নারীকে বন্দি নয় বরং পুরুষদের মূল্যবোধ জাগাতে হবে

  অনলাইন ডেস্ক

২০ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২০ মে ২০১৭, ০০:২৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দিন দিন বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুসারে, জানুয়ারি ২০১৭ থেকে মার্চ ২০১৭ পর্যন্ত ৯৩ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন একজন করে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশু থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীও। পূর্ণিমা থেকে তনু, তনু থেকে বনানীর হোটেলে ধর্ষিত হওয়া দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী আমাদের সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে প্রতিনিয়ত। ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, এ বিষয়ে কথা বলেছেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল তিন নারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেনÑ আঞ্জুমান আরা

সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক

মানুষ এমন অমানবিক হলো কীভাবে, এটিই এখন ভাবনার বিষয়। একজন উচ্চবিত্তের ছেলে ধর্ষণ করছে আবার ড্রাইভার আর বডিগার্ডকেও সুযোগ দিচ্ছে। মানুষ এতটা বেশি কেন অমানবিক, বর্বর হয়ে গেল এটিই এখন আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। এই বর্বরতা থেকে সমাজকে সুস্থ করতে শিক্ষা, শ্রদ্ধা, সম্মান সর্বোপরি মানসিকতা পরিবর্তনের জায়গাগুলোয় কাজ করতে হবে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে এ সংক্রান্ত অধ্যায় যোগ করতে হবে এবং পরিবার থেকেও সন্তানদের নারীদের সম্মান, শ্রদ্ধা শেখাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমাধান হিসেবে নারীকে বাইরে যেতে নিষেধ না করে বরং নারী-পুরুষ একসঙ্গে মিলেমিশে ধর্মীয় উৎসব, অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমা দেখাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে হবে। এতে মানবিক চেতনা জাগ্রত হবে। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে প্রশংসিত ভূমিকা পালন করছে। এ ক্ষেত্রে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিতর্ক, আবৃত্তি, আলোচনাসভা ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও বেশি কাজ করতে পারে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তারা তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।

এলিনা খান

অ্যাডভোকেট ও মানবাধিকার কর্মী, প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন

ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে নৈতিকতা মূলবোধ জাগ্রত করতে হবে। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম পরিবারে ছোটদের সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা ইত্যাদি নৈতিকতা মূল্যবোধ শেখানো হতো। এটি এখন তেমন দেখি না। স্কুলেও এখন এ ধরনের শিক্ষাপ্রবণতা কমে গেছে। এতে আমরা দিন দিন নৈতিকতাহীন, বর্বর হয়ে পড়ছি। পরিবারে, স্কুলে নৈতিকতার মূলবোধ শিক্ষা দিতে হবে। মোবাইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি দেখার সুযোগ এখন খুব সহজ হয়ে গেছে। স্কুলের ছোট শিশুরাও এখন পর্নোগ্রাফি দেখছে। অথচ বাইরের দেশগুলোয় একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে এ সুযোগগুলো নেই। আমাদের দেশেও এ ধরনের আইন করা উচিত। সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। পাশাপাশি থেকেও আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশি না, প্রতিবেশীরা শিশুদের নিয়ে কোনো অভিযোগ করলে আমরা তা আমলে নিই না, সন্তানদের শাসন করি না। এ ধরনের কর্মকা- আমাদের সামাজিক বন্ধন নষ্ট করছে। এতে শিশুরা বড় হয়ে বিভিন্ন অপকর্মে জড়াচ্ছে। শুধু আইন করে ধর্ষণ বন্ধ হবে না, ধর্ষণ প্রতিরোধে সমাজের এ দিকগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে।

নাসিমুন আরা হক মিনু

সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র

ধর্ষণ হচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি। ধর্ষণের শিকড় সমাজের গভীরে। এটি প্রতিরোধে তাই শুধু সামাজিক সচেতনতা নয়, বিভিন্ন দিক থেকে কাজ করতে হবে। প্রথমত, ধর্ষণ অপরাধকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণ প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তৃতীয়ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার কার্যকর করতে হবে। অন্যান্য দেশের মতো মেডিক্যাল টেস্ট নয়, এ ক্ষেত্রে ভিকটিমের জবানবন্দিই যথেষ্টÑ এ আইনটি কার্যকর করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণকারী মনে করে, তিনি পুরুষ তাই নারীর তুলনায় শক্তিশালী। এ কারণে ভিকটিম তাকে কিছু করতে পারবে না কিংবা টাকার জোরে পার পেয়ে যাবে। বনানীর হোটেলে যে ঘটনাটি ঘটেছে এর সঙ্গে দায়ী তরুণটির মতো আমাদের সমাজের অনেক পুরুষই মনে করে টাকা থাকলে ধর্ষণ করে পার পাওয়া যাবে। এ ধরনের মানসিকতা বদলাতে হবে এবং এটি সম্ভব হবে যখন ধর্ষণ মামলাগুলোর দ্রুত বিচার কার্যকর হবে। নারীরাও মানুষ এবং তাদেরও আছে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার, নিরাপদে বসবাস করার অধিকারÑ এ বোধটি পুরুষদের মানসিকতায় জাগ্রত করতে হবে। চতুর্থত, স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান, ধর্ষণ অপরাধের শাস্তি ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি সত্যি রাতারাতি বদলাবে না, তবে এখন থেকেই যদি সর্বক্ষেত্রে আমরা সবাই কাজ করি তা হলে একদিন নিশ্চয়ই এই সামাজিক ব্যাধি দূর হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে