সব শ্রেণি মানুষের আস্থায়...

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড

  অনলাইন ডেস্ক

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

 

হাসপাতাল

দেড়শ বছরের ঐহিত্যবাহী মিটফোর্ড হাসপাতাল এর পুরো নাম স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল। দেশের প্রথম আধুনিক চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান এটি। একনামে সবার কাছেই পরিচিত নাম মিটফোর্ড। কালের পরিক্রমায় আজকের সাধারণ মানুষের সেবার অত্যাধুনিক হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী,

কী কী সেবা পাবেন এখান থেকে কিংবা কীভাবে যাবেন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন দ্বীন অয়নপরিচিতি

পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজ থেকে মাত্র ৫০ গজ পশ্চিমে রাস্তার দণি পাশে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের অবস্থান। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে প্রায় ১২.৮ একর জায়গাজুড়ে হাসপাতালটি গড়ে উঠেছে। ইনডোর ও আউটডোরে সেবার পাশাপাশি প্যাথোলজিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক সার্ভিস প্রদান করে থাকে। এ হাসপাতালটিই হলো ব্রিটিশ শাসিত তৎকালীন পূর্ববাংলার প্রথম জেনারেল হসপিটাল। শুরু থেকে এটি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির একটি বোর্ডের অধীনে ছিল। তখন থেকে এটি এদেশের মানুষের, বিশেষকরে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে ভূমিকা পালন করে আসছে।

 

প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস

ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, তৎকালীন ঢাকার কালেক্টর ছিলেন স্যার রবার্ট মিটফোর্ড। দীর্ঘদিন প্রাদেশিক আপিল বিভাগের বিচারপতিও ছিলেন। ১৮২০ সালে স্যার রবার্ট মিটফোর্ড প্রথম মিটফোর্ড হসপিটালটি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখন ঢাকাতে কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। মেডিক্যাল সুবিধা তখন খুবই অপর্যাপ্ত ছিল। প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ জন মারা যেত। এ অবস্থা দেখে স্যার মিটফোর্ড হাসপাতালটি গড়তে উদ্যোগী হন। তিনি ইংল্যান্ডে মৃত্যুর (১৮৩৬) আগে উইল করে তার প্রচুর সম্পত্তি তখনকার সময় প্রায় ৮ ল টাকা এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবায় তৎকালীন বাংলার সরকারকে দান করে দিয়ে যান। কিন্তু পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীদের জন্য এই উইল নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কিন্তু ১৮৫০ সালে সর্বোচ্চ আদালতের চ্যান্সারি বিভাগের রায় অনুযায়ী বাংলার সরকার মিটফোর্ডের সম্পত্তি থেকে ১ ল ৬৬ হাজার টাকা লাভ করে। পরবরর্তীতে লর্ড ডালহৌসির উদ্যোগে এই ফান্ড দিয়ে ১৮৫৪ সালে বর্তমান স্থানে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তারও আগে এই স্থানটি ডাচ কুঠি হিসেবে ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়। তবে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠায় কয়েকজন স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিও অর্থসাহায্য প্রদান করেন। ১৮৫৮ সালের ১ মে মিটফোর্ড হসপিটাল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তখন এতে পুরুষদের জন্য দুটি ও মহিলাদের জন্য একটি ওয়ার্ডসহ ৮২টি বেড ছিল। ঢাকার নবাব খাজা আহসানুল্লাহ ও ভাঁওয়ালের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের দানে ১৮৮২ সালে হাসপাতালে মহিলাদের জন্য পৃথক একটি ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবাব আহসানুল্লাহ ১৮৮৮-৮৯ সালে একই সাথে ৫০ হাজার টাকা দান করেন একই এলাকায় ‘খধফু উঁভভবৎরহ ঐড়ংঢ়রঃধষ’ প্রতিষ্ঠার জন্য। ১৮৮৭ সালে হাসপাতালে একটি ইউরোপিয়ান ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৮৯-৯০ সালে ভাগ্যকুলের রাজা শ্রীনাথ রায় ৩ ল টাকা ব্যয়ে তার মায়ের স্মরণে হাসপাতালে একটি চক্ষু ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরে ১৯১৭ সালে এটি প্রথম শ্রেণির হাসপাতাল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

 

চিকিৎসাসেবা

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে মোট বেড রয়েছে ৯০০টি। ৩২টি বিভাগে রোগীরা পরামর্শ ও সেবা পাচ্ছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিভাগ হলোÑ মেডিসিন, নিউরোলজি, কার্ডিওলজি, সার্জারি, নিওরো সার্জারি, চক্ষু, নাক-কান-গলা, অর্থোপেডিক, গাইনি, মানসিক রোগ, প্যাথলজি, রেডিওলজি, চর্ম ও যৌনরোগ চিকিৎসাসহ মানব শরীরের প্রায় সব ধরনের রোগের চিকিৎসা সেবা এখানে পাওয়া যাবে। দৈনিক ৩ হাজার মানুষ আউটডোরে চিকিৎসা পাচ্ছেন, এরমধ্যে প্রতিদিনই এক হাজারের মতো রোগী ভর্তি হন বলে নিশ্চিত করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ব্রি. জে ব্রায়ান বঙ্কিম হালদার। তবে সব সময়ই এ হাসপাতালে সব মিলে অন্তত ৩ হাজার ৩০০ রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন ছোট-বড় ১০টি অপারেশন থিয়েটারে ৪০টির বেশি অপারেশন করা হয়। মিটফোর্ডের সেবার বিষয়ে পরিচালক জানান, সাধারণের আর্তমানবিক সেবায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মিটফোর্ডের আউটডোর থেকে সেবা পাচ্ছেন। যা প্রতিষ্ঠানটির জনবলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

 

জনবল

সাধারণ রোগীদের সার্বিক চিকিৎসা সেবায় হাসপাতালটিতে মোট ৬০০ জন চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। এরমধ্যে হাসপাতালের চিকিৎসক ১৬০ জন, প্রফেসর ১৫০ জনের মতো, ইর্ন্টানি চিকিৎসক ১৭০ জন। রোগীদের সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য রয়েছেন ৪০০ জন নার্স। এ ছাড়া সব জনবল, সেবার মান উন্নয়ন, সার্বিক দেখাশুনায় পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ব্রি. জে ব্রায়ান বঙ্কিম হালদার। তবে সামনে সেবার মান উন্নয়নে আরও জনবল নিয়োগের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

 

চিকিৎসা খরচ

মানব শরীরের সব রকমের রোগের সেবা মিলবে এ হাসপাতাল থেকে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অন্যান্য হাসপাতালের মতো এখানেও ১০ টাকার টিকিট কেটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে। যে কোনো সমস্যায় ভর্তি হতে চাইলে ১৫ টাকা খরচ হবে। এ ছাড়া খাওয়া-দাওয়া হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয়। ছোট- বড় সব ধরনের অপারেশন, নির্ধারিত ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

 

সেবাগ্রহণকারীদের মন্তব্য

শরিয়তপুর থেকে মিটফোর্ডে এসেছেন মেরিনা আক্তার, বাচ্চার সমস্যায় কয়েকদিন ধরে রয়েছেন। সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আগের চেয়ে সেবা ভালো পাচ্ছি, ডাক্তাররা ভালোমতোই দেখছেন আমার ছেলেকে। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা তাসলিমা বেগমের সাথেও কথা হলো, অন্যান্য হাসপাতাল থেকে ঘুরে শেষপর্যন্ত এখানে ক্যান্সারের চিকিৎসায় ভর্তি হয়েছেন। তবে এখানকার সেবায় সন্তোষ প্রকাশ করলেন তিনি।

 

পাশে গড়ে উঠেছে ওষুধশিল্প

মিটফোর্ডের পাশে দেশের প্রথম পাইকারি ওষুধের ব্যবসা কেন্দ্র। পাইকারি ওষুধের বাজার হিসেবে সুখ্যাতি সবশ্রেণির মানুষের কাছে। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মিটফোর্ড এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ১৩০০ দোকান গড়ে উঠেছে। বহুতল বিশিষ্ট ওষুধের মার্কেটের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। প্রতি দোকানে দৈনিক গড়ে ৫০ হাজার টাকার কেনাবেচা হলে বছরে বন্ধ বাদ দিয়ে ৩০০ দিনে মোট কেনাবেচা হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ওষুধ।

 

কীভাবে যাবেন

রাজধানীর যেকোনো এলাকা থেকে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড বললেই যে কেউ চিনিয়ে দেবে, এক্ষেত্রে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল বলার দরকার পড়বে না। এক্ষেত্রে পাবলিক বাসে করে এলে বাবু বাজার ব্রিজের নিচে নামতে হবে। এখান থেকে রিকশায় যাওয়া যাবে। আর সিএনজিতে এলে সরাসরি পৌঁছে দেবে মিটফোর্ডের গেটের সামনে।

 

 

বিশেষত্ব নিয়ে

পরিচালকের বক্তব্য

হাসপাতালটির বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে সেবার মান, চিকিৎসা পরিসর আর প্রযুক্তি উৎকর্ষতা। পরিচালক ব্রি. জে ব্রায়ান বঙ্কিম হালদার বলেন, ৩২টি বিভাগে এখান থেকে যে সেবাগুলো সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন, সবক্ষেত্রেই আমরা সর্বোচ্চ সেবাটাই দিচ্ছি। এটি কিন্তু শুধু দেশের না, উপমহাদেশেরও প্রথম আধুনিক হাসপাতাল, এজন্য এই সম্মানের জায়গাটি ধরে রেখেই সেবা দেওয়া হচ্ছে। মিটফোর্ড হলো এমন একটি হাসপাতাল যেখানে দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে সেবাগ্রহণ করছেন। উদাহরণ হিসেবে পরিচালক জানান, আশপাশের এলাকাসহ কামরাঙ্গীচরের ৪ লাখ বস্তিবাসী, দক্ষিণ অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ নিশ্চিন্তে মিটফোর্ডে চলে আসেন। নতুন করে হাসপাতালটিতে সর্বশেষ সংস্করণের এমআরআই, সিটিস্ক্যান, এনজিওগ্রাম, এক্স-রে মেশিন সংযোজন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন পরিচালক ব্রি. জে ব্রায়ান বঙ্কিম হালদার।

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে