মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে যত ভোগান্তি

  রুমানা রাখি ও সানাউল হক সানী

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৫:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযোদ্ধা এসকে আলম। বয়স ৬৫। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চল ফাজিলপুরে বাড়ি। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তার সব তথ্য ঠিক থাকলেও ভুল কেবল পিতার নামে। এই ভুল সংশোধনের জন্য এ বছরের জানুয়ারিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ওই সময়ে বলেন এক মাসের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রায় বছর শেষ হতে চললেও ভুল সংশোধন হয়নি। এই কাজে প্রায় প্রতিমাসেই তাকে ঢাকায় আসতে হয়। এতে আর্থিক খরচের পাশাপাশি শারীরিকভাবেও তিনি ক্লান্ত। বৃদ্ধ বয়সে এমন হয়রানির প্রতিকারে দ্বারস্থ হন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর। মন্ত্রী দুবার সুপারিশ করলেও আমলে নেননি কর্মকর্তারা। তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ভুলটি সংশোধন করতে পারেননি। যুদ্ধজয়ের অপেক্ষা ৯ মাসে শেষ হলেও স্বাধীন দেশে তার পিতার নামের ভুলটি ঠিক করতে পারেননি এক বছরেও। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘তা হলে কি যুক্তিযুদ্ধের চেয়ে পিতার নামের ভুল সংশোধন করাটা আরও কঠিন যুদ্ধ, নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে যে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো সেই প্রজাতন্ত্রের কর্মীদের দায়িত্ব অবহেলার কারণে এমনটি হচ্ছে।’

মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের নিচতলায় তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। সরেজমিন গত রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গেছে এমন অনেক করুণ চিত্র। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ ‘নাম মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ হলেও কাজ সেই চেতনার সঙ্গে মিলছে না। কাজের কোনো গতি নেই। সিদ্ধান্ত দিতে দেরি হচ্ছে। ফলে বাড়ছে মুক্তিযোদ্ধাদের হয়রানি।

মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অন্য যে কোনো মন্ত্রণালয় থেকে আমার মন্ত্রণালয় আলাদা। সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য আমার রুম সব সময় খোলা থাকে। সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে অন্য যারা আছে তাদেরও এই নির্দেশনা দেওয়া আছে। তাই এখানে এসে কেউ ভোগান্তিতে পড়–ক চাই না। তার পরও কেউ পড়লে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়েকদিনের চিত্র মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হলে তিনি জানান, এসব আমার অগোচরে হয়। এত লোক সামলানোও কঠিন। তাই হয়তো কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে কেউ তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না।

রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের পেছনে সচিবালয় সংযোগ সড়ক। এর পাশেই পরিবহন পুল ভবনের ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ‘মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়’। ভবনের নিচে প্রায় প্রতিদিনই শত শত মুক্তিযোদ্ধার জটলা দেখা যায়। এ তালিকায় রয়েছে যুদ্ধাহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধারাও। মন্ত্রণালয়ের ফ্লোরে দিনের পর দিন ঘুরে ক্লান্ত তারা। ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত, বয়সের ভারে ন্যুব্জ অনেক মুক্তিযোদ্ধাই শেষ বয়সে অন্তত একটু শান্তি চান। সরকারি সুবিধাটুকু নির্বিঘেœ পেতে চান। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রকাশিত গেজেটে ভুল থাকলে সেটি পাওয়া যায় না। এ কারণে তারা দ্রুত তালিকার ভুল সংশোধনের সুযোগ চান।

কেবল মুক্তিযোদ্ধারাই নয়, এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার স্বজনও আসেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য দাখিল করা আবেদনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া, প্রত্যয়নপত্র, সাময়িক সনদ, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্লট, ফ্ল্যাট প্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে সনদ যাচাই, ভুল সংশোধনসহ নানা কাজে আসেন তারা। প্রায় প্রত্যেককেই নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, অনেক কর্মকর্তা তাদের রুমেই প্রবেশ করতে দেন না। কেবল একটি তথ্য জানার জন্য অপেক্ষা করতে হয় দিনের পর দিন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশ রক্ষায় নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন তারাই এখানে অসহায়। বৃদ্ধ বয়সে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগে জর্জরিত ক্লান্ত অবসন্ন দেহ আর চলতে চায় না। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কেউ-কেউ মেঝেতে কাঁধের ব্যাগ মাথার নিচে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন ভবনের নিচতলার মেঝেতে কিংবা ষষ্ঠ তলার হেল্প ডেস্কের পাশে রাখা বেঞ্চিতে। অনেকে হেলে পড়েন দেয়ালের কার্নিশে। সবার অবসন্ন চোখ। একটু নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য সব জমানো ক্ষোভ তারা রেখে দিচ্ছেন নিজের মধ্যেই। অনেকে আবার প্রতিবাদও করছেন। গত মঙ্গলবার ষষ্ঠ তলায় হেল্প ডেস্কের পাশেই উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম। তার আক্ষেপ সব ঠিক আছে, কেবল গ্রামের নাম ভুল হয়েছে গেজেটে। এটি সংশোধনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত ত্রিশবারের বেশি তিনি সুনামগঞ্জ থেকে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে। কাজ হচ্ছে না। তার আক্ষেপ, জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু তার কোনো প্রতিদান চান না। কিন্তু এমন অবহেলা তাদের কাম্য নয়। সবারই অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটু দায়িত্বশীল আচরণ বদলে দিতে পারে তাদের সব চাওয়া পাওয়ার কাহিনী। দূরদূরান্ত থেকে আসা এসব মুক্তিযোদ্ধার মিলবে প্রশান্তি।

হাজী ফরহাদ হোসেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রায় চার মাস। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভাতা পাচ্ছেন। গেজেটে তার নম্বর ছিল ২৯০৭। কিন্তু সর্বশেষ গেজেটে তার নতুন নম্বর হয়েছে ২৯১১। এতেই আটকে গেছে তার ভাতা। দিনের পর দিন মন্ত্রণালয় ঘুরেও এর সমাধান করতে পারেননি। ফরহাদ হোসেন বলেন, এভাবে সম্মান বিনষ্ট করে ঘুরতে আর ভালো লাগে না। কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথাও বলা যায় না। আমি তো কোনো ভুল করিনি।

মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সনদ বা সাময়িক সনদের ভুল সংশোধনে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর আসছেন। কিন্তু সংশোধন প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। ষষ্ঠ তলায় মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রীর রুমের সামনে অপেক্ষায় ছিলেন আরবাজ হোসেন। তিনি বলেন, তার নামে কেবল একটি অক্ষর ভুল এসেছে। এটি ঠিক করার জন্য বছরের পর বছর ঘুরছেন। কিন্তু ভুল আর সংশোধন হয়নি। বয়স হয়েছে। এখন আর আগের মতো শক্তি পান না। কিন্তু তার পরও নিয়ম করে আসতে হয়। ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন, চারদিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ছড়াছড়ি। আমাদের এত কষ্ট করতে হলেও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো কষ্ট করতে হয় না।

এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মিজানুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, সবাইকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। লাল মুক্তি বার্তায় মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত আছে কিনা? প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সনদ এবং ভারতের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত আছে কিনা তা যাচাই করে তালিকাভুক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু অনেক মুক্তিযোদ্ধাই এ সংক্রান্ত দলিল ও কাগজ দাখিল করতে ব্যর্থ হন। আবার অনেকের আবেদনে নাম, ঠিকানা, পিতার নাম ভুলসহ সংশ্লিষ্ট দলিল ও কাগজ দাখিলে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। এসব ভুল সংশোধনে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে