খাদ্যশস্যের বাস্তব মজুদ কত

  মো. মাহফুজুর রহমান

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ১২:০৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ মুহূর্তে সরকারি গুদামে প্রায় চার লাখ টন চালের মজুদ আছে বলে খাতাপত্রে দেখানো হলেও বাস্তবে আছে কিনা, তা নিয়ে সন্দিহান খোদ খাদ্য বিভাগ। গুদামের ‘বাস্তব মজুদ’ পরিস্থিতি জানতে চেয়ে সারা দেশের এলএসডি ও সিএসডি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।

গত ৩০ নভেম্বর খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত ওই চিঠি (স্মারক নং- ১৩.০১.০০০০.০৮৪. ৩২.০১৬.১৭.২১৪) পাঠানো হয়েছে মাঠপর্যায়ে। সরকারি গুদাম থেকে একের পর এক খাদ্যশস্য লোপাটের ঘটনায় বিব্রত সরকার। পরিস্থিতি সামলাতে এ চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা।

গুদামের ‘বাস্তব মজুদ পরিস্থিতি’ জানতে চেয়ে খাদ্য বিভাগের এ চিঠি প্রকারান্তরে এতদিন উল্লিখিত মজুদকে ‘অবাস্তব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে কিনাÑ এমন প্রশ্নে খাদ্য বিভাগের পরিচালক (সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন) কাজী নুরুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, সম্ভবত এটি শব্দগত ভুল।

খাদ্য বিভাগের পরিচালক পদমর্যাদার আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্য লোপাটের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় মজুদের বাস্তব পরিস্থিতি জানতে চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। খাদ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে অবাস্তব মজুদ বিতর্কের সৃষ্টি কিনাÑ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা তা স্বীকার করেন।

বেড়ায় যখন ক্ষেত খায় : টানা তিন বছর ধরে ধাপে ধাপে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার দৌলতগঞ্জ খাদ্যগুদামের সাত কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ১ হাজার ৮০০ টন সরকারি চাল আত্মসাৎ করা হয়। খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ অডিট টিমের কাছে এ বছর এপ্রিলে এ দুর্নীতি ধরা পড়ে। অডিট টিম সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘসময় ধরে মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে বিভাগীয় খাদ্য প্রশাসনের যারা এ গুদামসংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাদের অসততা অথবা দায়িত্বহীনতা ছাড়া এত বড় দুর্নীতি সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাটের সরকারি খাদ্যগুদামের দুই হাজার টনেরও বেশি চাল ও গম উধাও হয়ে গেছে। হালিশহর সিএসডিতে শুধু গমের ঘাটতি হলেও দেওয়ানহাট সিএসডিতে গম ও চাল দুই পণ্যেরই ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গত কয়েক মাসে সরকারি ডিও (ডিমান্ড অর্ডার) ছাড়া ভুয়া কাগজপত্রে বিপুল পরিমাণ গম ও চাল লোপাট করা হয়।

বাগেরহাটের মোল্লাহাট সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য পাচারের ঘটনায় গুদামরক্ষক নিজেই জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণ মিলেছে। পাচারকৃত চাল ও গমের পরিমাণ ৬৮৮ টন। ওই এলাকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে পাচার হওয়া ৫৫০ বস্তা খাদ্যশস্য উদ্ধার করা হয়।

সম্প্রতি রংপুর জেলা সদর খাদ্যগুদামের প্রায় ৪০০ টন চাল চুরি করে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঘটনা জানাজানি হলে তড়িঘড়ি করে ৩০০ টন নিম্নমানের চাল স্থানীয় বাজার থেকে গুদামজাত করা হয়। মে মাসে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার গোলাপবাগ সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে ৪২ টন চাল চুরি হয়। গুদামে চালের ঘাটতির অভিযোগে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসিএলএসডি) বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে খাদ্যশস্য আত্মসাৎ এবং নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেড় শতাধিক মামলা করা হয়। এর মধ্যে ১০১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। রায়ে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে ৭ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর্থিক জরিমানা, বদলিসহ বিভিন্ন ধরনের সাজা দেওয়া হয় ৭০ জনকে। অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় অব্যাহতি পান ২৪ জন।

এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগের বছরগুলোর তুলনায় গত অর্থবছরে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলা হয়েছে অনেক বেশি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গড়ে প্রতিবছরই শতাধিক মামলা হচ্ছে। এসব মামলার চিত্র দেখলেই স্পষ্ট হয়, সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্যশস্য চুরি, অনিয়ম-দুর্নীতি নৈমিত্তিক ঘটনা। ১৯৯২ সালে সর্বাধিক ৩০০টি মামলা করা হয়েছিল।

যদিও খাদ্য অধিদপ্তরের তদন্ত শাখার এক কর্মকর্তা জানান, অতীতের তুলনায় মামলার সংখ্যা অনেক কমে আসছে। মামলার রেকর্ড থেকে এটা স্পষ্ট, খাদ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমছে। বর্তমানে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হয়।

অনিয়মের জাঁতাকল

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী খাদ্য বিভাগের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রতিমাসে কমপক্ষে দুবার গুদামের মজুদ পরিস্থিতি তদারকি রিপোর্ট দেবেন বিভাগীয় কর্মকর্তার দপ্তরে। সেখান থেকে রিপোর্ট আসবে কেন্দ্রে। কিন্তু নিয়মিতভাবে কাজটি করা হয় না। অনেক এলাকার খাদ্যগুদাম কয়েক বছরে একবার পরীক্ষা না করার নজিরও আছে। সেসব গুদামের মজুদ থেকে চাল-গম বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আবার অবস্থা বেগতিকের পূর্বাভাস পাওয়ামাত্র বাজার থেকে কিনে গুদামের বাস্তব মজুদ মেলানোর অনেক তথ্যও আছে।

অবাস্তব মজুদ যেভাবে

মাঠপর্যায়ের এক খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা জানান, সব গুদামেই মজুদসংক্রান্ত হিসাব কাগজপত্রে ঠিক রাখা হয়। তাই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গেলে তাদের প্রথমে খাতাপত্র দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্টরা। এর পর সরেজমিন মজুদ দেখতে চাইলে গুদামের সামনের অংশ দেখানো হয়। পরিদর্শকের সন্দেহ হলে তাকে পেছনের দিকে নেওয়া হয়। অনেক সময় এতেই বেরিয়ে আসে চুরির ঘটনা। আবার কিছু ক্ষেত্রে গভীর অনুসন্ধানের পর প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসে। কিন্তু বেশিরভাগ কর্মকর্তা এত কষ্ট করে চুরি বা দুর্নীতি ধরার আগ্রহ দেখান না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে চালের বস্তায় তুষ, গোখাদ্য ইত্যাদি ভরে গুদামের মজুদ খাতাপত্রের সঙ্গে মিল রাখা হয়। মোল্লাহাট খাদ্যগুদামে এমনটা করা হয়। দুঃখজনক হলো, যারা অভিযুক্ত হন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি হয়েছেÑ এমন নজির নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশ গুদামে খাতাপত্রের সঙ্গে বাস্তব মজুদের কোনো মিল পাওয়া যাবে না। আকস্মিক তদন্ত করলে অনেক গুদামের মজুদ স্রেফ কাগুজে বলে প্রমাণিত হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে