আমাদের সময়কে আরসা নেতা হাকিম

আরাকান স্বাধীন করে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই

  হাবিব রহমান, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত থেকে

০৫ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৭, ২০:০২ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাকিম সাহেব
দুই সপ্তাহ আগে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) এক সদস্যের সঙ্গে স্থানীয় এক সোর্সের মাধ্যমে প্রথম যোগাযোগ ঘটে। তার মাধ্যমে চলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ। এক পর্যায়ে আরসাকর্মী জানান, সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে এক শীর্ষ আরসা নেতা ও একজন আহত মুজাহিদ অবস্থান করছেন। কিন্তু তারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছিল না। কারণ কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না। টানা কয়েকদিন মোবাইল ফোনে (রবির নেটওয়ার্ক সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারেরও বেশকিছু জায়গা কাভার করে) কথা চলল। অবশেষে এক আরসা নেতা আস্থা রাখলেন। নির্ধারিত সময়ে নাইক্ষ্যংছড়ির তমরু সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ড এলাকায় যাই। কিন্তু সেখানে পৌঁছার পর আর ফোন ধরছে না অপরপ্রান্ত থেকে। মিনিট দশেক পর দুজন লোক এসে আমাদের ইশারায় যেতে বললেন। আমরা তার পিছু নিলাম। কিছুক্ষণ পর একটি ছোট্ট ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। অনুমতি না থাকলেও গোপনে পুরো সাক্ষাৎকার ধারণ করতে থাকি। এই আরসা নেতার সাংগঠনিক নাম হাকিম সাহেব। তার দাবি, তিনি আরসার অস্ত্র উইং সমন্বয় করেন। তার সঙ্গে থাকা মোহাম্মাদ আলম একজন আরসা যোদ্ধা।

স্থানীয়ভাবে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে ‘হারাকাহ আল ইয়াকিন’ বা শুধু ‘ইয়াকিন’ নামে পরিচিত আরসা। বর্তমানে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংগঠনটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বেশি দেখা গেছে। হাকিম সাহেবের সঙ্গে কথপোকথন তুলে ধরা হলো।

আমাদের সময় : আরসার সংগঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপট ও শুরুটা জানতে চাই।
হাকিম : নিজ দেশে যুগের পর যুগ নির্যাতন-নিগ্রহের শিকার হয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। নারী শিশু থেকে শুরু করে যুবক তরুণ কেউই বাদ নেই মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন থেকে। তাদের এ নির্যাতন সাম্প্রতিক সময়ে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরবে অবস্থানরত মাওলানা আবুল কালাম হায়দারী ও মাওলানা আবুল হাসান হায়দারী প্রথমে সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু করেন। তারা দুজনই রোহিঙ্গা। আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াও তারা একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করেন। ওই সময় সৌদি আরবে ছিলেন বর্তমান আরসা প্রধান আতাউল্লাহ। সংগঠনে সবাই তাকে হাফেজ আতাউল্লাহ নামেই ডাকেন। ২০১৩ সালে নেতৃত্বে আসা আরসার প্রথম দল মিয়ানমারে প্রবেশ করে। রাখাইনের তংঘুপাহাড় এলাকায় আরসার প্রথমদিকের একটি বৈঠকে অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রায় ১০ জনকে হত্যা করে।

আমাদের সময় : আরসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু বলুন।
হাকিম : কোরআন, হাদিস, দ্বীন ও মাতৃভূমি রক্ষার শপথ প্রতিটি আরসা মুজাহিদের। আরাকান স্বাধীন করে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য। আরসা বিশ্বাস করে, একদিন না একদিন আরাকান স্বাধীন হবেই। বর্তমানে সাধারণ রোহিঙ্গাদের জানমাল রক্ষাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আমাদের সময় : আরসার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
হাকিম : এটা ঠিক, আরসার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে সংগঠনটির যোদ্ধারা অপরিসীম সাহসী। এটাই বড় শক্তি ও অস্ত্র। শুরুতে এক হাজার ৮৩২ জন সদস্য ছিল আরসায়। সর্বশেষ অভিযানে অনেকেই মারা গেছেন। তবে অস্ত্র বড় সমস্যা। এত মুজাহিদের জন্য অস্ত্র মাত্র দুই শতাধিক। অস্ত্রের বেশিরভাগই চীন ও ভারতের তৈরি। ভারী অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ রয়েছে। কিন্তু ভারী অস্ত্রের তেমন কোনো জোগান নেই। একটি বড় অস্ত্রের চালান ঢোকার অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। এ জন্য ইতোমধ্যে মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। প্রত্যেক পাড়াভিত্তিক কমিটি গঠন করছি। ১০ গ্রামের দায়িত্ব এক নেতাকে দেওয়া হয়। তাকে জিম্মাদার নামে ডাকেন সবাই। কেউ কেউ দায়িত্বশীলও বলেন। আরসার ২০ ভাগ লোক শিক্ষিত।

আমাদের সময় : আরসার সঙ্গে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে। আপনার কী মনে হয়?
হাকিম : আমরা কাজ করছি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। এখন একটা সংগঠনে অনেক লোক কাজ করছেন। সম্প্রতি সময়ে কিছু সমস্যা আমাদের এখানেও হয়েছে। আমি মনে করি না নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে দলের কেউ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। এমনটা করলে দল ভেঙে যাবে অচিরেই। আমার ছোট ভাই নুরুল হাকিমও এই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। সে মারা গেছে গত বছরের ৬ মে। সম্মুখযুদ্ধে। তাকে হাফেজ আতাউল্লাহ খুব স্নেহ করতেন। আতাউল্লাহর ছায়াসঙ্গী ছিল। কিন্তু সংগঠনের একটি গ্রুপের ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য সে মারা যায়। তারপরও আমি ধৈর্য ধরে আছি। আমরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। কিন্তু কেউ যদি অন্যকিছু চিন্তা করে তা হলে তার দায় তার ওপরই বর্তাবে। তা ছাড়া এরই মধ্যে আরসা প্রধান আতাউল্লাহর এক ভাইকে পাকিস্তানে অপহরণ করা হয়। তাকে সংগঠনের তহবিল থেকে মুক্তিপণের মাধ্যমে ছাড়িয়ে আনা হয়। এই বিষয়টিও সংগঠনের কেউ কেউ ভালোভাবে দেখেনি। এসব তো চলবেই। তবে দিনশেষে সবাইকে মিলেমিশেই থাকতে হবে। নিজেদের ভালোর জন্যই।

আমাদের সময় : ৯ অক্টোবর পর্যন্ত আপনাদের অস্ত্রবিরতি চলছে। এরপর কী হবে?
হাকিম : নিরীহ নারী-শিশুর ওপর মিয়ানমার বাহিনী যে নিপীড়ন শুরু করে আমরা এ কারণে অস্ত্রবিরতিতে যাই। কিন্তু এখন আরাকান প্রায় শূন্য হয়ে যাচ্ছে। সবাই বাংলাদেশে চলে আসছে। আমরা এখন ভিন্ন আঙ্গিকে পরিকল্পনা করছি। মিয়ানমার যে বর্বরতা চালিয়েছে এ জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। বড় হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

আমাদের সময় : আপনারা সীমান্ত এলাকায় থাকছেন। দলের প্রধান আতাউল্লাহ কোথায়?
হাকিম : এবারের হামলার পর অনেক মুজাহিদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। তবে হাফেজ আতাউল্লাহ আরাকানেই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করছেন। কয়েকদিন পর পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে আমাদের। আরসা সদস্যরা এখন রাতে ছাড়া চলাফেরা করতে পারে না। এখন তাদের কাছে রাতই হলো দিনের মতো। আমরা লড়াই করছি। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আমাদের মারতে পারে। কিন্তু নিরীহ নারী শিশুদের ওপর হামলা কেন? আমরা স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছি। ভাবিনি আন্দোলনের ফলে তারা সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর এভাবে হামলা চালাবে, গণহত্যা করবে। নারী ও শিশুদের ওপর নৃৃৃশংসতা চালাবে। গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে।

কথা বলার এই পর্যায়ে হাকিমের মোবাইলে ফোন আসতে থাকে বারবার। তিনি আমাদের জানান, তাকে জায়গা পরিবর্তন করতে হবে এখনই। তিনজন আরসা সদস্যকে নিয়ে উঠে পড়েন হাকিম।

সীমান্ত এলাকায় আরসার যে কজন সদস্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে সবাই হাকিমকে নেতা মানছিলেন। কিন্তু হাকিম নিজের যে পরিচয় দিয়েছেন তা যাচাই করার সুযোগ আমাদের ছিল না। তিনি নিজেকে আরসার সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দেন। মূলত সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান থেকে টাকা আসে তার কাছে। ওই টাকায় অস্ত্র ক্রয় এবং আরসা কর্মীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন। মিয়ানমার বাহিনীর অভিযানের কারণে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করলে ঈদের দুদিন পর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় এসে আশ্রয় নেন।

তার সঙ্গে থাকা মোহাম্মাদ আলম একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন সাধারণ শরণার্থীর বেশ ধরে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কোনো শরণার্থী চিকিৎসা নিতে কক্সবাজার যেতে চাইলে চিকিৎসকের ছাড়পত্রের দরকার হয়। সড়কে চেকপোস্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সেটি দেখাতে হয়। এরপর মোহাম্মাদ আলম কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আসেন চোখের ডাক্তার দেখাতে। পরে তার সঙ্গে হাসপাতালের বাইরে আবার দেখা করেন এই প্রতিবেদক।

উল্লেখ্য, গত ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমার পুলিশের ২৪টি তল্লাশি চৌকি ও একটি সেনাঘাঁটিতে হামলা চালায় আরসা এমন অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। শুরু করে গণহত্যা। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন। এমনকি তারা মায়ের সামনে নিষ্পাপ শিশুকেও হত্যা করেছে। তাদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মুখে মুখে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কাহিনি। অনেকের শরীরে নির্যাতনের ক্ষত। বাংলাদেশ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে সব সময় রোহিঙ্গা উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান বাংলাদেশের। বিভিন্ন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযানও পরিচালনা করেছে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে