কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ

  আরিফুজ্জামান মামুন

১০ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৭, ১৮:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংলাপে প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তৎপরতা শুরু করেছেন কূটনীতিকরা। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও করছেন। তারা বৈঠক করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। কোন প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায় এমন একটি গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়াও খুঁজছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু দেখতে চায়। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। বর্তমান সংবিধানের আলোকে আগামী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ার কথা। ক্ষমতাসীনরা এগোচ্ছে সে পথেই। সংসদের বাইরে ও মাঠের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ইতোমধ্যে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি করে আসছে দলটি। সহায়ক সরকার কী রকম হবে সে বিষয়ে প্রস্তাব না দিলেও বিভিন্ন ফোরামে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কথা বলছে। বিএনপির এ অবস্থানকেও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন কূটনীতিকরা।

গত ৬ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমাস এ শ্যানন জানতে চানÑ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যাবে কিনা? নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো শর্ত আছে কি? কোন অবস্থায় তারা নির্বাচনে যেতে চায়? সূত্র জানায়, বিএনপির পক্ষ থেকে কোন অবস্থায় নির্বাচনে যেতে চায় তা বলা হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন কেন সুষ্ঠু হবে না তার ব্যাখ্যা দেয় দলটি। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের বিধান পৃথিবীর কোথাও নেই দাবি করে এর পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরা হয়। একটি সহায়ক সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করে দলটি। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন দেখতে চায় বলে শ্যানন জানান।

এদিকে গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। সেদিন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বৈঠক করেন সুষমার সঙ্গে। সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায় ভারত। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও মত দেন তিনি। বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে চায় না দেশটি বলে মন্তব্য করেন সুষমা। এ ছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বিভিন্ন সময় বলেন, ভারত বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না দেশটি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন ছিল এবং সে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না। যদি আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক না হয় সে ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান কী হতে পারে? এমন প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনৈতিক আমাদের সময়কে বলেন, ভারত জাতিসংঘের মতো কাজ করে না। জাতিসংঘও নয়। ফলে কোনো সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া না-দেওয়ার বিষয় এখানে আসে না। কে ক্ষমতায় আসবে না-আসবে সেটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এবং দেশটির জনগণের বিষয়। ভারত সব সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে। এমনকি সামরিক সরকারের সঙ্গেও। ভবিষ্যতেও যে কোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে ভারতের আপত্তি নেই।

এদিকে দেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাজনীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করেন মার্কিন কর্মকর্তারা। ১ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ সফরে থাকা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সফরের সমাপনী দিনে ৪ নভেম্বর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণ এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের অবাধ সুযোগ ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে কথা হয়। আসন্ন নির্বাচনে ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ তার পছন্দের নেতা নির্বাচন করতে পারেন, অন্তত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং ফলে ভোটারদের প্রকৃত রায়ের প্রতিফলন ঘটেÑ এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ অনুভব করেন। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন দেশটির গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম ব্যুরোর ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি স্কট বাসবি। সঙ্গে ছিলেন মার্কিন দূতাবাসের রাজনীতি বিভাগের কাউন্সেলরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশে সংস্থাটির ডেলিগেশন প্রধান ও রাষ্ট্রদূত রেনজি টিরিংক ১৮ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে সামনের বছর বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন হবে উল্লেখ করে বলেন, এটি দেশের জন্য কঠিন সময়। নির্বাচনের সময় আমন্ত্রণ জানালে পর্যবেক্ষক পাঠাবে ইইউ। আগামী নির্বাচনের এখনো অনেক সময় বাকি। সুতরাং এ নিয়ে মন্তব্য করার এখনই উপযুক্ত সময় নয়। তবে ইইউ সব সময় একটি গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ইসিকে সহায়তা করার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে কারিগরি সহায়তা করতেও প্রস্তুত রয়েছে সংস্থাটি। জাতিসংঘের কাছে পাঁচটি বিষয়ে সহায়তা চেয়েছে ইসি। ভোটার নিবন্ধন, পাবলিক আউটরিচ স্ট্র্যাটেজি, কনফ্লিক্ট মিটিগেশন স্ট্রাটেজি, ক্ষুদ্র জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীসহ সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণে ইসির সক্ষমতা বাড়ানো এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণে ইসির সক্ষমতা বাড়ানো এ পাঁচটি বিষয়ে সহায়তার কথা বলা হয়। এক চিঠিতে জাতিসংঘ ২০১৮ সাল থেকে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রকল্পভিত্তিক কাজ করবে বলে জানিয়েছে।

গত ২০ জুন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ডি ওয়াটকিনসের নেতৃত্বে প্রায় ২০ জন প্রতিনিধি কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে বেশকিছু দেশের রাষ্ট্রদূতও উপস্থিত ছিলেন। মানসম্মত এনআইডি, ভোটার সচেতনতা কার্যক্রম, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণসহ ১০ ধরনের কারিগরি সহযোগিতা চাওয়া হয় ইসির পক্ষ থেকে। বৈঠক শেষে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ডি ওয়াটকিনস বলেন, আমরা নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করার জন্য সব ধরনের কারিগরি সহায়তা করতে চাই। এরপর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘকে চিঠি পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের (ডিপিএ) ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্টেনস ডিভিশনের (ইএডি) একটি নিডস অ্যাসেসমেন্ট মিশন বাংলাদেশে আসে। মিশন গত ২৪ জুলাই থেকে ২ আগস্ট বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন, কমিশনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। পরে তারা একটি প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি বিষয়ে কারিগরি সহায়তার সুপারিশ করা হয়। এ সুপারিশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘ অনুমোদন করেছে।

বিদেশি তৎপরতা ও আগামী নির্বাচন সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচন এলে বিদেশিরা তৎপর হয়ে ওঠেন। এখন বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করছেন। কিন্তু দেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাদের এ উদ্যোগ সফল হবে বলে আমি মনে করি না। অতীতেও তাদের উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখেনি। আমাদের দেশে কখনই দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির নেই। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে না বলে আমি মনে করি। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি নির্বাচন বিষয়ে সমঝোতা না হয় তা হলে কোনো উদ্যোগ কাজে আসবে না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে