তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প স্থবির

প্রকাশ | ১২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০৮:৫০

লুৎফর রহমান কাকন

দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। আবাসিক খাতেই শুধু নয়, বাণিজ্যিক খাতেও গ্যাস বন্ধ থাকায় বহু শিল্পকারখানা মুখ থুবড়ে পড়ার পথে, অসংখ্য উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করে ফেঁসে গেছেন, অনেক দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এক কথায়- গ্যাসের অভাবে দেশের সার্বিক আর্থিক অগ্রগতিই ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে নতুন নতুন কূপ খননের পাশাপাশি দেশের সম্ভাব্য স্পটগুলোতে জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধানে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার; কিন্তু অধিকাংশ প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা, এমন অনেক প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য। অথচ ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে অর্ধেকেরও বেশি সময়। কিছু প্রকল্প টার্গেট সময়ের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ এগিয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে এসব প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকদের যোগ্যতা নিয়ে। এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী সভায় বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে জ্বালানি বিভাগকে। তাই সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর পরিচালকদের কড়া ভাষায় তিরস্কার করে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

পেট্রোবাংলার আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিভিন্ন প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রকল্প পরিচালকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে। প্রকল্প বাস্তবায়নে তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রকল্প পরিচালকদের। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত একাধিক প্রকল্পে অর্থব্যয় এখনো শূন্যের কোঠায়।

সূত্রমতে, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করলেও অধিকাংশ প্রকল্পের অগ্রগতি চরম হতাশাজনক। নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলেও অধিকাংশ প্রকল্পের অগ্রগতি ৫ শতাংশের মধ্যে। ফলে চলতি বছরের জুনের মধ্যে ৫২২৭ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধি এবং প্রায় ১৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার যে পরিকল্পনা ছিল, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পিছিয়ে গেছে ৬ হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদের অনুসন্ধানে দ্বিমাত্রিক জরিপের কাজ।

সূত্র জানায়, মো. ময়নুল হোসেন ‘২ডি সাইসমিক সার্ভে ওভার এক্সপ্লোরেশন ব্লক ৩বি, ৬বি ও ৭’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)। প্রকল্পটিতে ২০১৭-১৮ মেয়াদে ১৮৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যায় ধরা হয়েছে। একই অর্থবছরে এডিপিতে প্রকল্পটির অনুকূলে ৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি প্রকল্পে। অথচ এ সময়ে জাতীয় গড় অগ্রগতি ২০ শতাংশ। এ প্রকল্পে জুন ২০১৮ সালের মধ্যে তিন হাজার কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করার কথা; কিন্তু প্রায় ৯ মাস পার হয়ে গেলেও প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। তাই জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প পরিচালককে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছেÑ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকল্প পরিচালকের যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মস্পৃহা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া হতাশাজনক। চিঠিতে প্রকল্প পরিচালককে তৎপর হওয়ার পরার্মশ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ায় জ্বালানি বিভাগকে যে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সভায় বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে, তা-ও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। প্রায় একই ধরনের তিরস্কারমূলক চিঠি দেওয়া হয়েছে ৮ প্রকল্প পরিচালককে।

রূপকল্প-৫ খনন প্রকল্পের পিডি মো. তোফায়েল উদ্দিন সিকদার। এর আওতায় দুটি অনুসন্ধান কূপ শ্রীকাইল নর্থ-১, মোবারকপুর সাউথ ইস্ট-১; একটি মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৪) এবং একটি ওয়ার্কওভার (বেগমগঞ্জ-৩) প্রকল্প ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩০০ কোটি টাকা ধরে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় আট মাস পার হয়ে গেলেও প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চলতি বছরের জুনের মধ্যে ১৯০ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধি এবং দৈনিক ২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে হলেও অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

একই অর্থবছরে এডিপির অন্তর্ভুক্ত আরেকটি প্রকল্পÑ ‘তিতাস, হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের ৭টি কূপে ওয়ার্কওভার’। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০১৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা। ৩৫৫ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এ প্রকল্পের পরিচালক বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) কর্মকর্তা মীর মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে ১৩ কোটি টাকা; কিন্তু চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক কোনো অগ্রগতি নেই। জ্বালানি বিভাগ বলছে বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়; বরং হতাশাজনক। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়ন করে ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার কথা; কিন্তু প্রকল্পের গতি ও অগ্রগতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, তা সম্ভব নয়।

‘রূপকল্প-৯ ২ডি সাইসমিক সার্ভে বা দ্বিমাত্রিক জরিপ’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক তারিকুল ইসলাম। প্রকল্পটিতে এপ্রিল ২০১৭ থেকে জুন ২০১৯ মেয়াদে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ আছে ৬৮ কোটি টাকা। অথচ গত ৮ মাসে প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। এ প্রকল্প নিয়েও হতাশ জ্বালানি বিভাগ।

‘রূপকল্প-১ খনন প্রকল্পে ৩টি অনুসন্ধান কূপ রয়েছে। এগুলো হলোÑ হারারগঞ্জ-১ ইস্ট-১ ও সালদা নর্থ-১। দুটি উন্নয়ন কূপ রয়েছে। এগুলো হলোÑ শ্রীকাইল নর্থ-২ ও কসবা-২। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৭৮ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের জুনে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সে অনুযায়ী অগ্রগতি না হওয়ায় এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরীকে চিঠি দিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছে জ্বালানি বিভাগ। প্রকল্পটিতে চলতি অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি না থাকায় আর্থিক খরচ হয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। অথচ সময় আছে আর মাত্র পাঁচ মাস। এ প্রকল্প থেকে চলতি বছরের জুনের মধ্যে ৪৫১ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধি করা হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার কথা ছিল এ প্রকল্প থেকে; কিন্তু সময়মতো প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ায় যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে, তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে পিডিকে পাঠানো চিঠিতে এ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।

‘রূপকল্প-২ খনন প্রকল্পের আওতায় চারটি অনুসন্ধান কূপ (সালদা নদী দক্ষিণ-১, সেমুতাং দক্ষিণ-১, বাতচিয়া-১ এবং সালদা নদী পূর্ব-১) বাস্তবায়নাধীন। এ প্রকল্পের পরিচালক মো. জহরুল ইসলাম। জুলাই ২০১৬ থেকে জুন ২০১৮ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। এটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪১৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির অনুকূলে বরাদ্দ ছিল ১২০ কোটি টাকা। অথচ এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে সাকুল্যে মাত্র ৫৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৪ হাজার ৩৫৮ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধি এবং প্রতিদিন ২৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ জ্বালানি বিভাগ।

‘রূপকল্প-৩ খনন প্রকল্পে ৪টি অনুসন্ধান কূপের কাজ রয়েছে। এগুলো হলোÑ কসবা-১, মাদারগঞ্জ-১, জামালপুর-১ ও শৈলকুপা-১। প্রকল্পটির পরিচালক মো. মিজানুর রহমান। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৮৩ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের জুনে শুরু হওয়া প্রকল্পটি চলতি বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। এ প্রকল্পে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র এক কোটি ১১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দশমিক ১১ শতাংশ কাজ হয়েছে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৪ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার কথা ছিল।

রূপকল্প-৪ খনন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. বজুলর রহমান আহমেদ। এ প্রকল্পের আওতায় দুটি অনুসন্ধান কূপ (শাহবাজপুর পূর্ব-১ ও ভোলা উত্তর-১) এবং দুটি ওয়ার্কওভার কূপ বাস্তবায়ন করার কথা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৬২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পে এডিপির ২২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র সাড়ে ছয় কোটি টাকা। অথচ প্রকল্পের মেয়াদ দুই-তৃতীয়াংশই শেষ। সময় আছে আর মাত্র পাঁচ মাস। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চলতি বছরের জুনের মধ্যে গ্যাসের মজুদ ২০৪ বিসিএফ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিদিন ৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু সেই পরিকল্পনাই সার। বাস্তবায়ন বহুদূর।