নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায়

  আলী আসিফ শাওন ও সানাউল হক সানী

১৪ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৭, ০০:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না বলে আবার জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসে আবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানান তিনি। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা খালেদা জিয়ার দাবিকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে বেশ জোর দিয়েই বলছেন, সংবিধান মোতাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, বর্তমান অবস্থানে অনড় থাকতে পারবেন না খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক মেঠো বক্তব্যে যত যাই বলুক আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। এমন বিতর্কের মধ্যে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিকÑ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, আগামী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হবে না, হাসিনার অধীনে তো নয়ই। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। গত রবিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিএনপির নির্বাচন বর্জনের সুযোগ নেই। তাই শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে আসবে। আর যদি নাও আসে, তাও যথাসময়ে নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত তার বক্তব্যে অটল থাকতে পারবেন না। তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। তা না হলে তার দল অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দাবি অযৌক্তিক মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য আমাদের সময়কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পৃথিবীর অন্য দেশে এভাবেই নির্বাচন হয়। এ অবস্থান থেকে সরে আসার উপায় নেই। এখান থেকে সরতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সেটি সম্ভব নয়। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে না এলে সেটি বিএনপিদলীয় ব্যাপার। সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। এ অবস্থান থেকে এক চুলও সরা হবে না।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর সুবিধা করতে না পেরে বিএনপি বলেছিল, তারা সরকার মানে না, সংসদ মানে না, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো কিছুই তারা মানে না। কিন্তু দলটি সেই অবস্থান থেকে অনেক সরে এসেছে। বর্তমান সরকারের অধীনেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ২৩টি শর্ত মেনে রবিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশেও অংশ নিয়েছেন খালেদা জিয়া। এখন তিনি বর্তমান সরকার, সংসদ এ সরকারের অধীনে সবকিছুই মেনে নিয়েছেন। খালিদ বলেন, খালেদা জিয়া মূলত রাজনীতিতে আর নেই। তিনি এখন তার নিজের এবং পুত্র তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলার সাজার হাত থেকে বাঁচার জন্য সরকারবিরোধী চক্রান্ত করছেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও তা ঠেকানোর ঘোষণা দেয়। তবে সফল হয়নি এবং বর্তমান সরকার প্রায় চার বছর ধরে ক্ষমতায়। এর আগে গত এক বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে বিএনপি সহায়ক সরকারের দাবি করে আসছিল। কিন্তু ওই সরকারের রূপরেখা কেমন হবে তা স্পষ্ট করতে না পারায় আবার নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়কের দাবি করছেন বিএনপি নেতারা। রবিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আর এ কারণে তার অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি।

আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কশিনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। তাই অন্য কারো কাছে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনো সুযোগ বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নেই। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই স্বপদে বহাল থাকবেন। এ বিষয়ে সংবিধানের দ্বিতীয় পরিচ্ছদের ৫৭-এর ৩ ধারায় বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করিবে না।’

২০১১ সালের ১৪ নম্বর আইনের ২১ ধারাবলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী তথা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করা হয়।

সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতারা মনে করেন, মুখে যত যাই বলুক নিজ দলের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে শেখ হাসিনার অধীনেই আগামী নির্বাচনে আসবে খালেদা জিয়ার বিএনপি। এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার আমাদের সময়কে বলেন, পাঁচ বছর পর পর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন দল তাদের মতো করেই নির্বাচনমুখী কথা বলে। জনগণের মন জয় করার চেষ্টা করে। বিএনপি প্রধান নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তাদের দলের মনোভাব বলেছেন। তবে রাজনীতিতে থেমে থাকা বা নিষ্ক্রিয়তা মানে পশ্চাৎপদতা। সময়ের সঙ্গে রণকৌশল পরিবর্তন হয় বিভিন্ন দলের। আমি বিশ্বাস করি বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনে আসবে। আমরা নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। সবার কাছে যাতে এ নির্বাচন সমাদৃত হয়। দেশে বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়। আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিশ্বাসী।

নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলের বর্তমান কথাবার্তাকে রাজনৈতিক মেঠো বক্তৃতা আখ্যা দেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচন নিয়ে বর্তমানে যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছে সবই রাজনৈতিক কথাবার্তা। নির্বাচনের রূপরেখা কী হবে তা দেখার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সব দলকে নিয়েই নির্বাচন করতে হবে। গতবারের মতো যদি আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা কখনই গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে দেশের কল্যাণের জন্য সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরস্পরবিরোধী এ অবস্থানকেই স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে এর থেকে ভিন্ন কোনো বক্তব্য আমি আশা করিনি। কারণ দুই দল রাজনৈতিক দরকষাকষির স্বার্থে নিজ নিজ অবস্থানে অনমনীয় থাকবে এটাই স্বাভাবিক। নিজেকে আশাবাদী নাগরিক দাবি করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমি মনে করি, দেশের গণতন্ত্রিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই দলই অংশগ্রহণ করবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে