ভিসা সহজীকরণে আউটসোর্সিং নিয়োগ ইস্যু

পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিপরীতমুখী অবস্থান

  শাহজাহান আকন্দ শুভ ও হাসান আল জাভেদ

১২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

এমআরভি (মেশিন রিডেবল ভিসা) ভিসা প্রদানে আউটসোর্সিং কাজ নিয়ে নয়াদিল্লি হাইকমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছে। ভিসা প্রদান সহজ করতে আউটসোর্সিং এজেন্ট নিয়োগ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী তাতে অনুমোদন করেন। কিন্তু নয়াদিল্লি হাইকমিশন বলছে, আউটসোর্সিংয়ের কোনো প্রয়োজন নেই।

জানা গেছে, কলকাতা উপ-হাইকমিশনে এমআরভি ভিসা প্রদান সহজ করতে আউটসোর্সিং এজেন্ট নিয়োগ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভিসাপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও হয়রানি ঠেকাতে ফাইল অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শুরুর তাগিদ দেয় বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। কিন্তু এখন নয়াদিল্লি হাইকমিশন বলছে, আউটসোর্সিংয়ের প্রয়োজন নেই। ভারতে ভিসা আউটসোর্সিং বন্ধ রাখারও সুপারিশ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি ডিও লেটার দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিও লেটারে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে এমআরভি প্রক্রিয়াকরণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অনুরোধ জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও চিঠি দিয়ে ভারতে ভিসা আউটসোর্সিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য সুপারিশ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর কারণ অনুসন্ধানে কলকাতা উপ-হাইকমিশনের ভিসা প্রদানে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ভিসা প্রদানের কার্যক্রম শুরু হলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতির পথ অনেহটাই বন্ধ হয়ে যাবে। সে কারণে হাইকমিশন চাই না, আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করুক।

গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল কলকাতা উপ-হাইকমিশন পরিদর্শনে গিয়ে ভিসা প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ ও সরেজমিনে জানতে পারেন, ওই উপ-হাইকমিশন অফিসে এমআরভি প্রক্রিয়া জটিল করে গলাকাটা হারে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, নয়াদিল্লি ও কলকাতার বাংলাদেশ মিশনে এমআরভি ইস্যুকরণ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দ্রুত আউটসোর্সের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করতে সুপারিশ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট ও ভিসা প্রদানের দায়িত্ব পড়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনের বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে। সে অনুযায়ী ওই বছরের ৩১ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র সচিবের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সচিবালয়ে একটি সভা হয়। সভায় আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমআরভি আউটসোর্সিং প্রস্তাব অনুমোদন ও পরে সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়। একই বছর ১০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সারসংক্ষেপ ও সুপারিশ অনুমোদন করেন।

এর পর আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে এমআরভি আবেদন প্রক্রিয়াকরণের উদ্দেশ্যে ‘কনসোর্টিয়াম অব বিএলএস ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেস লিমিটেড অ্যান্ড দোহাটেক নিউ মিডিয়া’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোশিয়েশন হয়। এর পর ২০১৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নেগোসিয়েশনে বলা হয়Ñ প্রতিষ্ঠানটি ভারতে এমআরভি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে। সফটওয়্যার ইন্টিগ্রেশনসহ অন্যান্য কারিগরি সহযোগিতার জন্য তারা কখনো অন্য কোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী থাকবে না, যাতে ভারত থেকে বাংলাদেশে আগমনকারীদের এমআরভি প্রদান কার্যক্রম দ্রুত, স্বচ্ছ ও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা যায়। বিষয়টি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও উপস্থাপন করা হয়।

মন্ত্রিসভা বৈঠকে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান এমআরভি আবেদনকারীদের জনপ্রতি সার্ভিস চার্জ ভিসা ফির অতিরিক্ত ৩.৯৮ মার্কিন ডলার হিসেবে। ৩ বছরে মোট ৬ লাখ আবেদনকারীর জন্য মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের সেবা ক্রয় প্রস্তাবে সুপারিশ করা হয়, যা ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেন।

কিন্তু নয়াদিল্লিসহ বাংলাদেশ হাইকমিশনের বরাত দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়, কনসুলার সার্ভিসে আউটসোর্সিংয়ের দরকার নেই। এর ঠিক তিন মাস পর আউটসোর্সিং বন্ধ রাখার জোর সুপারিশ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত বছরের ২৩ জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর একটি ডিও লেটার দিয়ে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে এমআরভি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে বলেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সুপারিশসংবলিত চিঠি পাঠান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাতে আউটসোর্সিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য ফের সুপারিশ করেন। এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম শুরু করতে বলে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। কিন্তু কনসুলার উইংয়ের বাধায় তারা কাজ শুরু করতে পারেনি। এরই মধ্যে কলকাতা দূতাবাসে এমআরভি প্রদানে অচলাবস্থা শুরু হয়।

ওই প্রেক্ষাপটে সরেজমিন বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করতে ৩০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলকে কলকাতায় পাঠানো হয়। তারা কলকাতা উপ-হাইকমিশন অফিস পরিদর্শন, ছদ্মবেশে এমআরভি সেবাপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকার, সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময়, নয়াদিল্লি হাইকমিশন অফিসের কনসুলার সেকশন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ফিরে এসে তারা একটি প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেন।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলটি অনুসন্ধানে জানতে পারে, ভিসাপ্রার্থীরা বিভিন্ন সেন্টার বা দোকান থেকে ভিসার জন্য অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করেন। অনলাইনে আবেদন জমা হওয়ার পর তার হার্ডকপি মিশন অফিসে জমা দিতে হয়। তবে টাকার বিনিময়ে মিশন অফিসে না এসেও দালালের মাধ্যমে ভিসা পাওয়া যায়। ওই টিম জানতে পারে, একজন সেবাপ্রার্থী মিশন অফিসে না এসেই ১৫ হাজার রুপি ঘুষ দিয়ে এক বছর মেয়াদি একটি মাল্টিপল বিজনেস ভিসা পেয়েছেন।

কলকাতা উপ-হাইকমিশন অফিসের আশপাশের ছোটখাটো দোকানদার বিশেষ করে চায়ের দোকান, ফটোকপির দোকান ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, টাকার বিনিময়ে ভিসা সার্ভিস পাওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে এক মাসের ভিসার জন্য ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার রুপি প্রয়োজন হবে। এই টাকা কেন লাগবে কিংবা কার জন্য লাগবে।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র সচিব, কলকাতার উপ-হাইকমিশনার তৌফিক হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাসুদ রেজওয়ান গত রাতে আমাদের সময়কে বলেন, কলকাতা উপ-হাইকমিশনে একটি দালাল শ্রেণি রয়েছে, যারা ভারতীয় নাগরিকদের এমআরপি পাইয়ে দিতে সহায়তা করছে। এ নিয়ে আমাদের একটি টিম কলকাতা পরিদর্শনে গেছে। তারা এসে যে প্রতিবেদন ও মতামত দেবে, আশা করি তাতে সমস্যা কেটে যাবে।

কলকাতা উপ-হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার তৌফিক হাসান, কনসুলার উইংয়ের কাউন্সেলর মনসুর আহমেদসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওই টিমের আলোচনা হয়। কনসুলার উইং বলেছেন, হাইকমিশনের ‘রিজার্ভেশন’ আছে। তাদের মতে, আউটসোর্সিং কার্যক্রম শুরু হলে তাদের কাজকর্মে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। অফিসের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো কাজ থাকবে না। এমনকি নিরাপত্তাও বিঘিœত হতে পারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টিম সরেজমিন কনসুলার উইং ঘুরে দেখেছেন, জমা প্রদান করা কয়েকটি ভিসা আবেদন ফরমে কারও স্বাক্ষর বা অনুস্বাক্ষর নেই। ভিসাপ্রার্থীদের লাইনে শৃঙ্খলা ছিল না। কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের লিংক ডাউন থাকায় যথাযথভাবে ভিসার এনরোলমেন্ট হয়নি। ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর হাইকমিশন অফিসের ভিসা কাউন্টার বন্ধ থাকায় ভিসাপ্রার্থীরা বাইরে ঘোরাফেরা করেন।

২০১৭ সালে কলকাতা উপহাইকমিশন থেকে ৮৫ হাজার ৭১টি এমআরভি ইস্যু হয়। সে হিসাবে প্রতিমাসে গড়ে ইস্যুকৃত এমআরভির সংখ্যা ৮ হাজার ৫০৭টি। এই হিসাব অনুযায়ী এমআরভি প্রার্থীর উপস্থিতি হাইকমিশনে দেখা যায়নি। এতে প্রতীয়মান হয়, সেবাপ্রার্থীদের অফিসে না এসেও ভিসা প্রদানে ‘মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল’ শ্রেণি কাজ করে। ভিসা অফিসে ন্যূনতম মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নেই বলে ভিসাপ্রার্থীরা দুর্ভোগের শিকার হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের মতামতে বলা হয়, প্রতিবছর প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ সফর করেন। এ ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতারা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকারিভাবে ভিসা ফি ধার্য না থাকা সত্ত্বেও সেবাগ্রহীতাদের ভিসার জন্য টাকা দিতে হচ্ছে। ভিসা ইস্যু করাই দৃশ্যত মিশনের মূল কাজে পরিণত হওয়ায় বিষয়টি সন্দেহের উদ্রেক করে। ভিসা ইস্যু কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এমআরভি কার্যক্রম আউটসোর্সিং করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে