ডাচ্-বাংলায় নিয়োগবাণিজ্য

  হারুন-অর-রশিদ

১৮ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৭, ১২:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে এবং আবেদনপত্র গ্রহণ ও পরীক্ষা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দিয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। নিজস্ব কর্মীদের পদোন্নতি না দিয়ে অন্য ব্যাংকের কর্মীদের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরাসরি নিয়োগ অবৈধ না হলেও একসঙ্গে এক ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক কর্মীকে সিনিয়র পদে নিয়োগ দেওয়ায় ব্যাংকের পুরনো কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ নিয়োগের ক্ষেত্রে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র জানায়, নিজেদের কর্মীদের পদোন্নতি না দিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে সিনিয়র পদে নিয়োগ দিতে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ১৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এর মধ্যে ১৪২ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার পর ১১০ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫১ জন যোগদান করেছেন। এরা সবাই ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মী ছিলেন। আরও ১৬ জন যোগদান করতে তিন মাসের সময় চেয়েছেন।

জানা গেছে, কর্মদক্ষতার বিচারে অদক্ষতাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক কর্মীকে ছাঁটাই তালিকায় রেখেছে ব্র্যাক ব্যাংক। তাদের চাকরি ছেড়ে যেতে নানাভাবে বাধ্য করা হচ্ছে। আর ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ব্যবসা বাড়াতে নতুন নিয়োগ দেওয়া ১৪২ জনের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মীই নিয়েছে ৮৪ জন।

এদিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়া এবং পরীক্ষা গ্রহণ না করে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর এ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবেদনপত্র সংগ্রহ না করে কীভাবে মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রার্থী নির্বাচিত করা হয়েছে তা জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ করা হলেও বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদকে পর্যন্ত জানায়নি ম্যানেজমেন্ট। জোর অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) জ্ঞাতসারে বিপুল পরিমাণ অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন। কর্মীপ্রতি ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সুবিধাগ্রহণ করে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছেÑ এমনটিই বলছেন অভিযোগকারীরা। এসব বিষয়ে ব্যাংকের বক্তব্য জানতে চেয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর এমডিকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পাঠানো জবাবে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের নিয়োগে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা ভ্রান্ত তথ্যভিত্তিক ও সঠিক নয়। ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ উল্লেখ করা খুবই দুঃখজনক। অভিজ্ঞদের নিয়োগ করা সর্বগৃহীত চর্চা। এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই। তা ছাড়া সরাসরি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সার্কুলার বা নিষেধাজ্ঞা নেই। একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে কোনো হস্তক্ষেপ না করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনে এমডির দুই স্তরের নিচের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে জড়িত করা হয়নি। বোর্ড অনুমোদিত একটি নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে কর্মী নিয়োগ করা হয়। অস্বচ্ছ ও নিয়োগ বাণিজ্যের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা খুবই অবমাননাকর, অপ্রত্যাশিত, অনভিপ্রেত। এসব অভিযোগ প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।

সূত্র জানায়, বিষয়টি সত্য নয় যে, ব্যাংকের কর্মী নিয়োগে কোনো আইন নেই। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১১০ ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানির চেয়ারম্যান, পরিচালক, নিরীক্ষক, অবসায়ক, ম্যানেজার এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী ‘পেনাল কোড ১৮৬০-এর সেকশন ২১এ যে অর্থে জনসেবক (পাবলিক সার্ভেন্ট) কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে সেই অর্থে জনসেবক বলে গণ্য হবেন।’

আর জনসেবক নিয়োগে আইন রয়েছে। জনগণের অর্থে ব্যাংক পরিচালিত হয়। সরকারি অন্য কর্মকর্তা যেভাবে নিয়োগ পান, ব্যাংকেও সেভাবে নিয়োগ দিতে হবে। অবৈধ উপায়ে ঘুষ দিয়ে কেউ ব্যাংকে চাকরি নিলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়বেন। ব্যাংক পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি হবে। অসাধু কর্মকর্তারা কীভাবে ব্যাংকের টাকা তছরুপ করেছেন হলমার্ক জালিয়াতি, বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক ডাকাতিসহ এর বহু নজির রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতির ঘটনায় আমানতকারীদের লাখো কোটি টাকার বেশি জমাকৃত অর্থ বেহাত হয়ে গেছে। ব্যাংক কর্মী নিয়োগ দিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেললে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ধারায় বলা হয়েছে, আমানতকারীদের স্বার্থ পরিপন্থী ও ব্যাংকের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নির্দেশ জারি করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে এ প্রতিবেদক বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। কর্মীদের বার্ষিক মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট থেকে সর্বোচ্চ গ্রেড দেওয়ার সীমা ঠিক করে দেওয়া হয়। এ জন্য অনেক ভালো কাজ করেও নিম্ন গ্রেড পেয়ে পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেকে। কর্মী ব্যবস্থাপনায় চরম অরাজকতার কারণে প্রাপ্ত বেতনের চেয়ে কম বেতনে অন্য ব্যাংকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। চলে যাওয়ার সময় তাদের দেওয়া ‘রিজাইন লেটার’-এ তীব্র ক্ষোভের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

এক কর্মকর্তা তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন, এই ব্যাংকে কর্মীদের সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। ম্যানেজমেন্টের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লেজুড়বৃত্তি করেন এমন কর্মীদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। কর্মী মূল্যায়নে পর পর ২ বছর সর্বোচ্চ গ্রেড পেলেও পদোন্নতির বছরে আমাকে সর্বনিম্ন গ্রেড দেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, যখন তখন চাকরি যাওয়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে নিয়মে পরিণত হয়েছে। বর্তমান এমডি যোগদান করার পর তার অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত বেশ কয়েকজনের চাকরি গেছে কোনো কারণ ছাড়াই। হঠাৎ করে অনেককে অন্যত্র তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে।

ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা আরও জানান, ব্র্যাক ব্যাংক কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বেশ কিছুদিন আগেই। ইতোমধ্যে ওই ব্যাংক থেকে অনেক কর্মকর্তা অন্য ব্যাংকে চলে গেছেন। ছাঁটাই তালিকায় থাকা কর্মকর্তাদের উচ্চ বেতনে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার জন্য কীভাবে ১৫২ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে? নিয়োগ পাওয়া ১১০ জনের মধ্যে ৮৪ জনই ব্র্যাক ব্যাংকের। অন্য ব্যাংকে যারা অদক্ষ হিসেবে চিহ্নিত তাদের কেন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে?

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এমডি আবুল কাশেম মো. শিরিন বলেন, সরাসরি কর্মী নিয়োগ দেওয়া যাবে না, আইনে এমন বিধিনিষেধ নেই। ব্যাংকের প্রয়োজনে অভিজ্ঞদের নেওয়া হয়েছে। এতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ব্র্যাক ব্যাংক নিজেদের কর্মী ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের পছন্দমতো চাকরি পরিবর্তনের স্বাধীনতা রয়েছে। এটি থাকা উচিত।

ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম আরএফ হোসেন বলেন, কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্সের বিষয়টি কঠিনভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ব্র্যাক ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট। এ জন্য ব্যাংকটির সব সূচকের প্রবৃদ্ধি অনেক ভালো। নতুন ব্যবসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন এই পরিবেশে যারা খাপ খাওয়াতে পারছেন না, তারা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ব্যাংকটিকে ভালো করতে গত দুবছরে ২ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে অনেকে আবার অন্য ব্যাংকে চলে গেছেন। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ৫০ জনের মতো গেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, ব্যাংকে চাকরিতে প্রবেশের (এন্ট্রি লেভেল) প্রথম ধাপে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিমালা রয়েছে। এর পরের ধাপগুলোতে কর্মকর্তারা নিজেদের যোগ্যতা অনুসারে বিভিন্ন ব্যাংকে যাচ্ছেন। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই দেখবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে