টাকার অভাবে গ্রাহকের চেক ফেরত দেওয়া হচ্ছে

  হারুন-অর-রশিদ

১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৬:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র ৫ হাজার টাকার চেক নিয়ে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় বসে আছেন গৃহিণী। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানান, বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে টাকা তুলতে এসেছেন। কিন্তু কর্মকর্তারা বারবার তাকে অপেক্ষা করতে বলছেন। দুপুর পার হয়ে গেলেও তিনি টাকা হাতে পাননি। এর আগেও দুই দিন তিনি ৫ হাজার টাকা তুলতে ব্যাংকে এসে ফিরে যান। এটি গুলশান শাখার গতকালের চিত্র। অন্য শাখাগুলোয়ও একই অবস্থা। কয়েক দিন ঘুরেফিরে কেউ কেউ কিছু টাকা নিতে পারলেও অধিকাংশ গ্রাহক ফেরত যাচ্ছেন খালি হাতে। শাখার ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা কোনো গ্রাহককে হাতজোড় করে, কোনো গ্রাহককে কিছুটা ধমকের সুরে পরে আসতে বলছেন।

তহবিলশূন্য হয়ে পড়েছে নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংকের। ফলে অ্যাকাউন্টে টাকা থাকলেও চেক দিয়ে টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। বারবার চেক বাউন্স হচ্ছে। এতে বেকায়দায় পড়েছেন গ্রাহকরা। গত দুই দিন ফারমার্স ব্যাংকের মতিঝিল ও গুলশান শাখায় সরেজমিন পরিদর্শন করে এসব তথ্য জানা গেছে। ধানম-ি শাখারও একই চিত্র বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো নির্দিষ্ট শাখার সমস্যা নয়, এটি ব্যাংকটির তীব্র সংকট। এ জন্য চেক দিয়ে নিজের জমানো টাকা তুলতে পারছেন ৫৫টি শাখার গ্রাহকরা।

গত রবিবার দুপুর ১২টায় ব্যাংকটির মতিঝিল শাখায় গিয়ে দেখা যায়, একদিকে ১০ থেকে ১২ জন লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিচ্ছেন। অন্যপাশে দুটি লাইনে ৭ থেকে ৮ জন চেক হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। শাখার বিভিন্ন স্থানে বসার জন্য রাখা চেয়ারগুলোয় গ্রাহক চুপচাপ বসে আছেন। কর্মকর্তারাও নিশ্চুপ। ক্যাশ কাউন্টার ছাড়া অন্য কর্মকর্তাদের কোনো কাজ নেই। ১২টা ১৯ মিনিটে এক গ্রাহকের চিৎকার, আমার টাকা আমায় দেবেন, এতে সমস্যা কীসের? সঙ্গে সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ জন গ্রাহক চেয়ার ছেড়ে তার দিকে ছুটে গেলেন। ভেতর থেকে হারুন নামে এক কর্মকর্তা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, আপনার টাকা আপনি পাবেন কিন্তু এখন ফান্ড ক্রাইসিস, পরে আসেন। এত টাকা দেওয়া যাবে না; আপনি ৫০ হাজার টাকা নেন। ওই গ্রাহকরা আরও জোরে চিৎকার শুরু করেন। শাখার দ্বিতীয় তলা থেকে একজন নেমে এসে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে দ্বিতলায় ম্যানেজারের কক্ষে নিয়ে গেলেন। ওই গ্রাহকের নাম সাইদুল ইসলাম। পেশায় ব্যবসায়ী। ব্যবসার পাওনা পরিশোধে টাকা নেওয়ার জন্য পূর্ব নোটিশ করে গত বুধবার চেক পাঠান। ওই দিন ও বৃহস্পতিবার চেকটি বাউন্স করে। গত রবিবার তিনি নিজে আসেন। ৫ লাখ টাকার একটি চেক দিয়েছেন। এর আগে বাড়িভাড়া পরিশোধে তার দেওয়া ২৭ হাজার টাকার একটি চেকও বাউন্স হয়েছে।

চেক হাতে লাইনে ছিলেন জনতা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। তিনি ৩ লাখ টাকা তুলবেন। তার ১৪ লাখ টাকার একটি এফডিআরের মেয়াদ পূর্তি হয়েছে; কিন্তু ব্যাংক তাকে অনুরোধ করছে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার জন্য। ভেতর থেকে হারুন নামের ওই কর্মকর্তা মেজাজ খারাপ করে বলেন, এই টাকা নিলে নেন, না হলে চলে যান। বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেন। পারলে তারা টাকা দেবে, আমরা দিতে পারব না। হারুন নামের ওই কর্মকর্তা আরেকজনকে দেখিয়ে বলেন, উনি সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা। ওনার এফডিআর ২৭ লাখ টাকা। উনি আপনার মতো চিৎকার করছেন না। পরে সোনালী ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, আমি কয়েক দফায় ৩ লাখ টাকা তুলতে পেরেছি। বাকি টাকা পর্যায়ক্রমে দেবে বলছে।

শাখায় বসে দেখা যায়, একপাশে ক্যাশ কাউন্টারে টাকা জমা নিচ্ছেন ৩ জন। ওই টাকা ছোট ছোট বান্ডিল করছেন হারুন। এর পর তা গ্রাহকদের দেওয়ার জন্য দিচ্ছেন। ৫০ হাজার টাকার বেশি চেক না লেখার জন্য একটু পর পর হাঁকডাক হচ্ছে। এক গ্রাহক ৬০ হাজার টাকার একটি চেক দেন; কিন্তু তাকে দেওয়া হয় ৪০ হাজার টাকা। কোনো গ্রাহকই তাদের চাহিদামাফিক টাকা পাচ্ছেন না। চেক দিলেই প্রথমেই গ্রাহকদের ১৫ দিন থেকে ১ মাস পরে আসতে বলা হচ্ছে। কেউ নাছোড়বান্দা হলে তাকে বসতে বলা হচ্ছে।

কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সকাল থেকে বসে আছেন চেক দিয়ে। একটু পরপর খোঁজ নিচ্ছেন। কিন্তু বারবারই বলা হচ্ছে আরেকটু অপেক্ষা করেন। কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পারায় গতকাল পর্যন্ত কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি।

দুপুর ১টার দিকে দ্বিতীয় তলায় ম্যানেজার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম মজুমদারের কক্ষে প্রবেশ করে দেখা যায়, হাতে চেক নিয়ে দুই গ্রাহক বসে আছেন। তাদের দু-একদিন পরে আসার জন্য অনুরোধ করছেন ম্যানেজার। ইতোমধ্যে টেলিফোনের রিং বেজে ওঠে। নিজেকে আল আমিন পরিচয় দিয়ে একজন গ্রাহক কথা বলছেন। ওই শাখায় থাকা তার একটি এফডিআর মেয়াদপূর্তির আগে ভেঙে ফেলতে চান। কিন্তু ম্যানেজার বলছেন, এখন মেয়াদপূর্তির আগে কারো এফডিআর ভাঙা হচ্ছে না। আপনি আগামী সপ্তাহে একবার ফোন দেন। দেখি এমডি সাহেবের সঙ্গে কথা বলি, তিনি কী বলেন। একটু পর আরেক ব্যক্তি আসেন তিনটি আবেদনপত্র নিয়ে। তিনি এনসিসি ব্যাংকের অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা। তার ৪ লাখ টাকা করে থাকা ৩ বছর মেয়াদি এফডিআর দেড় বছর আগেই ভাঙাতে চান। কিন্তু ম্যানেজার তাকে বলছেন, দেখুন এখন ফান্ড ক্রাইসিস। আপাতত এসব আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না। আপনি একমাস পরে যোগাযোগ করেন। আসছি বলে দুপুর দেড়টার দিকে রুম থেকে বেরিয়ে যান ম্যানেজার।

ম্যানেজার গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনায় বলেন, তীব্র অর্থ সংকটে আছি। পত্রিকার খবরে গ্রাহকরা সব টাকা তুলে ফেলছেন। এখন ম্যানেজমেন্ট কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছি। তবে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর কোনো কথা বলতে রাজি হননি ওই শাখা ম্যানেজার।

গতকাল সরেজমিন গিয়ে গুলশান শাখায়ও একই অবস্থা দেখা যায়। এক গৃহিণী বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে মাত্র ৫ হাজার টাকার চেক নিয়ে বসে আছেন। শাখা ম্যানেজারের কথামতো তিনি অপেক্ষা করছেন। দুপুর গড়িয়ে গেলেও তিনি টাকা হাতে পাননি। একটি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের মালিক কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য দেড় লাখ টাকার চেক পাঠিয়েছেন। সেটিও দিতে পারেনি ব্যাংকটি। ওই শাখার আরেক অপেক্ষমাণ গ্রাহক জানান, তিনি ২৪ হাজার এবং ২৬ হাজার টাকা মূল্যের দুটি চেক জমা দিয়েছেন গত বৃহস্পতিবার। গত রবিবারও তিনি শাখায় যান। কিন্তু শাখার কর্মকর্তারা তাকে ১৫ দিন পরে আসতে বলেন। গতকাল তাকে টাকা দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন ম্যানেজার। সকালে গিয়ে দুপুরের দিকে তিনি টাকা তুলতে পেরেছেন।

গতকাল লেনদেন করতে যাওয়া ওই শাখার একজন গ্রাহক জানান, ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যাংক দিতে পারে না, এটি জীবনে প্রথম দেখলাম। টাকার জন্য সবাই ভিড় করছেন; কিন্তু কেউই টাকা পাচ্ছেন না। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের চেকও এসেছে।

ওই শাখার জ্যেষ্ঠ একাধিক কর্মকর্তা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংকিং জীবনে এত ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কখনো পড়িনি। গ্রাহকরা টাকা নিতে আসছেন; কিন্তু তাদের টাকা দিতে পারছি না। হাতজোড় করে তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, তারল্য সংকট মেটাতে পরিচালকদের আমানত রাখার জন্য বলা হয়েছে। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে গ্রাহকের স্বার্থে যদি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তা অবশ্যই নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত রবিবার বিকালে ফোনে কথা হয় পদত্যাগী অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতীর সঙ্গে। তিনি বলেন, একটি ব্যাংকের যখন ধস নামে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে। নতুন ম্যানেজমেন্ট সে অবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজটি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসবে, এটি আমাদের প্রত্যাশা। পরিচালক হিসেবে না থাকলেও শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড়াতে আমরা সহায়তা করব।

গত কয়েক দিনে একাধিক শাখা ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমানতকারীরা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিচ্ছেন। তাই সবার টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। টেবিলের রাখা ফাইলের দিকে দৃষ্টি দিয়ে ম্যানেজাররা জানান, দেখেন এগুলো সবই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার আবেদন।

উল্লেখ্য, বেপরোয়াভাবে ঋণ বিতরণের কারণে তীব্র অর্থসংকটে পড়েছে ফারমার্স ব্যাংক। অর্থ সংকটের কারণে সম্প্রতি অনেক গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে ফারমার্স ব্যাংক।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে