টিএসসির মিলনমেলা আজ আর নেই

  মেহেদী হাসান

১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর সংস্কৃতি ও মেলবন্ধনের প্রাণকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি); গভীর রাত পর্যন্ত বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে থাকে। এ ছাড়া বাইরের অনেকেও এখানে আসেন সংস্কৃতিচর্চা করতে বা আড্ডা দিতে। কিন্ত সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে রাত ৮টার পর বন্ধ করে দিচ্ছে সকল খাবার ও চায়ের দোকান। শিক্ষার্থীদেরও এ সময়ের পর আড্ডা দিতে নিষেধ করা হচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। ফলে রাতের বেলা প্রাণহীন নীরবতা বিরাজ করছে এলাকাজুড়ে। টিএসসির ঐতিহ্যের সঙ্গে যা খুবই বেমানান। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিনের ক্লাস কিংবা পরীক্ষা শেষ করে শিক্ষার্থীদের অনেকেই টিএসসিতে গিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেন। তাদের গান-বাজনা, অভিনয়, আবৃত্তিতে প্রাণবন্ত হয়ে থাকে পুরো এলাকা। মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডায় সরগরম থাকে টিএসসি। কিন্তু এখন রাত ৮টা বাজলে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সব দোকান। এমনকি শিক্ষার্থীদেরও টিএসসি ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রবিবার রাত ১১টার দিকে টিএসসিতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েক শিক্ষার্থী। এ সময় প্রক্টরিয়াল টিম এসে জানতে চায়, তারা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিনা। তারা প্রতিষ্ঠানটিরই শিক্ষার্থী এবং হলে থাকেন জানার পর বলা হয়, দ্রুত টিএসসি ত্যাগ করে যার-যার হলে গিয়ে আড্ডা দিতে।

ঘটনাস্থলে থাকা এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটিতে পড়াশোনা করছি আমি। তাই ক্যাম্পাসের সকল স্থানে ঘুরে বেড়াতে পারা আমার অধিকার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তার অজুহাতে আমার সে অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের টিএসসি থেকে চলে যেতে বলেছে। তারা এটা করতে পারেন না। এটা না করে বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের সড়ক দিয়ে যেসব গণপরিবহন চলে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আমরা বেশি নিরাপদ থাকব।

টিএসসির একাধিক চায়ের দোকানদার এবং ভ্রাম্যমাণ হকারদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানায়, সারা দিনে যা বিক্রি হয়, তার চেয়েও বেশি বিক্রি হয় সন্ধ্যার পর। অথচ রাত ৮টার মধ্যেই দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রক্টরিয়াল টিম রাত ৮টার পর এসে দোকান বন্ধ করে দেয়। আগের মতো লোকসমাগম না থাকায় তাদের বিক্রি অনেক কমে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক শিক্ষার্থীরাও। তারা বলছেন, টিএসসির সৌন্দর্য হলো শিক্ষার্থীদের আড্ডা। কিন্তু প্রশাসন নানা নিয়মনীতি দেখিয়ে সেটা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনটা হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি এর ঐতিহ্যবাহী স্বকীয়তা হারাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তুহিন কান্তি দাস বলেন, সব কিছু বন্ধ করে দিয়ে প্রশাসন বিশ^বিদ্যালয়কে রক্ষণশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে ফুলার রোড, হলের দোকান, পলাশী মোড়ের দোকান এবং সর্বশেষ টিএসসির দোকানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মুক্ত জ্ঞানচর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটা বিশ^বিদ্যালয়ের জন্য শুভ নয়। আমরা যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে টিএসসি এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থগার ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি জানাই।

তবে আড্ডা বন্ধের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রাব্বানী বলেন, কিছু বহিরাগত যুবক-যুবতী মোটরসাইকেল নিয়ে এসে টিএসসিতে আড্ডা দিচ্ছিল। আমরা তাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেছি। আর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাদের বলেছি হলে চলে যেতে।

দোকান বন্ধের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। আমার অফিস থেকে এ রকম কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। টিএসসির সংগঠনগুলোর কার্যক্রম রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে নোটিশ দেওয়া হলে পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানান প্রক্টর।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

টিএসসির পরিচালক মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমাদের দপ্তর থেকে কাউকে এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে