গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশি ঠকাচ্ছে ব্র্যাক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক

  হারুন-অর-রশিদ

১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:২৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয়কেই সবচেয়ে বেশি ঠকাচ্ছে বেসরকারি ব্র্যাক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংক দুটি আমানতকারীদের অনেক কম সুদ দিচ্ছে কিন্তু ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে উচ্চহারে সুদ আদায় করছে। এ ছাড়া বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড (স্ট্যানচার্ট) ব্যাংক গ্রাহক ঠকাচ্ছে অনেক বেশি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) ঋণে চড়া হারে সুদ আদায় করছে এই ব্যাংকগুলো। এ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কী পরিমাণ সুদ দিচ্ছে এবং ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে কী পরিমাণ সুদ আদায় করছে প্রতিমাসে তার প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের অক্টোবরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিনিয়োগ চাহিদা কম থাকায় আমানতের সুদহারের পাশাপাশি ঋণের সুদহারও কমিয়েছে ব্যাংকগুলো। তবে আমানতের অনুপাতে ঋণের সুদ কমাচ্ছে না বেশ কিছু ব্যাংক। এতে ওই ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের সুদ ব্যবধান (স্প্রেড) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত সীমায় নামছে না। স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। চলতি বছরের অক্টোবরে দেশি ও বিদেশি খাতের ১০টি ব্যাংকের স্প্রেড এ সীমার বাইরে ছিল। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের। এর পরই রয়েছে বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। তৃতীয় সর্বোচ্চ স্প্রেড রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের।

এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম আরএফ হোসেন বলেন, ব্র্যাক ব্যাংকের ৮ হাজার কোটি টাকা ছোট অঙ্কের ঋণ বিতরণ করেছে। ছোট ঋণের সুদহার বেশি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। এ জন্য আমাদের স্প্রেড বেশি।

বড় শিল্পের ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক ১০ থেকে ১৩ শতাংশ সুদ আদায় করলেও এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে আদায় করছে ১৪ থেকে ১৯ শতাংশ সুদ। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে বড় শিল্প ঋণে ৯ থেকে ১২ শতাংশ এবং এসএমই ঋণের ১০ থেকে ১৩ শতাংশ সুদ আদায় করছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বড় শিল্পপতিদের কাছ থেকে সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ সুদ আদায় করলেও এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে আদায় করছে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অক্টোবরে ব্র্যাক ব্যাংক আমানতকারীদের গড়ে ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ হারে সুদ দিয়েছে। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আদায় করেছে গড়ে ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ সুদ। ব্যাংকটির স্প্রেড ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশীয় পয়েন্ট; যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিত মাত্রার তুলনায় ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক আমানতকারীদের মাত্র ২ দশমিক ২৭ শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে। ঋণের ক্ষেত্রে আদায় করছে ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ সুদ। এই ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের স্প্রেড ৮ দশমিক ১৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। বাংলাদেশে কার্যরত ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে আমানতকারীদের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ সুদ দিচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ঋণের বিপরীতে আদায় করছে ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

উল্লেখ্য, আমানতকারীদের সবচেয়ে কম সুদ মাত্র দশমিক ৪৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছে সিটি ব্যাংক এনএ।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৩ ব্যাংককে স্প্রেড কমানোর জন্য চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় ব্র্যাক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে স্প্রেড শতাংশীয় পয়েন্টের নিচে নামিয়ে আনতে বলা হয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংককে স্প্রেড কমাতে গত বছরের ৩০ অক্টোবর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি ব্যাংকগুলো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিনিয়োগে কাক্সিক্ষত গতি না ফেরায় অনেক ব্যাংকের কাছে প্রচুর পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য পড়ে আছে। আবার বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের জেরে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। এর মধ্যেই বছর শেষে ভালো মুনাফা অর্জনের টার্গেটে এগোচ্ছে ব্যাংকগুলো। ফলে তারা আমানতকারীদের কথা না ভেবেই আমানতের সুদ বেশি হারে কমিয়ে দিচ্ছে। আবার অতি মুনাফার আশায় ঋণের সুদ কমাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম হারে। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংকগুলোর এ দ্বৈতনীতি চলছে। এতে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয় গ্রাহকই ঠকছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, নির্দেশিত মাত্রার তুলনায় স্প্রেড বেশি থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হচ্ছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, উরি ব্যাংক, এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক এনএ, দি সিটি ব্যাংক, উত্তরা এবং নতুন প্রজšে§র দি ফারমার্স ব্যাংক।

এদিকে গত অক্টোবর শেষে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে আমানতের গড় সুদ দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর বিপরীতে ঋণের গড় সুদ দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট; যা আগের মাস সেপ্টেম্বরে ছিল ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে