ব্লু হোয়েলের ছোবল থেকে ফিরল ৩ শিক্ষার্থী

আরও ৪ জনের সন্ধান

  ইউসুফ সোহেল

১৩ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ০৯:৪৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুইসাইড গেম ব্লু হোয়েল। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এতদিন আতঙ্ক ছড়িয়ে আসছিল অনলাইনভিত্তিক এ মরণখেলা। সম্প্রতি ঢাকায় মেধাবী ছাত্রী স্বর্ণার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের জন্যও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাটি। একে একে বেরিয়ে আসছে এর ভয়াবহতা। উদ্বেগজনক তথ্য হলোÑ সারা দেশে বর্তমানে কতজন এই মরণখেলায় মোহগ্রস্ত, তা জানা নেই কারোরই। তবে সামাজিক সচেতনতায় ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন শনাক্ত হয়েছে গত এক সপ্তাহে। বন্ধু, মা-বাবার বিচক্ষণতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দোহার থেকে তিন কিশোর-তরুণকে উদ্ধার করা হয়েছে। কাউন্সেলিংয়ের পর ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত ওই তিনজন আর কখনো এই মরণখেলায় পা বাড়াবে না বলে জানালেও ভবিষ্যৎ নিয়ে মহাদুশ্চিন্তায় আছেন তাদের স্বজনরা। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) এ মরণখেলায় আসক্ত আরও ৪ শিক্ষার্থীর খোঁজ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

দেড়মাস আগে ব্লু হোয়েল গেমে ঢুকে পড়ে মিরপুরের স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র তৌশিকুর রহমান (ছদ্মনাম)। ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢুকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে গেমের ১১তম ধাপেই খেলা বন্ধ করে দেয় মিরপুর কাজীপাড়ার বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সী ওই কিশোর। অবশেষে গেমটি মোবাইল থেকে মুছতে না পেরে সেটি ভেঙেও ফেলে সে। কিন্তু এতেও স্বস্তি পাচ্ছিল না সে। একপর্যায়ে আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দুই পাতা ঘুমের ওষুধ খেয়ে সে এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তাকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার বাবা। এ যাত্রায় প্রাণ ফিরে পেলেও তৌশিকুরের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় ঘুম নেই তার স্বজনদের।

গতকাল ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে তৌশিকুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, দেড়মাস আগে ফেসবুকে মালয়েশীয় এক বন্ধুর মাধ্যমে আমি ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের বিষয়ে জানতে পারি। এরপর ‘ডার্ক ওয়েব’ থেকে ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের লিংক বের করে তা মোবাইল ফোনে ইনস্টল করি। একে একে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করার পর গেমটির ইন্সট্রাকশন পড়ে জানতে পারিÑ খেলার শেষ পরিণতি মৃত্যু। তবুও আমি এর লেভেল ১০ পর্যন্ত যাই। যেখানে আমাকে খুব সহজ সহজ শর্ত দেওয়া হয়। তখন শর্তগুলো বেশ মজার ছিল। এর পর ১১ নম্বর স্টেপে গেলে অ্যাডমিন আমার হাত কেটে তাদের ছবি পাঠাতে বলে। কথামতো হাত কেটে ছবি পাঠালেও তারা বলে কিছুই হয়নি। বকাবকি করা ছাড়াও কঠিন কঠিন শর্ত দিতে থাকে। তারা আমাকে খুব ভোরে ছাদের রেলিং বেয়ে হাঁটতে বলে। কিন্তু আমি সাহস পাচ্ছিলাম না। তাদের আর কোনো শর্ত পূরণ করব নাÑ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে মোবাইল ফোন থেকে অ্যাপসটি মুছে ফেলতে চাই। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। পরে রাগে মোবাইলটি ভেঙে ফেলি। কিন্তু হতাশা কাটছিল না। এরপর গত মঙ্গলবার দুই পাতা ঘুমের ট্যাবলেট খাই।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি এর লিংকটি ডার্ক ওয়েব থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এই গেমে এতই মাদকতা রয়েছেÑ যারা এখনো গেমটি খেলছেন তাদের মৃত্যু অবধারিত। পুলিশ যদি তৎপর হয় তা হলে ব্লু-হোয়েলের বাংলাদেশি অ্যাডমিনদের খুঁজে বের করা অসম্ভব হবে না। আমার কাছে পরিচিত অনেকেই গেমটি খেলার আগ্রহ দেখিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারা এই গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই।
পরিবারের বরাত দিয়ে ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মুক্তাদির ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, তৌশিকুর রহমান মোবাইল, কম্পিউটার চালানোয় বেশ পারদর্শী। সারাক্ষণ সে কম্পিউটার, ফেসবুক ও ইউটিউব নিয়ে ব্যস্ত থাকত। গত ঈদের কিছুদিন পর থেকে মা-বাবা তার আচরণে পরিবর্তন দেখতে পান। ওই কিশোর নিজেই আমাদের জনিয়েছেন, সে ‘ব্লু হোয়েল‘ গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। সেখান থেকে রক্ষা পেতে সে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খায়। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার কয়েকটি সমস্যা দেখা দিলেও এখন তার অবস্থা অনেকটাই ভালো। তাকে মনোচিকিৎসকের কাছে পাঠানো হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তৌশিকুরের ব্লু-হোয়েল গেমে আসক্ত হওয়ার ঘটনাটি জানার পর ঢাকার পুলিশ কমিশনার গতকাল সকালেই কাউন্টার টেররিজম বিভাগের সাইবার ক্রাইম শাখাকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেন। তার নির্দেশে গতকাল সকালে সংশ্লিষ্ট শাখার এডিসি নাজমুল কথা বলেন ওই ছাত্র ও তার পরিবারের সঙ্গে। সেই সঙ্গে ওই ছাত্র ইন্টারনেট ব্যবহারে যে ডিভাইস ব্যবহার করত, সেটিও পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখেন তিনি। কিন্তু তৌশিকুরের আত্মহত্যার চেষ্টার সঙ্গে ব্লু হোয়েলের কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ তারা পাননি। তার আত্মহত্যার পেছনে মাদক কাজ করেছে বলে ধারণা করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।  

মায়ের সচেতনতায় রক্ষা পেল স্কুলছাত্র
নবম শ্রেণির ছাত্র রাফিন (ছদ্মনাম)। পরিবারের সঙ্গে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা সদর কলাকোপা ইউনিয়নের শুরগঞ্জ গ্রামে থাকেন ১৭ বছরের ওই কিশোর। দিনের বেশিরভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকত মোবাইল ফোনে। কয়েকদিন ধরে তার আচরণে ভিন্নতা লক্ষ করেন তার স্বজনরা। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে গত বুধবার দুপুরে ছেলেকে নিয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন রাফিনের মা। চিকিৎসকরা জানতে চাইলে রাফিন তাদের লিখে জানায়, সে ব্লু হোয়েল গেমসের প্রথম ধাপ শুরু করেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে রাফিনকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন তার মা। রাফিন এখন সুস্থ বলে জানালেও ছেলের এমন পরিণতিতে অনেকটাই চিন্তিত বলে তিনি আমাদের সময়কে জানিয়েছেন।

রাফিন আমাদের সময়কে বলেন, গত ৭ অক্টোবর দুপুরে ইন্টানেটের মাধ্যমে আমি ব্লু হোয়েল গেমসের সফটওয়ারে ঢুকে পড়ি। এ সময় মেসেজ অপশনে গিয়ে জানতে পারি, রাত ১২টার দিকে গেমসটি ডাউনলোড করতে হবে। ৯ অক্টোবর রাতে গেমসটি ডাউনলোড করি। এ সময় ওই সফটওয়্যারটিতে তার ই-মেইল আইডি, ফোন নাম্বার ও তার বিস্তারিত ঠিকানা চায়। সে সেগুলো দিলে মেসেজে জানানো হয়, সে এখন গেমসের সদস্য হয়েছে। এরপর ব্লু হোয়েলের প্রথম ধাপ পালন করতে ৯ অক্টোবর রাত ১২টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত কারো সঙ্গে কথা বলিনি আমি। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় আমি কী করেছিÑ তা লিখে মেসেজ পাঠাতে হতো। এ শর্ত পূরণ করলে ১০ অক্টোবর রাত ১২টায় গেমসের ২য় শর্ত দেওয়া হবে বলে মেসেজে জানানো হয়। কিন্তু গেমসের দ্বিতীয় শর্ত পালনের আগেই মা বিষয়টি টের পেয়ে যায়। আমি এই খেলার ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরেছি। আর কখনই খেলব না এই মরণখেলা। অতি উৎসাহিত হয়ে আর কেউ যেন এমন সফটওয়্যারে প্রবেশ না করে তারও অনুরোধ জানায় রাফিন।
নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক কামরুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক এমন একটি খবর জানিয়ে ফোন করেছিল। আসলেই ওই কিশোর ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত কিনা, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ১০ অক্টোবর আলোচিত ‘ব্লু হোয়েল গেম’-এ আসক্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিংয়ের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া ওই শিক্ষার্থীর পরিচিত বড় ভাই ইমরানের তথ্যের ভিত্তিতে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) আবদুল্লাহ আল মাসুম। তিনি জানান, গত ৫ অক্টোবর রাত ২টার দিকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আসা একটি লিংকের মাধ্যমে কৌতূহলবশত ব্লু হোয়েল গেমটি ডাউনলোড করেন তিনি। এরপর চারটি ধাপ খেলেন।

জানা গেছে, শুধু চবির ইতিহাস বিভাগের ওই শিক্ষার্থীই নয়, ব্লু-হোয়েলের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করা আরও ৪ শিক্ষার্থীর খোঁজ পেয়েছে কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ। এ ব্যাপারে তাদের কাছে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে আসক্তরা। চবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. কামরুল হুদা জানিয়েছেন, এ মরণখেলায় আসক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ৪ শিক্ষার্থীর বিষয়ে পুলিশকে অবগত করা হয়েছে। তবে তাদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি।   

গ্রিন ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আহসান হাবীব আমাদের সময়কে বলেন, শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুুলার জায়গা দিন-দিন সংকুচিত হয়ে আসায় ঘরে বসে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে তারা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র এই মরণফাঁদ তৈরি করেছে। এই মরণখেলা থেকে সন্তানদের রক্ষায় এখনই সন্তান, ভাইবোনের আচরণ ও গতিবিধির ওপর নজর রাখতে হবে। তাদের সার্বিক কার্যক্রমের ওপর খেয়াল রাখতে হবে। আসক্ত হওয়ার আগেই তাদের হাতে থাকা স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

ব্লু হোয়েল গেমটির মোট ৫০টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ৫০তম ধাপে গিয়ে বলা হয়, আত্মহত্যা করতে। আর প্রতিটি ধাপেই ব্যবহারকারীকে একটি করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত হয়ে গত ৫ অক্টোবর রাজধানীতে আত্মহত্যা করে কিশোরী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে ‘ব্লু হোয়েল’ গেম। তবে ব্লু হোয়েলের নির্দেশনায় স্বর্ণা আত্মহত্যা করেছে কিনাÑ সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত নয় পুলিশ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে