ভাষা আন্দোলনের চিন্তানায়করা

  শান্তা মারিয়া

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাষা আন্দোলন আমাদের গৌরবময় অর্জন। বাংলার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে শামিল হন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য নেতা, ছাত্রকর্মী ও জনগণের মিলিত অংশগ্রহণে এই আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছাত্রনেতা ও কর্মীরা এবং অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। তারা ছিলেন চিন্তানায়ক। তারা মাতৃভাষার অধিকার আদায় কেন প্রয়োজন, সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তোলেন। ভাষা আন্দোলনের এই চিন্তানায়কদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অধ্যাপক আবুল কাশেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ।

ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম যতই দানা বাঁধছিল ততই স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, সে প্রশ্নটিও উত্থাপিত হচ্ছিল। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম সুনিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, সে নিয়ে প-িতমহলে ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, হিন্দি যেমন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবে, তেমনি উর্দুকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।

এর দাঁতভাঙা জবাব দেন বাঙালি ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এটি বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতিবিরোধী এবং স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিরও পরিপন্থী। ১৯৪৭ সালের ৩ আগস্ট মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কমরেড পত্রিকায় ল্যাংগুয়েজ প্রবলেম নামে এক প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসেবে অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেন। তার এই প্রবন্ধটি ছাত্রজনতার মধ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়।

সে সময়ই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে।’ আরেকটি প্রবন্ধে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে বলেন, ‘ইহা জ্যামিতির স্বীকৃত বিষয়ের ন্যায় স্বতঃসিদ্ধ। উন্মাদ ব্যতীত কেহই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না।’ ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ও ছাত্রের উদ্যোগে তমুদ্দুন মজলিস নামে একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। এর আহ্বায়ক ছিলেন নূরুল হক ভুঁইয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম।

সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে তমুদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ এই পুস্তিকাটিতে শিক্ষার বাহন, অফিস, আদালত ও সরকারি কাজকর্মে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার দাবি তুলে ধরা হয়। তমুদ্দুন মজলিসের এই ছোট্ট বইটি ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অধ্যাপক আবুল কাশেম বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮। করাচি। পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনে ভাষাসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ওঠে। বলা হয়, গণপরিষদের অধিবেশনে পরিষদ সদস্যদের বক্তব্য রাখতে হবে উর্দু অথবা ইংরেজি ভাষায়। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। এ কণ্ঠস্বর বাঙালি রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের।

আইনজীবী, সমাজকর্মী ও রাজনীতিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বাংলার কৃতী সন্তান। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য তিনি ’৪৬-এর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদের সভায় তিনি পরিষদ সদস্যদের উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি শুধু প্রতিবাদ জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষই পূর্ব পাকিস্তানের, যাদের মাতৃভাষা বাংলা।’ তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা’ বা যোগাযোগের ভাষা বলে ঘোষণার জন্যও বলিষ্ঠ যুক্তি উপস্থাপন করেন।

১৯৫১ সালের ১৬ ও ১৭ মার্চ কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেন, একটি জাতির সাংস্কৃতিক জীবনের মূল প্রেরণা তার মাতৃভাষা। যদি মাতৃভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দু বা অন্য কোনো ভাষা পূর্ব বাংলার ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে তা হবে গণহত্যার শামিল। বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য যে কোনো ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হলে তিনি এবং পূর্ব বাংলার শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ বিদ্রোহ করবে।

ড. কাজী মোতাহার হোসেন বাংলা ভাষার পক্ষে দৃঢ়ভাবে তার অবস্থান ঘোষণা করেন। তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য অধ্যাপকরা এবং সারা দেশের শিক্ষক-সাংবাদিকসহ বুদ্ধিজীবীরা ভাষা আন্দোলনের চিন্তাসমরে সর্বশক্তি দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সোচ্চার হন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে