নারীর জন্য কেমন ছিল ২০১৬

  শান্তা মারিয়া

৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

 

বাংলাদেশের নারীর জন্য ২০১৬ সাল ছিল ঘটনাবহুল। এর মধ্যে নেতিবাচক ঘটনাই বেশি। এ বছর নির্মম সব হত্যাকা- ও ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে নারীকে। ২০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয় ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুকে। তনু হত্যার প্রতিবাদে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। মানববন্ধন, সমাবেশ, মিছিল ও ফেসবুকে তনু হত্যার বিচার দাবি করেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু এখনো পর্যন্ত হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

তনু হত্যাকা-ের পর সারা দেশের মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায় আরেকটি নির্মম হত্যাকা-ের খবরে। চট্টগ্রামে ৫ জুন শিশু সন্তানকে স্কুলের গাড়িতে তুলে দিতে গিয়ে পথের ওপরই খুন হন মাহমুদা খানম মিতু নামে এক গৃহবধূ। তিনি ছিলেন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী। হত্যাকারীরা শিশু সন্তানের সামনেই চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে মিতুকে। এই হত্যাকা-ের রহস্যও এখন পর্যন্ত উদঘাটন করা হয়নি।

১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হত্যাকা-ে কেঁপে ওঠে দেশ। সেখানে ২৮ জন নিহতের মধ্যে নারীও ছিলেন অনেক। পোস্টমর্টেমে দেখা গেছে, নারীদের ওপরই জঙ্গিদের আক্রোশ ছিল বেশি। এই হামলায় নিহত হন বাংলাদেশি নারী ইশরাত আখন্দ, যুক্তরাষ্ট্রের অবিন্তা কবীর, ভারতীয় তারিশি জৈন, ইতালীয় নাদিয়া বেনেদেত্তি, কাউডিয়া মারিয়া ডি দান্তোনা, সিমোনা মোনতি, মারিয়া রিবোলি এবং দুজন জাপানি নারী। জঙ্গিদের নির্মম হত্যাকা- থেকে রেহাই মেলেনি অন্তঃসত্ত্বা সিমোনা মোনতিরও।

আগস্টে দুটি হত্যাকা- জনমনে আলোড়ন তোলে। ১৩ আগস্ট আফসানা নামে মিরপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষার্থীকে তার প্রেমিক-স্বামী রবিন হত্যা করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। বখাটেদের হামলা এ বছর ছিল একটি চরম নিন্দনীয় বিষয়।

২৮ আগস্ট বখাটের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় স্কুলছাত্রী রিশা। রিশা ঢাকার উইলস লিটল ফাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। বখাটে এক লোক তাকে উত্ত্যক্ত করত। কিন্তু রিশা তার কুপ্রস্তাবে সম্মত না হওয়ায় ছুরি হাতে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে রিশার ওপর। গুরুতর আহত রিশা হাসপাতালে মারা যায়। বখাটের ছুরিকাঘাতে এর কিছুদিন পরই নিতু ম-ল নামে আরেক কিশোরীকে প্রাণ হারাতে হয় একই ধরনের ঘটনায়। কলেজছাত্রী খাদিজার ওপর চাপাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বদরুল আলম নামে এক বখাটে। খাদিজার ওপর বর্বর হামলার এই ভিডিও দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হয়। সারা দেশে আলোড়ন তোলে ঘটনাটি। দীর্ঘদিন আইসিইউতে চিকিৎসা গ্রহণের পর জীবন ফিরে পায় খাদিজা। তবে সে এখনো অসুস্থ। মেয়েকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হামলায় ঝিনাইদহে দুই পা হারান শাহনূর বিশ্বাস নামে একজন দিনমজুর বাবা। বখাটেরা মেয়েটির পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে পঙ্গু করে দেওয়ায় পুরো পরিবার এখন পথে বসার উপক্রম। ঢাকার মিরপুরে প্রকাশ্যে দুই যমজ বোনের ওপর হামলা চালায় জীবন নামে এক বখাটে।

শিশু ধর্ষণ ছিল বিদায়ী বছরের আরেকটি দুঃখজনক দিক। দিনাজপুরে পাঁচ বছরের এক শিশুর ওপর ধর্ষণ ও ভয়াবহ নির্যাতন চালানোর ঘটনায় স্তম্ভিত হয় দেশ। শিশুর ধর্ষক ও নিপীড়ক এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী সাইফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পরপরই আরও শিশু ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়। আড়াই বছর, পাঁচ বছর ও ১১ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।

রাজধানীতে বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের সামনে ধর্ষণ করা হয় আরেক কিশোরীকে। বাগেরহাটের চিহ্নিত সন্ত্রাসী এক গৃহবধূকে পনেরো দিন বাড়িতে আটকে রেখে ধর্ষণ করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে গোড়ালি থেকে তার পা কেটে নেয়। সেই সময় সংখ্যালঘু পরিবারের ওই গৃহবধূর স্বামী ও অন্য স্বজনদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে সন্ত্রাসীরা।

বছরের শেষদিকে জয়পুরহাটে নিজের বাড়িতে আক্রমণের শিকার হয় এক কিশোরী। শুধু ধর্ষণচেষ্টা নয়, তাকে মাথায় গুরুতর আঘাতও করা হয়।

পারিবারিক নির্যাতন ও মানসিক চাপের কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আখতার জাহান জলির আত্মহত্যা ছিল এ বছরের অন্যতম দুঃখজনক ঘটনা। মডেল সাবেরা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার আত্মহত্যাও ছিল আলোচিত।

বিখ্যাত এক ক্রীড়াবিদের বাড়িতে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাও ছিল ন্যক্কারজনক। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৬ ছিল আলোচিত-সমালোচিত। মন্ত্রিসভায় পাস হয় আইনটি। এ আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ করা হলেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে বাল্যবিয়েকে উৎসাহিত করবে বলে মতপ্রকাশ করেছে সুশীল সমাজ। বাল্যবিয়ে বৈধ করার নামে নারীর অগ্রযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে বলেও মতপ্রকাশ করেন নারীনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মীরা।

এ বছর রোকেয়া পদক পান সমাজসেবক অ্যারোমা দত্ত এবং শিক্ষক নূরজাহান বেগম। বছরের শেষে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সবচেয়ে ইতিবাচক ছিল নারায়ণগঞ্জের মেয়র হিসেবে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি।

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্যমতে, গত এগারো মাসে পারিবারিক সহিংসতায় ২৬৮ জন নারী নিহত হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৫২৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৭৩ জন, গণধর্ষণের শিকার ১৫৪ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৬ জনকে। অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার ৩৫ জন, অগ্নিদগ্ধ ৬২, পাচার হয়েছে ৩৩, যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ১৬০ জনকে। বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ১৬৯ জন, নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২৮ জন গৃহকর্মী, হত্যা করা হয়েছে ২২ জনকে। ৫ জন গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছে। এ বছর বিভিন্ন কারণে হত্যা করা হয়েছে ৭১৬ জনকে। আত্মহত্যা করেছে ৩০৪ জন। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১১ জন। বখাটেদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৪ জন। ফতোয়াবাজির শিকার হয়েছে ২২ জন। অন্যান্য কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২২৮ জন।

আগামী বছর নারীর জন্য শুভ, নিরাপদ ও কল্যাণকর হবে এই প্রত্যাশা দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।

 

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে