শিক্ষামন্ত্রীর পিওর কোটি টাকার বাড়ি

  হাসান আল জাভেদ

২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১১:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরি দশম গ্রেডের। বেতন ২৮ হাজার ১০০ টাকা। সেখান থেকে বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে কাটা যায় ১৫ হাজার ১২ টাকা। আবার ৬ লাখ টাকা ব্যাংক লোনের কিস্তি গোনা। তবু কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন প্রশাসনের এই কর্মকর্তা। চলতেন জ্যেষ্ঠ কর্তাদের সরকারি গাড়ি হাঁকিয়ে। তিনি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মোতালেব হোসেন।

রাজধানীর হাজারীবাগের বসিলা ব্রিজসংলগ্ন ‘ওয়েস্ট ধানম-ি ডেভেলপার সোসাইটি’তে বহুতল বাড়ির ছাদের নির্মাণকাজ শেষ করেছেন এই মোতালেব হোসেন। থাই গ্লাস, টাইলসে বসবাসের উপযোগী করে তোলা হয় দ্বিতীয় তলা। তড়িঘড়ি করে কাজ চলছিল লিফট ও পাঁচতলার। কিন্তু এরই মধ্যে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। গতকাল এ প্রতিবেদক সরেজমিন বি-ব্লক ১ নম্বর সড়কের ওই ৬তলা বাড়িতে যান।

স্থানীয়রা বলছেন, ২০০৪ সালে ডোবা-জলাশয়ের ৩ কাঠা ওই জমি কেনেন মোতালেব হোসেন। এর পর গত ৫ থেকে ৭ বছর আগে কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে বালু দিয়ে জমি ভরাট করেন। এতগুলো বছরে লোকজন জানতেন মোতালেব হোসেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। তিলে তিলে বেতনের জমানো টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন। ডিবি পুলিশের হাতে আকস্মিক গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসছে মোতালেবের অর্থের উৎস।

২৬ নম্বর প্লটে বাড়িটির প্রতিটি ফ্লোরে দুটি করে ইউনিট করা হয়েছে। ইউনিটের মাঝে সিঁড়িসহ লিফটের স্পেস। নিচতলায় গ্যারেজের পাশে গাড়িচালক ও নিরাপত্তারক্ষীদের কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। রাখা হয়েছে কেয়ারটেকার। তবে মালিক গ্রেপ্তারের পর পরই ফ্লোরে ফ্লোরে পড়ে থাকা লাখ লাখ টাকার রড, টাইলস, ইট ফেলে কেয়ারটেকার উধাও।

স্থানীয় বাড়িওয়ালারা জানান, তিন কাঠা ওই ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে কমপক্ষে ১ কোটি টাকা। কাজ শেষ করতে আরও দেড় থেকে ২ কোটি টাকা লাগবে। নির্মাণ শেষে জমিসহ বাড়ির দাম হবে তিন থেকে ৪ কোটি টাকা। কিন্তু একজন নিম্নস্তরের কর্মকর্তার এত টাকার সম্পদ দেখে প্রতিবেশীরাও হতবাক।

মোতালেব হোসেনের পাশে ২৭ নম্বর বাড়ির মালিক টিভি উপস্থাপক ও একটি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাওলানা কারি আতাউল্লাহর। তার বাড়ি নির্মাণকাজের প্রায় ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কারি আতাউল্লাহ আমাদের সময়কে জানান, ৩ কাঠা জমিতে নির্মাণাধীন তার বাড়ি নির্মাণে ৯০ লাখ টাকা ব্যয় শেষ। আরও ব্যয়ের অঙ্ক রয়ে গেছে। একই জমি ও গঠনে নির্মাণ করা হয়েছে মোতালেব হোসেনের বাড়ি।

কারি আতাউল্লাহ বলেন, তিনিসহ কয়েকজন মিলে একই দাগে ১৫ কাঠা জমি কেনেন। এর মধ্যে তার এবং মোতালেব হোসেনের বাড়ির ৭ তলা ফাউন্ডেশন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুজন পাইলিংয়ের কাজ শুরু করেন। এর পর গত বছর রমজানের আগে প্রথমে বাড়ি নির্মাণকাজ শুরু করেন আতাউল্লাহ। তার ভবনের একতলা উঠে গেলে নির্মাণকাজ শুরু করেন মোতালেব হোসেন। মন্ত্রণালয়ে চাকরি করলেও সত্যিকার অর্থে মোতালেব হোসেনের পদবি কী ছিল, সেটা জানতেন না এ প্রতিবেশী ও পাইলিং-জমি ক্রয়ের অংশীদার।

প্রতিবেশী বাড়িওয়ালা, দোকানদাররা জানান, বেশিরভাগ সময় সিএনজি অটোরিকশায় করে আসতেন মোতালেব হোসেন। তবে মাঝে মধ্যেই সচিবালয়ের লোগো সাঁটানো সরকারি বিলাসবহুল গাড়িতে আসতেন তিনি। গাড়িচালকরা সম্বোধন করতেন স্যার স্যার বলে। নির্মাণকাজের অগ্রগতি দেখতে এলে স্ত্রী-ঘনিষ্ঠজন ছাড়া সঙ্গে কাউকে নিতেন না।

সূত্র জানায়, ১১/ই গ্রিনরোডের সরকারি সি-টাইপ কোয়ার্টারে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন মোতালেব হোসেন। হাজারীবাগ থানার বসিলায় নিজস্ব ওই বাড়ির দোতলায় ফার্নিশিংয়ের কাজ চলছে। কাজ শেষ হলেই আগামী দুই-এক মাস পর পরিবার নিয়ে ওঠার কথা ছিল তার।

সূত্র জানায়, বাড়ি নির্মাণের বাইরেও তার কোটি কোটি টাকা রয়েছে। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে এমপিওভুক্তি, বেসরকারি মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিসহ নানা ধরনের অনুমোদন, বদলি বাণিজ্যসহ নানাভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মোতালেব হোসেনের গ্রামের বাড়ি বরিশালের ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার আমতলীর হাওলাদার বাড়ি। বাবা মৃত দেলোয়ার হোসেন।

অন্যদিকে নুরুল ইসলাম নাহিদের উচ্চমান সহকারী নাসিরউদ্দিনের বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার হালসা বাজার গ্রামে। বাবা আবদুল জলিল। খিলক্ষেতের কনকর্ড লেকসিটির বহুতল ৬/বি/এ/৩ ভবনের ‘বৈকালী’ নামক তৃতীয় তলায় আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়াও রাজধানীর নতুন এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করেছেন। মোতালেব ছাড়াও শিক্ষা ভবন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুইজনের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরেছে, নিশ্চয়ই কোনো অভিযোগ আছে। সে অভিযোগ কোর্টে প্রমাণ হবে এবং শাস্তি হবে। সেই বিধান অনুসারে আমাদের যে সিস্টেম আছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে (গ্রেপ্তার) নিলে কিছু না কিছু কারণ আছে। দুর্নীতি হোক, অন্য যে কোনো ধরনের অপরাধ হতে পারে, অপরাধ আছে। যদি তারা কোনো ঘুষ নিয়ে থাকে, যে কোনো ধরনের অপরাধ করে থাকে, ব্যবস্থা সরকার নেবে। আইনি ব্যবস্থায় যা আছে তা-ই হবে। আর সেই সঙ্গে এই অপরাধে অপরাধী হলে অবশ্যই আমাদের এখান থেকে চাকরিবিধি অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।

পুলিশের হাতে আটক মোতালেব নিজের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হলেও এখন আর তাকে কোনো সহযোগিতা দেবে না বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, যা হওয়ার তা-ই হবে, আমরা এটা বরদাশত করব না। আমরা কখনো কোনো অন্যায়কারী, কোনো ঘুষ খাওয়া, দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, বেআইনি কাজ করা কোনো লোককে প্রশ্রয় দেব না; তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে