প্রধান বিচারপতি নিয়োগ বিলম্বিত হতে পারে

  কবির হোসেন

১৪ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৭, ১৭:৩৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা খারিজের ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগও বিলম্বিত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এমনই আভাস দিচ্ছে।

বিচারপতি সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা খারিজের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি একটি সিদ্ধান্ত দেবেন জানিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল সন্ধ্যায় আমাদের সময়কে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি অবশ্যই প্রধান বিচারপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা খারিজের বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত জানাবেন। বঙ্গভবন থেকে এ রকম সিদ্ধান্ত এখনো আমার কাছে আসেনি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রধান বিচারপতি সিনহা পদত্যাগ করেছেন গত শুক্রবার। পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছে পরের দিন শনিবার। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা খারিজের কোনো তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। পদত্যাগপত্র গ্রহণ এবং নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয় নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে সংবিধানের বিধানসহ নানা দিকের। খাতিয়ে দেখা হচ্ছে অনেক কিছুই। এসব হিসাব-নিকাশের কারণে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগের বিষয়টি বিলম্বিত হতে পারে।

সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে তা কত দিনের মধ্যে পূরণ করতে হবে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এ অনুচ্ছেদে বলা আছেÑ ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন।’ সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে কী করণীয়, সে ব্যাপারে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে।

৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে প্রধান বিচারপতি তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোন ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপীল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।’

এর আগে ২ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা যখন ছুটিতে যান, তখনই রাষ্ট্রপতি সংবিধানের এ অনুচ্ছদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্্হাব মিঞাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন। এখনো তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু গত শুক্রবার প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগের পর প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে পদটি শূন্য ঘোষণা করা হয়নি। আবার রাষ্ট্রপতি নতুন কাউকে এ পদে নিয়োগও দেননি।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘সংবিধানে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ কত দিনের মধ্যে করতে হবে, কীভাবে হবে তা বলা নেই। শুধু বলা আছে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। সংবিধান প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিÑ এ দুটো নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতা দিয়েছে। সে জন্য রাষ্ট্রপতি যখন মনে করবেন, তখন নিয়োগ দেবেন। এ ক্ষেত্রে কেউ বলতে পারবে না যে, দ্রুত নিয়োগ দেন।’ অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, এখন যে বিচার বিভাগ ভারমুক্ত হয়েছে, এটাই বড় বিষয়। ৯৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছেÑ ‘যে পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই দায়িত্ব পালন করবেন।’

তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন সিনিয়র আইনজীবীরা। এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও সংসদের) একটির প্রধান। প্রধান বিচারপতি হলেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির কোনো শপথও নেই। কিন্তু কিছু পদ আছে, যেসব পদে দায়িত্ব গ্রহণের আগে প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে শপথ নিতে হয়। যেমন হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ হলে তাদের শপথ পড়াতে হয়। কিন্তু শপথ না থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি শপথ পড়াতে পারেন না। তাই কিছু সমস্যা আছে। আমার মনে হয়, কালক্ষেপণ না করে শিগগিরই যাতে শূন্য পদ পূরণ হয়ে যায়, রাষ্ট্রপতি সে পদক্ষেপ নেবেন। এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করা উচিত হবে না।’

আবার প্রধান বিচারপতির শূন্য পদ পূরণের ব্যাপারে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের মত হচ্ছে, ‘যত দ্রুত সম্ভব প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবে এ পদ পূরণে তিন থেকে চার দিনের বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। এ সময়ের মধ্যে অবশ্যই নিয়োগ দিতে হবে।’ কত দিনে নিয়োগ দিতে হবে, সে ব্যাপারে সংবিধানে তো কোনো কিছু উল্লেখ নেই, তা হলে কেন এমন মনে করছেনÑ জানতে চাইলে ড. মালিক বলেন, ‘সবই সংবিধানে লেখা থাকবেÑ এমন ধারণা সঠিক নয়। এটা একটা কমন সেন্স। সংবিধানে এটা লেখা থাকবে না। কিন্তু এটা তো রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদ। এ পদ খালি থাকাটা অস্বাভাবিক।’

ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির শপথ থাকা না-থাকার ব্যাপারে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘সাহাবুদ্দীন সাহেব প্রধান বিচারপতি থেকে যখন রাষ্ট্রপতি হলেন, তখন বদরুল হায়দার চৌধুরী ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে বদরুল হায়দার চৌধুরীর কী কাজ করতে কোনো সমস্যা হয়েছে?

এর আগে গত রবিবার অ্যাটর্নি জেনারেল প্রধান বিচারপতির শূন্যপদ পূরণের ব্যাপারে অস্থির না হওয়ার জন্য বলেন। তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির শূন্য পদ পূরণের বিষয়ে অস্থির হওয়ার কারণ নেই। প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ এক সপ্তাহও পার হয়নি। কাজেই ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত যিনি আছেন, তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি কাউকে নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাবেন।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে