যে বধ্যভূমির খোঁজ রাখেনি কেউ

  রুমানা রাখি ও সানাউল হক সানী

১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৬:১২ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীন বাংলাদেশ পার করেছে ৪৬ বছর। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ স্মরণে সারা বছরই থাকে নানা কর্মসূচি। বিভিন্নভাবে সম্মানিত করা হয়েছে জাতির এ বীর সন্তানদের। কিন্তু এসব আয়োজনের আড়ালে চাপা পড়ে আছে এক বদ্ধভূমির গল্প। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। তারই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস অত্যাচার চলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে পড়া ছাত্রীদের ওপর। এর মধ্যে রোকেয়া হলের রয়েছে বেদনাবিধুর এক ইতিহাস। হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যার শিকার ছাত্রী ও কর্মচারীদের মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল হলের সেই সময়ের পরিত্যক্ত একটি স্থানে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আবিষ্কৃৃত হয় এই বধ্যভূমি। এরপর পরিচর্যা না করায় কালের প্রবাহে ঢাকা পড়ে যায় তা। এই বধ্যভূমির কথা জানে না নতুন প্রজন্ম। জানে না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। কখনো এই শহীদদের স্মরণে হয়নি কোনো অনুষ্ঠান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের বধ্যভূমি সম্পর্কে কথা বলেন হলের ১৫ শিক্ষার্থী। কথা বলেন সাবেক অনেক ছাত্রনেত্রী ও শিক্ষার্থীও। তারা কেউই জানেন না এই বদ্ধভূমির কথা। জানেন না রোকেয়া হলে ১৯৭১-এর নৃশংসতার সঠিক ইতিহাস।

যুদ্ধের সময় ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল অফিস থেকে দেশটির স্টেট ডিপার্টমেন্টে তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে যেসব রিপোর্ট পাঠানো হয়েছিল সেগুলোর একটি অংশ ২০০২ সালে প্রকাশ করা হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টই এগুলো প্রকাশ করে ‘যুক্তরাষ্ট্রের গোপন দলিল’ হিসেবে। ওইসব দলিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের কিছু বিবরণ ফুটে উঠেছে। এতে বলা হয়, একটি কক্ষের সিলিংফ্যানে ৬টি মেয়ের লাশ পাওয়া যায়। তাদের পা বাঁধা, নগ্ন দেহ, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল এক ব্যবসায়ীর (আওয়ামী লীগের সমর্থক নন) মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত হয়েছিলেন। ওই ব্যবসায়ীর মতে, মেয়েগুলোকে ধর্ষণ করার পর গুলি করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

ঢাকার তখনকার কাউন্সিল জেনারেল আর্চার কে ব্লাডের ‘দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ থেকে জানা যায়, ছাত্রী নিবাস রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ছাত্রীরা আগুন থেকে বাঁচতে হলের বাইরে আসা শুরু করলে পাকবাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে আর্মি ইউনিট ৮৮-এর কথোপকথন থেকে জানা যায়, আনুমানিক ৩০০ ছাত্রীকে সে সময় হত্যা করা হয়।

রফিকুল ইসলামের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষক বই থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর গভীর রাতে রোকেয়া হলে সশস্ত্র পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের বিহারি সহযোগীরা প্রবেশ করে এবং হলে অবস্থানকারী মোট ত্রিশজন ছাত্রীর ওপর নির্যাতন চালায়, সর্বস্ব কেড়ে নেয়, পরে কয়েকজন ছাত্রীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল কলেজের ইমারজেন্সিতে নিতে হয়েছিল।

পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক ডন পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর ‘ঢাকা হস্টেল গার্লস রব্ড’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি থেকে ১০ নভেম্বর রাতে সংঘটিত রোকেয়া হলের খবরটি জানা যায়। ওই খবরে বলা হয়Ñ দুষ্কৃৃতকারীরা রিভলবার, স্টেনগান এবং অন্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গতকাল গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে ডাকাতি করে। তারা ত্রিশজন ছাত্রী ও প্রভোস্টের বাড়িতে দুই ঘণ্টা সন্ত্রাস চালায়।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত স্বাধীনতাযুদ্ধ : দলিলপত্রের ৮ম খ-ে মুদ্রিত ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন সুইপার ইন্সপেক্টর সাহেব আলীর ভাষ্যেও পাওয়া যায় রোকেয়া হলের নৃশংসতার কাহিনি। তিনি জানান, ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে ভারপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সেনাদের মেজর পৌরসভায় টেলিফোনে খবর দেন হলের চারদিকে মানুষের লাশের পচা গন্ধে সেখানে বসা যাচ্ছে না, অবিলম্বে ডোম পাঠিয়ে লাশ তুলে ফেলা হোক। আমি ছয়জন ডোম নিয়ে হলে প্রবেশ করে সব কক্ষ খুঁজে লাশ না পেয়ে চারতলার ছাদের ওপর গিয়ে ১৮ বছরের এক ছাত্রীর উলঙ্গ লাশ দেখতে পেলাম। আমার সঙ্গে দায়িত্বরত জনৈক পাকিস্তানি সেনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ ছাত্রীর দেহে গুলির কোনো আঘাত নেই, অথচ মরে পড়ে আছে কেন? সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল, ‘আমরা সব পাকিস্তানি সেনা মিলে ওকে ধর্ষণ করতে করতে মেরেছি।’ এরপর আমি হলের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতর প্রবেশ করে পাঁচজন মালীর স্ত্রী-পরিজনদের পাঁচটা লাশ এবং আটটা পুরুষের লাশ (মালী) পাই।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সর্বাধিক পঠিত একটি বই নুরুল ইসলাম খানের লেখা পাকিস্তানে আটকে পড়া দিনগুলি। বইতে একটি চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে, করাচিতে ইসলামি শিক্ষার তালিম নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের একটি ছেলে কয়েক বছর আগে গিয়েছিল। সে সেখানকার মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছে। সম্প্রতি সে পাকিস্তানের দরগাগুলো দেখে বেড়াচ্ছিল। এ উপলক্ষে সে রাওয়ালপিন্ডির কাছে দিয়ারা শরিফে যায়। ফেরার পথে চুরে এলাকায় বাস বিকল হলে যাত্রীরা নামে। সেও সেখানে নেমে ঘোরাঘুরি করতে করতে একটু দূরে একজন বাঙালি মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েটি তাকে ইশারায় ডাকে। কাছে গেলে বলে যে, সে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রী। তাকে ও তার মত ৯৫০ জন মেয়েকে হানাদার বাহিনী পাকিস্তানে নিয়ে এসেছে। তাদের দিয়ে জঘন্য কাজ করাচ্ছে। সম্প্রতি তাদের পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত করেছে।

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী রোকেয়া হলে আক্রমণ চালায়। তারা হলে অবস্থানরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ মোট ৪৬ জনকে হত্যা করে। পরে তারা লাশগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলে তার ওপর দিয়ে ট্যাঙ্ক চালিয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর রোকেয়া হলের এই গণসমাধি খনন করে প্রায় ১৫টি মাথার খুলি ও হাড়গোড় উদ্ধার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

ওই সময় কবর থেকে একটি ঘড়ি ও কয়েকগাছি চুড়ি পাওয়া গেছে। ঘড়িটি নাসিরউদ্দিন নামে এক ব্যক্তির। তার ভাই গিয়াসউদ্দিন হলের কর্মচারী ছিলেন। আরেক কর্মচারী আলী আক্কাসের মেয়ে রাশিদার হাতের কয়েকখানা চুড়ি পাওয়া গেছে। নমী নামক আরেক কর্মচারীর ভাইয়ের বউয়ের চুড়ি পাওয়া গেছে। নমীও সে রাতে নিহত হন। নমীর পরিবারের ৮ জনকে হত্যা করে উল্লাস করে নরপশুরা। শুধু নমীর ১৬ বছরের এক সন্তান রামশঙ্কর অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি দৈনিক পূর্বদেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রামশঙ্কর সেই রাতের বীভৎসতার বিবরণ দেন। তার ভাষায়, আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। আমি বুঝলাম আমাকে তারা অন্যদের সঙ্গে মাটিচাপা দেবে। একটু পর সবাই কী কাজে দূরে গেলে আমি সুযোগ বুঝে মৃতদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসি। চারপাশে তখন অগণিত লাশ। আমি গুনতে পারিনি। মা ও ছোট বোনের লাশ দেখেও দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলাম। সেই রাতে দু-একজন কর্মচারী বাঁচলেও বেশিরভাগই নিহত হন।

রোকেয়া হলের সাবেক আবাসিক শিক্ষার্থী হোসনে আরা সিমা বলেন, অনেক দিন এই হলে কাটিয়েছি। কিন্তু কখনো কোনো অনুষ্ঠান হয়নি এই শহীদদের স্মরণে। আমরা জানি না এমন নৃশংসতার ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরই উচিত ছিল বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরা।

ডাকসু সংগ্রহশালার সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ও মুক্তিযোদ্ধা গোপাল দাস বলেন, রোকেয়া হলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। হলে অবস্থান করা বেশ কিছু ছাত্রী ও কর্মচারীকে হত্যা করা হয়। শামসুন্নাহার হলের সামনে আমি নিজ চোখে লাশের স্তূপ দেখেছিলাম। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল সেই লাশগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, রোকেয়া হলে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকা- ঘটেছিল। লাশগুলো মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর ট্রাক চালিয়ে দিয়েছিল হানাদাররা। এই গণকবর নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি কখনো। আমরা শহীদদের স্মরণে কিছু অনুষ্ঠান করব। মুক্তিযুদ্ধের এমন ইতিহাস যেন আগামী প্রজন্ম ঠিকভাবে জানতে পারে তার জন্য সব পদক্ষেপই নেব।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে