বঙ্গবন্ধু সেতু

দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেই দুই বছর শেষ

  তাওহীদুল ইসলাম

১৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সবচেয়ে বড় সেতু- বঙ্গবন্ধু সেতু। এই সেতু থেকে টোল আদায়ের জন্য অপারেটর নিয়োগে ‘সময়মতো দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার কাজ শেষ করা যায়নি’ যুক্তি দেখিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন অপারেটর হিসেবে ৬ মাসের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পর আরেক দফায় ৬ মাস মেয়াদ বাড়ানো হয়। দুই দফা মিলিয়ে মোট এক বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে গতকাল ১৫ জানুয়ারি। কিন্তু এখনো দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারায় আবার ৬ মাস সময় বাড়ানো হচ্ছে। এভাবে টানা ১৮ মাস ধরে বিনা দরপত্রে টোল আদায়ের সুযোগ পেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস)।

দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় ‘আগের কাজের ধারাবাহিকতায়’ সার্ভিস প্রোভাইডর হিসেবে সিএনএসকে আরও ৬ মাস সময় বৃদ্ধির তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। গতকাল আমাদের সময়ের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণে ঠিকাদারের পেছনে খরচ হতো মাসে ২৭ লাখ টাকা। সর্বশেষ পাঁচ বছর টোল আদায় করেছে জিএসআইসি-সেল-ইউডিসি। ২০১৬ সালের ৩০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি শেষ হয়েছে। এ সময়ে দরপত্র বাতিলসহ নানা ঘটনার বাস্তবতায় জরুরি বিবেচনায় ছয় মাসের জন্য দায়িত্ব দিতে হয় সিএনএসকে। যদিও একই সেবার বিনিময়ে সিএনএস চেয়েছিল আদায় করা টোলের সাড়ে ১২ শতাংশ। পরে নানা দেনদরবার শেষে আগের প্রতিষ্ঠানের হারেই সিএনএসকে অন্তর্বর্তীকাল অপারেটর হিসেবে (একক প্রতিষ্ঠান) কাজটি দেওয়া হয়। পরবর্তী ৬ মাসের জন্য এক কোটি ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯২ টাকায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) টোল আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রসঙ্গত, একক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া সরকারের ক্রয় আইনের পরিপন্থী। তবে আইনে এ-ও বলা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো বিকল্প না থাকলে দরপত্র ছাড়া কাজ দেওয়া যায়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের জন্য টোল অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দিতে দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) আহ্বানের মাধ্যমে শুরু হয় দরপত্র প্রক্রিয়া। সেই হিসাবে ইতোমধ্যে ২ বছর পার হয়ে গেছে। এ সময়ের মাঝে অনিয়মের অভিযোগে দুই দফা দরপত্র বাতিল হয়েছে। জরুরি বিবেচনায় কাজ চালাতে ৬ মাসের জন্য দরপত্রহীন অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাবে সুপারিশ করেছিল সরকারি অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এর পর থেকে সিএনএস টোল আদায়ের কাজ করলেও পাশাপাশি চলছে এ সেতুর অপারেটর নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়ন পর্ব। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ করা যাচ্ছে না। এর সর্বশেষ অবস্থা হচ্ছেÑ শর্ট লিস্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। লিস্টে স্থান পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) নেওয়া হয়। এখন আরএফপি মূল্যায়নের কাজ চলছে। এ কাজটি শেষ করতে ‘কমপক্ষে আরও ছয় মাস’ সময়ের প্রয়োজন বলে দাবি করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। এভাবে ৩ দফায় ৬ মাস করে সময় বাড়ানো হলো। আর সেতু কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ‘কমপক্ষে ৬ মাস’ সঠিক হলে ৪র্থ দফা সময় বাড়ালেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।

২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে সেতুর টোল আদায় শুরু করে সিএনএস। প্রথম দফায় তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ১৪ জুলাই। সর্বশেষ মেয়াদ ফুরায় গতকাল সোমবার। এর পর একক উৎসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলতি বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। এদিকে দরপত্রে শর্ট লিস্টেড ছয় প্রতিষ্ঠানের আরএফপি মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে সিএনএসও রয়েছে। অন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলোÑ এক. চীনের গুয়ানজিয়ো অ্যারোস্পেস হার্টলি সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড; দুই. যৌথভাবে কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন (কেইসি) কোরিয়া-এস-ট্রাফিক কো. লিমিটেড (কোরিয়া)-টিক ভ্যালি নেটওয়ার্ক (বাংলাদেশ); তিন. যৌথভাবে জিআইইটিসি (চীন) ইউডিসি (বাংলাদেশ); চার. যৌথভাবে এইচপিসিসি (সাউথ কোরিয়া)-এসইএল (বাংলাদেশ) এবং পাঁচ. যৌথভাবে ইজিআইএস (ফ্রান্স)-এমবিইএল (বাংলাদেশ)।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিকে নিরুৎসাহ করা আছে পিপিআরের বিধিতে। পিপিআর ৭৪ (২) এ বলা আছে, ‘সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে অবাধ প্রতিযোগিতার সুফল পাওয়া যায় না বা স্বচ্ছতার অভাব থাকে বা অগ্রহণযোগ্য এবং প্রতারণামূলক তৎপরতাকে উৎসাহিত করতে পারে বিধায় এই পদ্ধতির প্রয়োগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করিবেন’।

সেতু কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণ মেয়াদের টোল আদায়কারী নিয়োগে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলে প্রথমে আপত্তি এবং এর পর আরও জটিলতার কারণে দুই দফা দরপত্র বাতিল হয়ে যায়। অন্য অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করে যে, দরপত্র দলিলে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তাতে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটে (সিপিটিইউ) এই অভিযোগ গেলে দরপত্র বাতিল করা হয়।

সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি তথা ডিপিএমের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় মন্ত্রিসভা কমিটিকে সেতু বিভাগ জানিয়েছে, টোল অপারেটর নিয়োগের জন্য প্রথম দফায় সার্ভিস বিবেচনায় ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইওআই (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) আহ্বান করে। তবে ইওআই মূল্যায়নকালে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, পরিকল্পনা কমিশনের সিপিটিইউ তথা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের মতামত এবং হোপের (হেড অব প্রকিউরিং এনটিটি-ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান) অনুমোদন অনুযায়ী ইওআই বাতিল করা হয়। এর পর ২৩ জুলাই ‘এক ধাপ দুই খাম’ পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু দরপত্র দাখিলকারী একটি প্রতিষ্ঠান সিপিটিইউর রিভিউ প্যানেলে আপিল করে। এর পর এ কাজটিকে সার্ভিস বিবেচনায় ‘প্রসেস’ করার ব্যাপারে ‘অবজারভেশন’ এ উল্লেখ করে রিভিউ প্যানেল। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেয় সিপিটিইউ। তার পর টোল অপারেটর নিয়োগে স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্ট সরবরাহের জন্য সিপিটিইউকে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর চিঠি দেয় সেতু বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি টোল অপারেটর নিয়োগে ইওআই নোটিশসহ আরএফপি ডকুমেন্ট পাঠানো হয়। একই বছরের ১৬ মার্চ ইওআই আহ্বান করে ওই বছরের ৪ মে তা গ্রহণ করে সেতু কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ইওআইয়ের পর শর্টলিস্ট চূড়ান্তকরণ, আরএফপি ইস্যু ও গ্রহণ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ‘৬ মাস’ লেগে যাবে। তাই জরুরি বিবেচনায় ৬ মাসের জন্য অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ এর ৬৮ (১) ধারা অনুযায়ী সিসিইএতে পাঠায় সেতু বিভাগ। এর পর অনুমোদন মেলে জরুরি বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন অপারেটর নিয়োগে। এর পর থেকেই ৬ মাস করে সময় বৃদ্ধি চলছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে