিশেষে ব্যক্তিপর্যায় থেকে বৈশ্বিক পর্যায় পর্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রত্যেকে যদি আন্তরিকভাবে প্রতিজ্ঞা করেন যে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাকে ‘না’ বলবেন, তা হলে একদিন অবশ্যই নারী ও শিশুর জন্য এই পৃথিবী নিরাপদ হবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে