ডায়রিয়া ও কলেরার চিকিৎসায়...

  আজহারুল ইসলাম অভি

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

 

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ বা সংক্ষেপে আইসিডিডিআরবি (ওঈউউজ,ই) একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৬০ সাল থেকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা খাত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এটি একটি অলাভজনকসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং এর দায়িত্ব হচ্ছে উদরাময় রোগ, পুষ্টি এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করা। আইসিডিডিআরবির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত আইসিডিডিআরবি কলেরা হাসপাতাল কিংবা ঢাকা হাসপাতাল তার সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের একটি যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে চিকিৎসা নিতে। উদরাময় রোগসহ বিভিন্ন পুষ্টিজনিত রোগ এবং মাতৃকালীন তথা গর্ভকালীন বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে এখানে।

যাত্রা শুরু : সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে একসময় কলেরা রোগের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল। মূলত এই প্রাণসংহারক রোগকে মূলোৎপাটিত করার প্রত্যয়েই প্রথম এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই রোগের বিরুদ্ধে প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কার্যকারণ সৃষ্টি হয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। সে সময় অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে সমাজতন্ত্রের বিস্তার রোধকল্পে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় চুক্তি সংস্থা (সিয়াটো) গঠিত হয় এবং এ সংস্থা এই এলাকায় যুদ্ধরত আমেরিকান সৈন্যদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার তাগিদে কলেরা গবেষণার একটি কাঠামো স্থাপনের জন্য সমর্থন জোগায়। ফলে বাংলাদেশের ঢাকায় কলেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এবং সিয়াটোর যৌথ প্রকল্পের অধীনে ১৯৬০ সালে এই সংস্থার নাম রাখা হয় ‘পাকিস্তান কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’। অবশ্য যুদ্ধের পর এর নাম পরিবর্তন করে শুধু কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি রাখা হয়। পরে ১৯৬২ সালে গবেষণার স্বার্থে এখানে গড়ে ওঠে আইসিডিডিয়ারবি কলেরা হাসপাতাল। প্রথমে সীমিতভাবে কয়েক রোগীকে সেবা দেওয়া গেলেও এখন এখানে একই সঙ্গে হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে পারে।

যেসব চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় : এক সময় উদরাময় ছিল এ দেশের ভয়াবহ এক রোগ। মহামারী আকারে যখন তা ছড়িয়ে পড়ত এবং হাজার হাজার মানুষ এতে মারা যেত। অথচ এখন এটাই খুব কম শোনা যায়, উদরাময় কিংবা ডায়রিয়ায় মানুষ মারা গেছে। আইসিসিডিআরবির অভিজ্ঞ ডাক্তার, গবেষক, বিজ্ঞানীদের ব্যাপক গবেষণা, চেষ্টার মাধ্যমে তারা এই দেশ এবং উপমহাদেশ থেকে উদরাময়, কলেরার জীবাণু তাড়াতে সক্ষম হয়েছেন, আবিষ্কার করেছেন কলেরার ভ্যাক্সিন, ট্যাবলেট ও আরএস বা খাবার স্যালাইন। কলেরা রোগে মারা যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বেরিয়ে যাওয়া। খাবার স্যালাইন খুব দ্রুত শরীরের লবণ ও পানির স্বল্পতা দূর করে ফলে রোগী মৃত্যুর হার কমে গেছে বহুগুণে। বাংলাদেশের এমন কোনো দুর্গম অঞ্চলও বাদ নেই যেখানের মানুষ জানে না ওআরএস বা খাবার স্যালাইন সম্পর্কে। এসব কিছুই আইসিডিডিআরবির অবদান। এই হাসপাতালে কলেরাতে রোগী মৃত্যুর হার ১ শতাংশেরও কম।

শিশুদের অপুষ্টিসংক্রান্ত রোগের চিকিৎসা এবং মায়েদের কাউন্সেলিং : জন্ম-পরবর্তী শিশুদের অপুষ্টিজনিত যে কোনো রোগের চিকিৎসা এখানে দেওয়া হয়। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা ইউনিট। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এই ইউনিটে প্রবেশের পর কারো কাছে মনে হবে না যে তারা হাসপাতালে এসেছে। সার্বক্ষণিকভাবে নার্স এবং দায়িত্বরত চিকিৎসকরা এখানে নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া এই ইউনিটে চিকিৎসা নিতে আসা মায়েদের জন্য রয়েছে বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা। কিভাবে শিশুদের যতœ নেবে, কীভাবে তাদের মানসিক বিকাশ বৃদ্ধি পাবে, কোনো কোনো খাবার শিশু স্বাস্থ্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, খাবারের কী কী উপাদান থাকতেই হবে, কীভাবে খাবার প্রস্তুত করা হবে সবকিছু এখানে হাতে কলমে শেখানো হয়। মায়েদের জন্য আরও আছে ব্রেস্ট ফিডিং কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং এসব কাউন্সেলিংয়ের জন্য কোনো ফি গুনতে হবে না। এসব কাউন্সেলিং একদম ফ্রি।

শিশুদের টিকা : শিশু জন্মের পর হাম, পোলিও, ধনুস্টংকারের মতো মারাত্মক রোগ থেকে তাদের রক্ষা করতে জন্মের নির্দিষ্ট সময় পর পর কয়েকটি ধাপে টিকা দিতে হয়। শিশুদের এসব টিকা ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য নানা ধরনের পরামর্শ এখানে দেয়া হয়। এসব টিকা ছাড়াও অন্যান্য সরকারি যত টিকা আছে সব টিকাই এখানে দেওয়া হয়।

মায়েদের গর্ভকালীন সেবা ও পরামর্শ : মায়েদের গর্ভকালীন বিভিন্ন সেবা ও পরামর্শের জন্য আসতে পারেন ঢাকা হাসপাতালে। এখানকার অভিজ্ঞ ডাক্তাররা সব ধরনের সুপরামর্শ এবং গর্ভকালীন চিকিৎসাও করে থাকেন। হাসপাতালের মান এবং সেবা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. আজহারুল ইসলাম (চিফ ফিজিশিয়ান অ্যান্ড হেড হসপিটালস) বলেন, আমাদের এখানে আমরা বিনা টাকায় সর্বোত্তম সেবা দিয়ে থাকি। হাসপাতালের সেবার মান নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। আমদের এই প্রতিষ্ঠান সেবা দানকারি প্রতিষ্ঠান। টাকার জন্য সেবা এখানে কখনই আটকে থাকে না বরং টাকা ছাড়া যে সেবা আমরা দিয়ে থাকি তা একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপনের দাবিদার।

হাসপাতালে ভর্তি প্রক্রিয়া : প্রথমে হাসপাতালে ঢোকার পরই রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এরপর রিসিপশনে থাকা ডাক্তাররা রোগীকে দেখে বিভিন্ন জায়গায় ট্রান্সফার করেন। রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ইমার্জেন্সিতে শিফট করা হয়। হাসপাতালের পরিবেশ সম্পর্কে ডা. আজহারুল ইসলাম গর্ব করে বলেন ‘আপনারা একবার ভিজিট করে আসুন আমাদের প্রতিষ্ঠানটি, তাহলেই বুঝতে পারবেন কতটা পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করি আমরা’। হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেলও তাই। ময়লা, দুর্গন্ধবিহীন, ঝকঝকে তকতকে একটি আধুনিক হাসপাতাল এটি যা অন্যান্য হাসপাতালের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে।

যতজন সেবা নিতে পারেন একসঙ্গে : প্রতিদিন গড়ে ২৫০-৩৫০ জন রোগী এখানে সেবা নিয়ে থাকেন। তবে কলেরা কিংবা উদরাময়ের মতো রোগ যখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে তখন একই সঙ্গে দেড় হাজারের বেশি মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে পারবেন। আইসিডিডিআরবির মিডিয়া ম্যানেজার তারিফুল ইসলাম জানান, ২০০৭ এর বন্যার সময় প্রায় এক হাজারের বেশি মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসে এবং এরা সবাই সেবা নিয়ে সুস্থভাবে ফিরে গেছেন। এখানকার চিকিৎসা সিস্টেম পেপারলেস পদ্ধতিতে হয়। অর্থাৎ ডাক্তাররা স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে রোগীদের সমস্ত তথ্য নোট করে নিয়ে থাকেন এবং যদি কোনো কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় অবশ্যই কর্তব্যরত চিকিৎসককে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তা জবাবদিহি করতে হয়।

অর্থায়ন : হাসপাতালের তথা আইসিডিডিয়ারবির অর্থায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে আজহারুল ইসলাম বলেন সরকার নানাভাবে এখানে অর্থায়ন করে থাকে। তবে শুধু সরকারই নয় সুইডেন, কানাডা, আমেরিকাসহ নানা দেশের অর্থায়নে এই সংস্থা তথা হাসপাতালের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

অবস্থান : মহাখালী কাঁচাবাজার থেকে মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের দিকে ২০০ গজ সামনে হাতের বাম দিকে আইসিডিডিআরবি অবস্থিত। এর মূল ফটক দিয়ে ঢুকলেই দেখা যাবে এই হাসপাতাল।

যোগাযোগ : ফোন নং ৮৮০৬৫২৩-৩২, ফ্যাক্স ৮৮-০২-৮৮১৯১৩৩, ৮৮২৩১১৬, জরুরি বিভাগের নম্বর ৯৮৯৯০৬৭, ওয়েবসাইট িি.িরপফফৎন.ড়ৎম

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে