গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ইস্পাহানির অংশীদারের সাজানো সংসার

  হাসান আল জাভেদ

০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:৪০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দিনটি ছিল ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশিদের চূড়ান্ত বিজয়ের ৪৬তম বছর। রাজধানীসহ সারা দেশের অলিগলিতে বেজে ওঠে- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। এমন দিনে বুলডোজারে পিষ্ট করা হয়েছে স্বাধীনতার সুবাদে পাওয়া পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে বসবাসকারী এক অংশীদারের বাড়ি। ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে অস্ত্রের মুখে জোর-জবরদস্তিতে উচ্ছেদ করা হয় ৪৫ বছরের সাজানো সংসার। রাজধানীর মগবাজারে ঐহিত্যবাহী ‘এমএম ইস্পাহানি (মির্জা মোহাম্মদ ইস্পাহানি) লিমিটেড’-এর কলোনিতে এ ঘটনা ঘটে।

পরে এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শেয়ারহোল্ডার পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ হাবিবা হক বাদী হয়ে ১৬ ডিসেম্বর রমনা থানায় একটি মামলা করেন। তিনি এমএম ইস্পাহানি লিমিটেডের সাবেক পরিচালক মরহুম সৈয়দ মুজিবুল হকের স্ত্রী। বাদী পক্ষের অভিযোগ, ন্যক্কারজনক ওই দুর্বৃত্তায়নের পর পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। এতে স্পষ্ট যে, পরিকল্পিত ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে দখলদারদের যোগসাজশ ছিল।

জানা গেছে, ভারত-পাকিস্তান ভাঙনের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের একটি অংশ চলে যান ভারতে। তাদের জমিজমা, শিল্প-স্থাপনাকে ‘শত্রু সম্পত্তি’ বিবেচিত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সম্পত্তিকে পরিণত করা হয় লিমিটেড কোম্পানিতে। আজকের ‘ইস্পাহানি গ্রুপ অব কোম্পানিজ’ ভারতের স্বনামধন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের রেখে যাওয়া পরিত্যক্ত সম্পত্তি।

হাবিবা হক বলেন, ১৯৭২ সালে এমএম ইস্পাহানি লিমিটেডের পরিত্যক্ত সম্পত্তি জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার। তখন দেশে ছিলেন এমএম ইস্পাহানির ছেলে আহমেদ ইস্পাহানি। যিনি সরকারিকরণ ঠেকাতে তৎপর হয়ে সৈয়দ মুজিবুল হকের সঙ্গে চুক্তি করে কোম্পানি পুনর্গঠন করেন। কিছু শেয়ারসহ সাবেক সরকারি কর্মকর্তা মুজিবুল হককে দেওয়া হয় পরিচালক পদ। ইস্পাহানি টি কোম্পানির ১০ শতাংশ শেয়ারও দেওয়া হয় তাকে।

৮৬ বছর বয়স্ক হাবিবা হক জানান, চক্ষু হাসপাতাল, স্কুল-কলেজসহ কোম্পানির নামে একাধিক ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান থাকায় অংশীদার হয়েও তারা কখনো আর্থিক সুবিধা ভোগ করেননি। শুধু ৭২ সাল থেকে মগবাজারের ইস্পাহানি কলোনির ১২ নম্বর বাসার একতলা বাড়িতে বসবাস করে আসছেন। এরই মধ্যে ২০০৬ সালে মারা যান সৈয়দ মুজিবুল হক। এর পর মৃতের পরিবারের কাউকেই পরিচালক পদ দেওয়া হয়নি। উল্টো বিভিন্ন সময় শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব দেন এমএম ইস্পাহানির উত্তরাধিকারী বেহরুজ ইস্পাহানি। বিনিময়ে হাবিবা হকের পরিবারকে আজীবন ১২ নম্বর ভবনে থাকার কথা বলা হয়।

বর্তমানে এমএম ইস্পাহানির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রয়েছেনÑ সালমান ইস্পাহানি, ইমাদ ইস্পাহানি, সাজেদ ইস্পাহানি ও বেহরুজ ইস্পাহানি। অন্যদিকে সৈয়দ মজিবুল হকের উত্তরাধিকারীরা হলেনÑ তার স্ত্রী হাবিবা হক, চার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধ্যাপক শারমিন হক, সাবেক ইউনেস্কো কর্মকর্তা ইয়াসমিন হক, ঢাবি শিক্ষিকা নাজমিন হক, লন্ডনের সেইন্ট জর্জ হসপিটালের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ফারজিন হক ও ছেলে লন্ডন ইউনিভার্সিটি অব কুইন মেরির অধ্যাপক সৈয়দ ইজাজুল হক।

মুজিবুল হকের একমাত্র ছেলে ইজাজুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর পর বেহরুজ ইস্পাহানি আমাদের নামে থাকা শেয়ার ফেরত দিতে নানা ধরনের প্রস্তাবসহ হুমকিও দেন। আমরা যে যার মতো দেশ-বিদেশে কর্মের মধ্যে আছি। তাই একপর্যায়ে ট্রাস্টের নামে বিনামূল্যে সম্পত্তি লিখে দিতে রাজিও হই। শর্ত ছিল কাগজে লেখা থাকবে আমরা কোনো টাকা-পয়সা নেইনি। এ নিয়ে একটা খসড়াও করে ফেলি। কিন্তু ইস্পাহানি পরিবার এতে রাজি হয়নি। বরং ২০০৭ সালে আমাদের ভাড়াটিয়াকে বাসা থেকে বের করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, হঠাৎ করে শুনি আমাদের না জানিয়েই ইস্পাহানি পরিবার এবিসি রিয়েল স্টেটের সঙ্গে নতুন করে অ্যাপার্টমেন্ট গড়তে চুক্তিবদ্ধ হয়। তারা আমাদের বাড়ির আশপাশে খনন কাজও শুরু করে। একপর্যায়ে আমাদেরও বাড়ি ছেড়ে দিতে হুমকিধমকি দেয়। পাশাপাশি তারা আমাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করে। ওই মামলার শুনানি ছিল গত ২৮ নভেম্বর। ওই দিনের শুনানি বাতিল করতে ইস্পাহানি পরিবার আবেদন জানায়। পরে আদালত এ মাসে (জানুয়ারি) শুনানির তারিখ ধার্য করেন। এর মধ্যে ইমাদ ইস্পাহানি সমঝোতায় আসতে আমার সঙ্গে লন্ডনে যোগাযোগও করেন। তাই আমরা আশার আলো দেখছিলাম। কিন্তু হলো উল্টোটা।

বৃদ্ধা হাবিবা হক বলেন, বাসায় থাকা এক মেয়ে ১৬ ডিসেম্বর ভোরের ফ্লাইটে নিউইয়র্ক যায়। ওইদিন সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ চার থেকে পাঁচটি ট্রাক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। আনুমানিক ২০ জন বাসায় ঢুকতে গেলে আমাদের গাড়িচালক বাধা দেয়। এতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা গাড়িচালককে মারধর করে। তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। এর পর তারা বাসার ভেতর ঢুকে আমাকে, কাজের বুয়া, মালি, গাড়িচালক সবাইকেই একটি কক্ষে আটকে রাখে। সবার সামনে গাড়িচালক সোহেলকে ফের বেধড়ক পেটানো হয়। অস্ত্র ঠেকিয়ে সাত থেকে আটটি সাদা স্ট্যাম্পে জোর করে আমার স্বাক্ষর আদায়সহ বাসায় থাকা স্বর্ণালঙ্কার লুট করে। বাসায় থাকা সব দলিলপত্র, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক রান্নাঘরে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলে সন্ত্রাসীরা।

তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আমাকে জোর করে একটি গাড়িতে তোলা হয়। পেছনে বুলডোজার দিয়ে শুরু হয় বাড়ি ভাঙা। তিনটি ট্রাকে বাসার মালামাল তোলার পাশাপাশি রাস্তায় রাস্তায় ঘোরানো হয় আমাকে। দুপুরে রমনা থানায় এ ঘটনায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ না করে নানা অজুহাত দেখায়। অনেক চেষ্টার পর বিকালে মামলার কপি রেখে দিলেও নথিভুক্ত করে পরের দিন (১৭ ডিসেম্বর)। আসলে পুলিশ কালক্ষেপণ করে বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য সন্ত্রাসীদের সুযোগ করে দেয়। নিজের বাড়ি হারিয়ে এখন আত্মীয়ের বাসায় আছি।

এ বিষয়ে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা কারো পক্ষে-বিপক্ষে নই। বাদীর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এটা ঠিক। তবে এখনো ভাঙচুর বা উচ্ছেদকারীদের শনাক্ত করতে পারিনি। সায়েন্টিফিকভাবে (বৈজ্ঞানিক) জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

ইস্পাহানি কলোনির মগবাজার চৌরাস্তা সংলগ্ন গেটের ডান পাশে পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার। এর পরই রমনা থানা। আর বাঁ পাশে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের গলির মুখে থাকেন আনসারসহ দুই থেকে তিন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। মূলত উল্টোপথে গাড়ি চালানো ঠেকাতে কাজ করেন তারা। অথচ কারা বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল তা জানে না পুলিশ!

ওই বাড়ির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, মামলার আগেই আমরা থানা পুলিশকে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানাই। পাশাপাশি রাস্তায় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদেরও বিষয়টি অবহিত করি। কিন্তু পুলিশ ঘটনাস্থলেই আসেনি। থানায় মামলা দায়ের করতে গেলেও তাদের আচরণ ছিল বাদীবিরোধী। এতে স্পষ্ট বিশাল অঙ্কের চুক্তিতে থানা পুলিশকে হাত করেই পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মতিঝিলে ইস্পাহানি বিল্ডিংয়ে গেলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। এক কর্মকর্তা শুধু বলেন, আমরা বিষয়টি জানি না। মামলার কপিও পাইনি। তাই এ নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বনানীর এসিবি হাউসে গিয়ে রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেও কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে