সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বিএনপি নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে আসবে

খালেদা জিয়ার জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত *আগাম নির্বাচনের মতো দৈন্যদশা দেশে নেই *জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই *জেরুজালেম নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়

  নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:১০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৌদি আরবে টাকা পাচারের দায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য তিনি জনমত সৃষ্টির আহ্বান জানান। বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়, এমনটা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিএনপি নাকে খত দিয়ে আগামী নির্বাচনে আসবে। এবার আর তারা ভুল করবে না। আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, এমন কোনো দৈন্যদশা সরকারের হয়নি যে আগাম নির্বাচন দিতে হবে।

গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। কম্বোডিয়া সফর সম্পর্কে বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টার সংবাদ সম্মেলনের মধ্যে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। প্রায় ৮ মাস পর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন শেখ হাসিনা। এর আগে ভারত সফর শেষে ১১ এপ্রিল সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন তিনি।

সৌদি আরবে বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার সম্পত্তি পাচারের দায়ে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হবে বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের টাকা যারা এভাবে বাইরে নিয়ে বিলাসব্যাসনে ব্যয় করছে, আমার দেশের মানুষকে বঞ্চিত করছে, দেশের মানুষ তাদের বিচার করবে। তিনি বলেন, দেশের আইন অনুযায়ী নিশ্চয় তার বিচার হবে। কারণ এটা হওয়া উচিতও। দেশের মানুষকে কষ্ট দিয়ে বাইরে সম্পত্তি বানানোর কী অধিকার আছে, সেটি আমারও প্রশ্ন। এ ব্যাপারে আমি মনে করি, আপনাদের আরও সোচ্চার হওয়া উচিত, জনমত সৃষ্টি করা উচিত। অবশ্যই এর বিচার হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলমান রয়েছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতোমধ্যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আজ হোক কাল হোক একদিন না একদিন তাকে আসতেই হবে এবং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় হতে হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যে খালেদা জিয়ার সম্পত্তির খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোয় তেমন জায়গা না পাওয়ায় দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, সৌদিতে বিশাল শপিং মল, সম্পদ পাওয়া গেছেÑ এটা তো আমরা কিছু করিনি। বিদেশ থেকেই সংবাদটা এসেছে। বরং বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিউজটা করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখলাম না, রহস্যাটা কী? আপনারা কি বিনা পয়সায় শপিং করার কোনো কার্ড পেয়েছেন। এ ধরনের নিউজ আমার ব্যাপারে হলে আপনারা তো হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। আমাদের অপরাধ কী? আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। আর খালেদা জিয়া সবকিছুতে মাফ পায় কেন? যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছে, জাতির জনকের খুনিদের মদদ দিয়েছে, সে জন্য কী তাদের সাত খুন মাফ? আমি কোনো পত্রিকাতে এটা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করতে দেখলাম না।

খালেদা জিয়াকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) কিসের ক্ষমা করে দিয়েছেন, সেটিই আমার প্রশ্ন। এটা কী ২১ আগস্টের হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, গ্রেনেড মেরেছিল, বেঁচে গিয়েছি, সেটির কথা বলেছেন। ক্ষমা করেছেন না চাচ্ছেন সেটি স্পষ্ট না। কারণ, তার কাছে ক্ষমাটা চাইবে কে? কেন চাইতে যাব। আমি এমন কী অপরাধ করেছি যে, আমি ক্ষমা চাব। বরং তার উচিত দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের সরকার মামলা সে রকম দেয়নি। বরং আমার বিরুদ্ধে এক ডজনের মতো মামলা খালেদা জিয়া দিয়েছিলেন। আমরা সবাই কিন্তু খালেদা জিয়ার আমলে আসামি ছিলাম। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার ছিল? তারা প্রত্যেকেই খালেদা জিয়ার নিজের পছন্দের লোক। ৯ জনকে ডিঙিয়ে তিনি মইনউদ্দিনকে বানিয়েছিলেন সেনাপ্রধান, বিশ্বব্যাংক থেকে দেশে নিয়ে এসে ফখরুদ্দীনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বানালেন, ইয়াজউদ্দীন উনারই ইয়েসউদ্দীন ছিলেন। তারাই ছিল ক্ষমতায়। তাদের আমলে করা মামলা।

বিএনপি চেয়ারপারসনের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, তিনি কোর্টে যাওয়ার পরই একেকটা গোলমাল করে, পুলিশের মোটরসাইকেলে আগুন দিল। ২০১৩ সালে মসজিদে আগুন দেওয়া, কোরআন শরিফ পোড়ানো থেকে কোনো কিছু বাদ দেননি। কাজেই ক্ষমাটা উনার জাতির কাছে চাওয়া উচিত।

বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী কোনো উদ্যোগ নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। গণতান্ত্রিক একটি দেশে যে দলগুলো গণতন্ত্র চর্চা করে সেসব দলের নির্বাচনে আসা কর্তব্য। তবে কে নির্বাচনে আসবে আর কে নির্বাচনে আসবে না সে ব্যাপারে সরকারের কিছু করণীয় নেই।

বিএনপিকে নির্বাচনে আনা নিয়ে সরকারের করণীয় বিষয়ে বারবার প্রশ্ন না করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনা নিয়ে যদি আপনাদের এতই আগ্রহ থাকে তা হলে তেলের টিন, ঘিয়ের টিন নিয়ে সেখানে যান। আমি অপাত্রে ঘি ঢালি না।

একই প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে কি বরণডালা পাঠাতে হবে? একবার তার (বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া) সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঝাড়ি খেয়েছি, অপমানিত হয়েছি, আর ঝাড়ি খাওয়ার-অপমানিত হওয়ার ইচ্ছা নেই। যাদের মধ্যে ভদ্রতা জ্ঞান নেই, তাদের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা নেই। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে বলেন, এ ধরনের ছোটলোকিপনা যারা করে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেন কোন মুখে। আমার ওপর আপনারা এত জুলুম করেন কেন? কোন দল নির্বাচন করবে কোন দল নির্বাচন করবে না তা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। এখানে আমাদের কী করার আছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জিয়াউর রহমানকে মেজর জেনারেল বানিয়েছেন আমার বাবা। বউ নিয়ে তিনি আসতেন। আমাদের বাসার নিচে মোড়া পেতে বসে থাকতেন। তাকে আপনারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বলেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন, এটাই বহুদলীয় রাজনীতি?

আগাম নির্বাচন সংক্রান্ত এক প্রশ্নে তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে যে কোনো সময় নির্বাচন হয়। তবে এমন কোনো দৈন্যদশায় পড়িনি যে, এখন নির্বাচন দিতে হবে। আর উন্নয়নের যে কাজগুলো আমরা করে যাচ্ছি, আমরা চাই সেগুলো এগিয়ে নিতে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশটাকে উন্নত করব, সেই লক্ষ্য নিয়েই দেশ চালাচ্ছি। তার পর জনগণের ইচ্ছা, যাকে ইচ্ছা ভোট দেবে। কারণ আমি সেøাগান দিয়েছিলাম আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নেই। না দিলে আফসোসও থাকবে না। কারণ সুযোগ পেয়ে কাজ করেছি। প্রমাণ করেছি দেশের উন্নয়ন করা যেতে পারে। এটাই আমার সন্তুষ্টি।

এমপিদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, অন্তত রেড জোনে কেউ নেই। অবশ্যই জরিপ আমাকে করতে হবে। আমার এমপিরা কে কীভাবে কাজ করছে, জনগণের কাছে কার কেমন গ্রহণযোগ্যতা সেটি নিশ্চয় আমাকে জানতে হবে। কিন্তু সেই পদ্ধতিগুলো নিশ্চয় বলার নয়। এগুলো আমি সবার সামনে বলব না। আমি যদি কারো কোথাও দুর্বলতা দেখি, নিশ্চয় তাকে সে বিষয়ে সতর্ক করি।

তিনি বলেন, আমরা সমগ্র বাংলাদেশে সুষম উন্নয়ন করছি, সবাই সেটি ভোগ করছে। দেশের মানুষ যদি উন্নয়নটা চায়, তা হলে তারা নিশ্চয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বেছে নেবে। এক বছর পর নির্বাচন। ‘ডেঞ্জার জোন’ এখন আওয়ামী লীগের জন্য সৃষ্টি হয়নি। কারণ মানুষ উন্নয়ন চাইলে তাদের আওয়ামী লীগ দরকার।

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এই দেশে যারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, জনকল্যাণে কাজ করে তারাই ক্ষমতায় আসুক, তারাই সংসদে থাকুক। এখানে কোনো যুদ্ধাপরাধী, কোনো খুনির স্থান যাতে না হয়, তা হলে দেশটা আবার ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আমরা উদযাপন করব, আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা পালন করব।

জেরুজালেম সংকটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি সুয়োমোটো যে ঘোষণা দিয়েছেন, আমার কাছে মনে হয় এটা ইসলামিক বিশ্বে কারো কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এখানে জাতিসংঘের রেজুলেশন রয়েছে। রেজুলেশন অনুযায়ী কিন্তু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। জাতিসংঘের রেজুলেশনকে এভাবে অগ্রাহ্য করা কিন্তু কেউ বোধ হয় মেনে নেবে না। এটা ফিলিস্তিনের বিষয়ে আমার বক্তব্য।

রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মোটামুটি সব দেশই মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছে। অনেকে প্রকাশ্যে না বললেও কেউই ভালো চোখে দেখেননি, সবাই চান, মিয়ানমারের নাগরিক দ্রুত ফিরে যাক। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। তারা স্বীকার করেছেন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে। আমি সবসময় চাই, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সদ্ভাব থাক। আমরা মানবিক কারণে এদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু অবশ্যই মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে। এটাই আমাদের আশা।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে