মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডি

দুর্বল অর্থনীতি বাড়তি ঝুঁকিতে পড়বে

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গেল বছরের শেষের দিকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি খাতে অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচনী বছরে অর্থনীতি বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রক্ষণশীল নীতিতে চলার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৭-১৮ অর্থবছর প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির গবেষকরা এসব কথা বলেন।

সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলেন, অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৭ সাল শুরু হলেও শেষের দিকে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। চাপের মুখে পড়েছে। এটা সামাল দিতে আমরা যে সংস্কারের কথা বলেছিলাম, তা সামনের দিকে এগোয়নি, বরং পেছনের দিকে গেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্যাংকিং খাত।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এক দশক ধরে একটি শোভন প্রবৃদ্ধির হার রক্ষা করতে পেরেছে। কিন্তু এই শোভন প্রবৃদ্ধির হারের নিচে যে অন্ধকারটি রয়েছে, সেটি হলো দেশের ভেতরে সে তুলনায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না, দারিদ্র্য বিমোচনের হার শ্লথ হয়েছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বৈষম্য শুধু আয়ে আর ভোগে বৃদ্ধি পায়নি, সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে সম্পদের বৈষম্য। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকে ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়া, বড় বড় প্রকল্পের ভেতর থেকে বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ ভিন্ন দিকে পরিচালনা করাকে চিহ্নিত করেন তিনি।

সামগ্রিক এই পরিস্থিতির জন্য দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করেন এই অর্থনীতিবিদ। দেবপ্রিয় বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বমূলক ভূমিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতি সংস্কারের অভাব, সমন্বয় করতে না পারা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় দুর্বলতা।

চলতি বছর সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের সব কর্মকা- নির্বাচনমুখী। আগের সংস্কার হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। চলতি বছর এমন ম্যাজিক্যাল কিছু ঘটবে না যাতে বড় ধরনের সংস্কার হবে। সংস্কার করার মতো রাজনৈতিক পুঁজিও নেই। গত বছরের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সঙ্গে চলতি বছরের নির্বাচনী বাড়তি ঝুঁকি যোগ হবে। এ জন্য রক্ষণশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবেÑ ঋণ কমাতে হবে, টাকার মূল্যমান ঠিক রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে চালের দাম কমাতে হবে। নির্বাচনী বছরে বহুমুখী চাপ সামলাতে রাজনৈতিক দুরদর্শিতা প্রয়োজন।

সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের কাঁচামাল তুলা আমদানি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদনে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কারসাজির মাধ্যমে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী বছরে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। বর্তমান সমস্যা ও নির্বাচনের বাড়তি ঝুঁকি যোগ হলে অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বক্তৃতা করেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। মূল প্রবন্ধে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বলা হয়, গত বছর আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। এটি ফিরিয়ে নেওয়ার আলোচনা চলছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রতিদিন যদি ৩০০ জন ফেরত পাঠানো হয়, তা হলেও সময় লাগবে কমপক্ষে ৭ বছর। এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ৪৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর যদি প্রতিদিন ২০০ জন ফেরত পাঠানো হয়, তা হলে সময় লাগবে কমপক্ষে ১২ বছর এবং এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ১ হাজার ৪৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

এতে আরও বলা হয়, ধনীরা ২০১০ সালে যা আয় করতেন, ২০১৬ সালে এসে এর চেয়ে বেশি আয় করেছেন। অন্যদিকে আয় কমেছে গরিবদের। ২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ ভাগ ছিল সর্বোচ্চ ধনী ৫ শতাংশের কাছে; অন্যদিকে ০.০৪ ভাগ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৫ ভাগের কাছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছেনি। গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে