নাখালপাড়ার জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নিহত ৩

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোপছোপ তাজা রক্ত। পাশেই এলোমেলোভাবে দুটি পিস্তল পড়ে আছে। ঘরজুড়ে ছড়ানো ছিটানো জামা-কাপড়। একপাশে পড়ে আছে তোষক-চাদর। একটি পলিথিনের ব্যাগে মুড়ানো কয়েকটি পাগড়ি। কক্ষের সঙ্গে লাগায়ো বারান্দাটাকেই রান্নাঘর বানানো হয়েছে। সেখানে দুটি গ্যাসের চুলা। এমনই চিত্র দেখা গেল রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ার ১৩/১ নম্বরের ‘রুবি ভিলা’ নামের জঙ্গি আস্তানার একটি কক্ষে। এ কক্ষেই র্যাবের সঙ্গে গোলাগুলি ও গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত হয় তিন জেএমবি সদস্য। এখানে বসেই তারা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করে বলে জানায় র্যাব।

এক প্রশ্নের জবাবে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান আমাদের সময়কে বলেন, এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) পাশে এ ধরনের জঙ্গি আস্তানা অবশ্য ঝুঁকির বিষয় ছিল। বিধ্বংসী কোনো একটি কাজের জন্য তারা জড়ো হয়েছিল। তবে জঙ্গিরা যেখানেই থাকুক না কেন তাদের ঠেকাতে প্রস্তুত আমরা।

জঙ্গি আস্তানাটির অবস্থান পুরান ন্যাম ভবনের পেছনের দিকে। আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ওই আস্তানার দূরত্ব প্রায় দেড়শ গজের মতো। গত বৃহস্পতিবার রাত ২টা থেকে বাড়িটি ঘিরে অভিযান শুরু করে র্যাব। এর পরই গোলাগুলির বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে আতঙ্কিত আশাপাশের বাসিন্দাদের। জঙ্গি আস্তানার উপরের ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্র পারভেজ হোসেন। অভিযানের খবর পেয়ে সকালেই তার উদ্বিগ্ন বাবা ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। এ সময় পারভেজ মোবাইল ফোনে জানান, রাত আড়াটা থেকে ৩টার দিকে প্রচ- গোলাগুলির শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। আতঙ্কিত হয়ে বের হতে গিয়ে দেখেন দরজা বাইরে থেকে লাগানো। ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর শব্দ থেমে যায়।

র্যাব জানায়, অভিযানের পর ওই বাসা থেকে দুটি পিস্তল, ১৪টি ডেটোনেটর, তিনটি আইইডি, তিনটি সুইসাইডাল ভেস্ট, চারটি পাওয়ার জেল উদ্ধার করা হয়। পশ্চিম নাখালপাড়ার ওই জঙ্গি আস্তানায় র্যাব অভিযানের পর বাইরে উৎসুক জনতা ভিড় জমায়। তাদের সরাতে বারবার মাইকিং করে র্যাব। অভিযানের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাহিনীর মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। এ ঘটনায় রুবি ভিলার মালিক শাহ মো. সাব্বির হোসেন, ম্যানেজার রুবেল ও শীতলসহ মোট চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

জানা গেছে, মো. সাব্বির হোসেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পার্সার। এক সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ওই বাড়ির দোতলায় থাকেন তিনি। ভবনটিতে যখন অভিযান চলছিল তখন সাব্বির ছিলেন বিমানের একটি ফ্লাইটে। চট্টগ্রামে পৌঁছার পর র্যাবের জিম্মায় তাকে ঢাকায় আনা হয়।

এদিকে গতকাল দুপুর ২টার দিকে মূল অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে মুফতি মাহমুদ খান বলেনÑ আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল, যারা বিভিন্ন জায়গায় নাশকতার পরিকল্পনা করছে এমন কয়েকজন সক্রিয় জঙ্গি এখানে একত্রিত হয়েছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। মূল অভিযানটা শুরু হয় রাত সাড়ে ৩টার দিকে। এর আগে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে চাইলে র্যাবকে সহযোগিতা করেনি বাড়ির লোকজন। পরে বাসার গেটের গ্রিল কেটে ভেতরে ঢোকে র্যাব।

তিনি বলেন, বাসার ম্যানেজার রুবেলের সঙ্গে কথা বলে জঙ্গিদের অবস্থান পাঁচ তলায় চিহ্নিত করা হয়। পঞ্চম এবং ষষ্ঠ তলার মেসে মোট ২১ জন থাকতেন। প্রতিটি ফ্ল্যাটে তিনটি রুম। পাঁচতলার ফ্ল্যাটের একটি রুমে তিন জঙ্গি উঠেছিল। তারা র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে দরজা খুলে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এর পর র্যাবও পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে। গোলাগুলির পর একপর্যায়ে র্যাব নিশ্চিত হয় যে. ওই তিনজন নিহত হয়েছে। পরে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এবং ডগ স্কোয়াড দিয়ে বাসাটিতে তল্লাশি চালানো হয়। এ ঘটনায় দুজন র্যাব সদস্যও আহত হয়েছেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

র্যাবের এই মুখপাত্র আরও বলেন, রুবেল নামে এক ব্যক্তি মেসগুলো ভাড়া দিতেন। তিন জঙ্গি ছাড়াও ওই ফ্ল্যাটের অন্য রুমে আরও চারজন সাধারণ লোক ছিলেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় লেখাপড়া করেন। জাহিদ নামে এক যুবক গত ২৮ ডিসেম্বর এসে পাঁচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নেয়। সে তখন বলেছিল, একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। দুই ভাইকে নিয়ে ওই বাসায় থাকবে। এর পর ৪ জানুয়ারি জাহিদ পরিচয় দেওয়া ওই যুবক বাসায় ওঠে। বাকি দুজন ওঠে ৮ জানুয়ারি। নিহত তিনজনের বয়স ২৫ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। তাদের নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছি তারা জেএমবি সদস্য।

তিনি বলেন, জাহিদ খুব ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে অনেক রাতে ফিরতো। অন্য দুজন কখনো বাড়ির বাইরে যেত না। একটি ছবি সম্বলিত দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। একটিতে নাম জাহিদ। বাবার নাম জোবায়ের হোসেন। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা। অপরটিতে একই ছবি ব্যবহার করে সজীব। বাবার নাম জামান হোসেন ও বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া উল্লেখ করা হয়। তাই আইডি দুটি ভুয়া মনে হচ্ছে। তাদের প্রকৃত পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।

জঙ্গি আস্তানার পাশের বাড়ির বাসিন্দা ফারজানা আমাদের সময়কে জানান, রাত ৩টার দিকে প্রচ- শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ভয়ে আর রাতে ঘুমাতে পারেননি। সকালে বাসা থেকে বের হন তিনি। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, এর আগেও দুই দফা একই বাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বছরের একটি অভিযানে ১২ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

মুফতি মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, একটি বিস্ফোরক রাখা ছিল গ্যাস বর্নারের ওপর। তাতে তাদের মনে হয়েছে, চুলার ওপর রেখে আগুন জ্বালিয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে চেয়েছিল জঙ্গিরা। কিন্তু অভিযানের শুরুতেই র্যাব ওই বাড়ির গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। জঙ্গিরা গ্যাস ছেড়ে দিয়ে ওইভাবে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে পুরো ভবনের বাসিন্দাদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারতো বলে জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে মুফতি মাহমুদ বলেন, আমাদের কাছে খবর ছিল একটি গ্রুপ ঢাকায় সক্রিয় হচ্ছে। নিহত জঙ্গিদের সঙ্গে আর কাদের যোগাযোগ ছিল তা বের করার চেষ্টা চলছে। ওই বাড়িতে ৫৬ থেকে ৫৭ জন বাসিন্দা বাস করেন। অভিযানের আগে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। সব বাসিন্দাই নিরাপদে আছেন।

এদিকে ময়নাতদন্তের জন্য নিহত তিন জঙ্গির লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে