আটকে গেল নির্বাচন

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০৮:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপনির্বাচন আইনি জটিলতায় পড়ার শঙ্কা ছিল। নির্বাচন কমিশন নানা ত্রুটি রেখেই তফসিল ঘোষণার পর সবার মধ্যে সেই শঙ্কা আরও তীব্র হয়। তফসিল ঘোষণার ৮ দিন পর হাইকোর্ট নির্বাচন স্থগিত করার পর সেই শঙ্কাই সত্যি হলো। তিন মাসের জন্য আটকে গেল নির্বাচন। গত কয়েক দিন ধরে নির্বাচন নিয়ে যে উৎসব তৈরি হয়, আদালতের আদেশে তা থেমে গেল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ মানুষের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। ডিএনসিসির উপনির্বাচন উচ্চ আদালত স্থগিত করায় মানুষের সেই অধিকার স্থগিত হয়ে গেল। এ নিয়ে এখন এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দুষছেন। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সব মহলকে বলবÑ যাতে নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে হয় সে জন্য তারা যেন পদক্ষেপ নেন।

অবশ্য নির্বাচন স্থগিত করার আগে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজনৈতিক দলগুলো। আওয়ামী লীগ ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম এবং তাবিথ আউয়ালকে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। আজ ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এর আগে অনেকে মনোনয়নপত্র জমাও দেন।

মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেতা আদালতে নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট করলে তখন থেকে নির্বাচন স্থগিত হচ্ছেÑ এমন শঙ্কা থেকে নানা গুঞ্জন শুরু। তবে নির্বাচনের তফসিলের পর থেকে নির্বাচনকে ঘিরে উৎসব শুরু হয়। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র বছরখানেক আগে এ নির্বাচনকে অনেকে জনপ্রিয়তা যাছাইয়ের নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করেন।

গতকাল বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি জাফর আহমেদের বেঞ্চ মেয়র পদে উপনির্বাচন স্থগিতের আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ডিএনসিসির সম্প্রসারিত অংশের ১৮টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ৬টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নির্বাচনও স্থগিত করা হয়। পৃথক দুটি রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বুধবার একই সঙ্গে মেয়র পদে উপনির্বাচনের জন্য ঘোষিত তফসিল ও নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর নির্বাচনের সার্কুলার কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে আদালত রুল জারি করেন।

বিএনপি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ইসি ও সরকারের যৌথ প্রযোজনায় এ নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ বলেছে, এর সঙ্গে তাদের কোনো যোগসাজশ নেই। আদালতের আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর আইনি পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছে ইসি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ইসিকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

ডিএনসিসি উপনির্বাচন স্থগিত বিষয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে, এ নির্বাচন নিয়ে আমার কোনো শঙ্কা ছিল না। আওয়ামী লীগ আমাকে মেয়র পদে মনোনীত করেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দল আমাকে যেভাবে সিদ্ধান্ত দেবে সে অনুযায়ী কর্মকা- করে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। আশা করি, আজ বা আগামীকাল ডিএনসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেই। আমি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছি ও থাকব। নির্বাচন যখনই হবে তখন নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।

বিএনপি মনোনীত মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচন নাগরিক অধিকার। নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচন হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আটকে গেল। উত্তর সিটিতে জনপ্রতিনিধি না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত বলে মনে করেন তিনি।

গত ৩০ নভেম্বর মেয়র আনিসুল হকের আকস্মিক মৃত্যুর পর ডিএনসিসির মেয়র পদে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ৯ জানুয়ারি ঘোষিত ওই তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির মেয়র পদসহ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি করে ৩৬টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং ৬টি করে ১২টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডেরও ভোট হওয়ার কথা ছিল। তফসিল ঘোষণার এক সপ্তাহের ব্যবধানে উত্তর সিটির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মঙ্গলবার পৃথক দুটি রিট হয়। একটি রিটের আবেদনকারী ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আতাউর রহমান। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কোষাধ্যক্ষ। অপর রিট আবেদনকারী হলেন বেরাইদ ইউপির চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

এ ছাড়া ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন স্থগিত চেয়েও দুটি রিট হয়েছে। দক্ষিণের রিট আবেদন দুটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। উত্তরের রিট আবেদন দুটির প্রাথমিক শুনানির পর বুধবার হাইকোর্ট ডিএনসিসির উপনির্বাচন স্থগিত করে রুল জারি করেন। শুনানিকালে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের দেওয়া বক্তব্য তুলে ধরে আদালত বলেন, রিট আবেদন দুটির সারবত্তা (যৌক্তিকতা) রয়েছে। নির্বাচন স্থগিত এবং রুল জারি করা হলো।

আদালতে রিটকারী আতাউরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী আহসান হাবিব ভূঁইয়া। জাহাঙ্গীরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রাশিদা চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান ও ইসির পক্ষে তৌহিদুল ইসলাম।

হাইকোর্টের আদেশ বিষয়ে আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনের তফসিল, ১৮টি কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ৬টি কাউন্সিলর নির্বাচনের সার্কুলার তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আদেশের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হয়েছে। কমিশন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। কমিশনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিএনপি সমর্থক প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসানুর রহমান বলেন, ইসি এখন কী করে আমরা সেটি পর্যবেক্ষণ করব। এ ছাড়া আদেশের কপি হাতে পেয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায় কিনা তা দেখা হবে।

রিট আবেদনের শুনানিতে কামরুল হক সিদ্দিকী আদালতকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের (৮ নম্বর) এলাকা থেকে বাদ দিয়ে ৩৭ থেকে ৫৪ নম্বর (১৮টি) ওয়ার্ড নতুনভাবে উত্তর সিটি করপোরেশনে যুক্ত করা হয়। ওয়ার্ডগুলোর ভোটার তালিকা এখনো প্রস্তুত করা হয়নি। রিট আবেদনকারী একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। এর জন্য তার ৩০০ ভোটারের সমর্থন লাগবে। কিন্তু ভোটার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়ায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। অথচ মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন হচ্ছে ১৮ জানুয়ারি। এ জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ তৈরি হয়নি। তিনি আরও বলেন, আইন অনুযায়ী কাউন্সিলরদের মেয়াদকাল হবে ৫ বছর। কিন্তু নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ১৮ ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলরদের মেয়াদ কত দিন হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এ অবস্থায় ইসির তফসিল ঘোষণা আইনসম্মত হয়নি।

অপর রিট আবেদনকারী আতাউর রহমানের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খানও উপরোক্ত যুক্তির পাশাপাশি আরও কিছু যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি আদালতে বলেছেন, আইনের ৫(৩) ধারা অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শুরু হয়, যখন একজন নির্বাচিত মেয়র থাকে এবং তার সঙ্গে অন্তত ৭৫ শতাংশ ওয়ার্ডে নির্বাচিত কাউন্সিলর থাকে। বর্তমানে ৩৬টি ওয়ার্ডের সঙ্গে যেহেতু নতুন করে আরও ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হয়েছে, সে কারণে বর্তমানে ৬৬ শতাংশ ওয়ার্ডে নির্বাচিত কাউন্সিলর রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্তত ৭৫ শতাংশ ওয়ার্ডে নির্বাচিত কাউন্সিলর না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মেয়র নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, আইনে বলা আছেÑ আকস্মিক শূন্যতার জন্য কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু যেসব কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হচ্ছে, সেগুলো আকস্মিভাবে শূন্য হয়নি। এগুলো শূন্যতার কারণ হচ্ছে নতুনভাবে সৃষ্ট। এখন কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যদি নতুন কোনো ওয়ার্ড সৃষ্টি করা হয়, সেই শূন্য পদে এ ধরনের মধ্যবর্তী নির্বাচন বা আংশিক মেয়াদে নির্বাচন হওয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই। তা ছাড়া আমরা যদি ধরে নিই পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচন করা হবে, তা হলেও একটা অসুবিধা হবে, যেটি আইনে অনুমোদিত না। এখন পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচন হলে কখনই ঢাকা সিটির সব কটি ওয়ার্ডের নির্বাচন একই সঙ্গে হবে না। একটা মধ্যবর্তী নির্বাচন করতে হবে। কারণ এদের পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্তির আগেই অন্যদের পাঁচ বছর পূর্তি হবে। তা ছাড়া আবেদনকারী ২০১৫ সালে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, যার মেয়াদ ২০২১ সাল পর্যন্ত। ইউপি এলাকা সিটি করপোরেশনে যুক্ত হওয়ার পর সে ক্ষেত্রে কী হবে, তাও স্পষ্ট নয়।

ইসির আইনজীবী তৌহিদুল ইসলামের বক্তব্য হচ্ছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তা স্থগিতের কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া সীমানা পুনর্নির্ধারণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সেটি করে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন করার সুপারিশ করেছে। সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছু নেই। আদালত উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে আদেশ দেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে