চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সরকার

প্রকাশ | ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:৪৮

তাওহীদুল ইসলাম

চীনের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে। তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে চীনা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে এবার সতর্ক বাংলাদেশ সরকার। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প। চীনা অর্থায়নে এটি নির্মাণের কথা থাকলেও তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নানা দেন-দরবার শেষে চীনকে বাদ দিয়ে সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। চলতি সপ্তাহে চিঠি দিয়ে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে (সিএইচইসি) বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হতে পারে।

চীনা প্রকল্পের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই এবং বাণিজ্যিক চুক্তির পর ঋণের খবর থাকে না। দফায় দফায় আশ্বাস দিয়েও মেলে না ঋণচুক্তি এবং অর্থছাড়। ফলে শুরু করা যায় না নির্মাণকাজ। এ ছাড়া অস্বাভাবিক সুদ রয়েছে ঋণে। দরপত্র বা জিটুজি (বিনাদরপত্র) যে কোনো পদ্ধতিতে কাজটি হাতিয়ে নেয় দেশটি। এর পর পড়তে হয় ব্যয় বৃদ্ধির চক্করে। ঢাকা-সিলেট চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি চীনের ঋণে (জিটুজি) প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ২০১৬ সালের অক্টোবরে দেশটির রাষ্ট্রপতির সফরে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। কিন্তু অস্বাভাবিক নির্মাণব্যয় নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় দীর্ঘ সময় পর এবার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, কাঁচপুর-সিলেট চার লেন মহাসড়ক চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা ছিল; কিন্তু তাদের পরিবর্তে এখন নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।

জানা গেছে, জিটুজি ঋণের শর্তানুযায়ী, বিনাদরপত্রে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক নির্মাণের কাজ পেয়েছে চীনের মনোনীত ঠিকাদার সিএইচইসি। ৯ মার্চ প্রথম প্রস্তাবে ১৬ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা দরপ্রস্তাব করে প্রতিষ্ঠানটি। আর ১২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। চীনা প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ প্রস্তাবে দাবি, ১৪ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। সওজের প্রাক্কলন করা ব্যয়ের চেয়ে ১ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা বেশি দাবি তাদের। এর বাইরে চায়না হারবারের প্রস্তাব, ১৩ শতাংশ শুল্ক মূল প্রস্তাবের রাখতে। সওজের এতে আপত্তি আছে। শেষ পর্যায়ে চীনা প্রতিষ্ঠান তা মানতে চাইলেও তাদের প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে বাদ দিতে হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান।

চীনের জিটুজি ঋণের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, ঋণচুক্তির কঠিন ধাপ পার হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এ ধাপ শেষ করার পর মিলবে ঋণের টাকা। তার পর শুরু হবে সড়ক নির্মাণের কাজ। ২০২২ সালের আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা। কাজ শুরুর বিলম্বতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ হলেই ঋণের টাকা পাওয়া যাবেÑ তেমন নিশ্চয়তা নেই। এসব বিবেচনায় ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্প থেকে ছিটকে পড়ল চীন। একই কারণে অন্য নতুন প্রকল্প থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চিন্তা চলছে। যদিও চীনা অর্থায়নে প্রকল্প নিতে তৃতীয় পক্ষের তদবির থাকে চোখে পড়ার মতো।

সূত্র বলছে, চীনের ঋণ বা চীনা ঠিকাদার কোনোটিই উন্নয়ন প্রকল্পে স্বস্তি দিতে পারেনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণের কাজ পেয়েছিল চীনা ঠিকাদার সিনোহাইড্রো। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি নেওয়ার পর এর কয়েক দফা ব্যয় বাড়াতে হয়। তবু যথাযথভাবে কাজ শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য একই প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদী শাসনের কাজ করছে। সেখানেও টার্গেটের চেয়ে তুলনামূলক পিছিয়ে। আবার বিনাদরপত্রে মানে জিটুজি পদ্ধতিতে পদ্মা রেলপথ নির্মাণের কাজ পায় চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাণিজ্যিক চুক্তি হলেও এখনো ঋণচুক্তি হয়নি। তাই রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। এর জেরে সরকারঘোষিত সময়ে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলবে না, তা অনেকটাই নিশ্চিত। অথচ এ প্রকল্পে দাতা সংস্থা এডিবি ঋণ দিতে চেয়েছিল।

চীনা ফাঁদে পড়ে বেকায়দায় রয়েছে এ রকম অনেক বড় প্রকল্প। এরই মধ্যে ঋণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে চীন সরকার। এর ফলে জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নাধীন ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়কের জন্য চীনের জিসিএল (গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন) মিলছে না। আশুলিয়া উড়াল সড়ক নির্মাণ করবে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি)। নির্মাণকালেই এ প্রকল্পে সুদ গুনতে হবে ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এর বাইরে প্রকল্পটির জন্য ১২ শতাংশ ভ্যাট ও কর পরিশোধ করবে সরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানির জন্য চার শতাংশ কাস্টমস শুল্কও সরকারি তহবিল থেকে বহন করতে হবে, যদিও অন্য প্রকল্পে এটি ঠিকাদার নিজেই বহন করে থাকে। চার বছরে আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা। আর এ সময়ের জন্য ১ হাজার ১১৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা সুদ নেবে চীন। অর্থাৎ চার বছরের জন্য ঋণের ১০ দশমিক ২০ শতাংশ শুধু সুদই দিতে হবে। সাধারণত গ্রেস পিরিয়ডে শুধু ঋণের সুদ দিতে হয়। তাই নির্মাণকালের এতটা সুদ বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন প্রকৌশলীরা।

সাধারণত চীনের ঋণে দুই শতাংশ সুদহার ছাড়াও দশমিক ২০ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ ও দশমিক ২০ শতাংশ ম্যানেজমেন্ট চার্জ দিতে হয়। তবে ঋণ ছাড় করতে যত দেরি হবে কমিটমেন্ট ও ম্যানেজমেন্ট চার্জ তত বাড়তে থাকবে। আর পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে পুরো ঋণ। ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় হবে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে ৫ হাজার ৯৫১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া চীনের ঋণে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরে প্রকল্পের ঋণ চুক্তি সই হয়। এর এক বছর পর ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় করে দেশটির এক্সিম ব্যাংক। আবার এক বছরেও বেশি সময় আগে বাণিজ্যিক চুক্তি সই হলেও এখনো পদ্মা রেল সংযোগ ঋণ চুক্তি হয়নি। তাই ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ব্যয় নির্ধারণের পর ঋণ চুক্তির কঠিন ধাপ পার হতে হবে। এতে বর্তমান সরকারের সময় কাজ শুরু করা প্রায় অসম্ভব। এসব বিবেচনায় এ বছরেই নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।