ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাগরিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না- মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ১৯৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারে বাধা দেওয়া হয়েছে। ভাষণ বাজাতে গিয়ে অনেকে জীবন পর্যন্ত দিয়েছে। আজকে জাতিসংঘের ইউনেস্কো এই ভাষণকে বিশ^ ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইতিহাস-ইতিহাসই। আজকে সেটিই প্রমাণ হয়েছে। ইতিহাস বিকৃত করতে চাইলে ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়।

গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্বীকৃতি পাওয়ায় নাগরিক কমিটি এ সমাবেশের আয়োজন করে। শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী এবং বাংলাদেশে ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিট্রিস কালদুল।

নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেওয়া ‘ধন্যবাদ স্মারক’ পাঠ করেন এবং সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পর বেলা পৌনে ৩টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় সমাবেশ। পবিত্র চার ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের পর শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা পরিবেশন করেন সমবেত দেশাত্মবোধক সংগীত। নিজের লেখা ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতা আবৃত্তি করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। প্রয়াত সব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। প্রায় ৯০ ফুট লম্বা নৌকাকৃতির মঞ্চে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে সংগীত পরিবেশন করেন নজরুলগীতি শিল্পী শাহীন সামাদ, লোকসংগীত শিল্পী মমতাজ বেগম এমপি, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাজেদা আকবর ও ভাওয়াইয়া শিল্পী অনিমা মুক্তি গোমেজ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও ডা. নুজহাত চৌধুরী।

ইতিহাস বিকৃতকারীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ৭ মার্চের ভাষণটি আজকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছেÑ এতে কি তাদের লজ্জা হয় না? তারা একদিন এই ভাষণ বন্ধ করে দিয়েছিল? জানি না তাদের লজ্জাশরম আছে কিনা? অবশ্য এরা বাংলাদেশে বাস করলেও পাকিস্তানেরই প্রেতাত্মা। তাই তারা ইতিহাস বিকৃতি করতে চেয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে থাকলেও পাকিস্তানের তোষামোদী ও চাটুকারিতার দল এরা।

সরকারপ্রধান বলেন, আজকে এই স্বীকৃতি শুধু ৭ মার্চের ভাষণের নয়, গোটা বাঙালি জাতি, মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তি সম্মানিত হয়েছে।

দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা অনুরোধ থাকবে আর যেন পাকিস্তানের প্রেতাত্মা, পদলেহনকারী, তোষামোদকারীদের দল বাংলার মাটিতে ইতিহাস বিকৃত করতে না পারে, সে জন্য সমগ্র বাংলার মানুষকে জাগ্রত থাকতে হবে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলে যে একটি দেশের উন্নয়ন হয়, তা আমরা প্রমাণ করেছি। একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এর আগে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরাজয় চেয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আজকে আমরা সারা বিশে^ গর্বিত জাতি। আমাদের গর্বিত, উন্নত শির যেন পরাজিত না হয়, পুরো বাঙালি জাতিকে সেই ভাবে গড়ে তুলতে হবে। নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতাকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। বক্তব্যের শেষ দিকে হঠাৎ এক ফালি সূর্যের আলো প্রধানমন্ত্রীর ওপর এসে পড়ে। তিনি তখন সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলেন, এতক্ষণ মেঘে ছেয়ে ছিল। আজকে আমাদের সূর্য নতুন করে দেখা দিয়েছে। এই সূর্য এগিয়ে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে।

ইউনেস্কো ও যে দেশগুলো ভোট দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাদের ধন্যবাদ দেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বে স্বীকৃতি পাওয়া অধিকাংশ ভাষণ ছিল লিখিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লিখিত ছিল না। এই ভাষণের জন্য কোনো ‘নোটস’ও বঙ্গবন্ধুর হাতে ছিল না। ৭ মার্চে ভাষণ দেওয়ার আগে আমার মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাবাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন অনেকে অনেক কিছু বলছে। কিন্তু তুমি তাই বলবে, যা তুমি ভালো মনে করো।

আধাঘণ্টার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা আন্দোলনে বীর শহীদ, সব মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। স্মরণ করেন ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য ও জেলহত্যার শিকার ৪ জাতীয় নেতাকে। অনুষ্ঠানটি নাগরিক সমাবেশ হলেও দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধি এবং আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিপুল নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত মহাসমাবেশে পরিণত হয়। নাগরিক এই সমাবেশটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সমাবেশস্থলকে উৎসবমুখর করতে ব্যাপক সাজসজ্জা করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভের সামনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীকের আদলে স্থাপিত বিশালাকৃতির নৌকা সবার দৃষ্টি কাড়ে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য সামনে স্থাপন করা হয় আলাদা একটি মঞ্চ। সমাবেশ কার্যক্রম সরাসরি প্রচারে সমাবেশস্থলে লাগানো হয়েছিল কয়েকটি বড় বড় এলইডি মনিটর। সমাবেশ ঘিরে সকাল থেকেই পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় নিñিদ্র নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়। বেলা আড়াইটায় সমাবেশের সময় নির্ধারণ করা হলেও দুপুর ১২টার পর থেকেই ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নামে মিছিলের স্রোত। সমাবেশে আসা হাজার হাজার মানুষের গায়ে ছিল রক্তস্নাত জাতীয় পতাকার রঙ লাল-সবুজের গেঞ্জি ও টুপি। এমনকি সমাবেশের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পরে এসেছিলেন জাতীয় পতাকার রঙ লাল-সবুজের শাড়ি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে