পরম শ্রদ্ধার শহীদ মিনার

  শান্তা মারিয়া

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদ মিনার আমাদের একুশের ভাষাশহীদদের প্রতি জাতির আন্তরিক শ্রদ্ধার প্রতীক। পাকিস্তান আমলে বারে বারে আঘাত এসেছে এই শহীদ মিনারের ওপর। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চরম আক্রোশে ধ্বংস করে ফেলে শহীদ মিনার। কিন্তু মিনারের কাঠামো ধ্বংস করলেও একুশের চেতনাকে তারা ধ্বংস করতে পারেনি। তাই তো স্বাধীন বাংলাদেশে পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ভালোবাসার শহীদ মিনার।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং শহীদদের স্মৃতিতে ২৩ ফেব্রুয়ারিতেই প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের বেলায় প্রতিবাদী ছাত্ররাই এ শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র হোস্টেলের প্রাঙ্গণে শহীদদের রক্তভেজা জায়গায় এক রাতের মধ্যে এই শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। ইট-সিমেন্টের গাঁথুনির জন্য পুরান ঢাকা থেকে একজন রাজমিস্ত্রিকে নিয়ে আসা হয়। বর্তমান শহীদ মিনারের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট প্রশস্ত ভিত্তির ওপর নির্মিত হয় শহীদ মিনার। এর নকশা করেছিলেন ভাষাসৈনিক সাইদ হায়দার ও বদরুল আলম। এর গায়ে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ লেখা একটি ফলক লাগিয়ে দেওয়া হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। শহীদ মিনার জনতার বিপ্লবের প্রতীকে পরিণত হয়। ২৬ তারিখ বিকালে পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। তবে সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছোট ছোট প্রতীকী শহীদ মিনার গড়া হতে থাকে।

১৯৫৩ সাল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবস পালন শুরু হয়। ভেঙে ফেলা শহীদ মিনারের জায়গায় কাগজের প্রতীকী শহীদ মিনার স্থাপন করে তার বেদিতে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া শুরু হয়।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার শহীদ মিনার নির্মাণের ঘোষণা দিলেও দ্রুত সরকার পতনের ফলে সে কাজটি শুরু করতে পারেনি। ১৯৫৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পূর্ববঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মওলানা ভাসানী এবং ভাষাশহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম এই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

শহীদ মিনারের নকশা করেন শিল্পী হামিদুর রহমান এবং তার সহকারী নভেরা আহমেদ। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার আমলে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। শিল্পীদের মূল পরিকল্পনায় ছিল শহীদ মিনার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। সেখানে মিনারের গায়ে হলুদ ও নীল কাচের অসংখ্য চোখের প্রতীক খোদাই করা থাকবে, মিনার স্থাপত্যের সামনে বাংলা বর্ণমালায় গাঁথা রেলিং এবং পাশে চোখের আকৃতির ঝরনা থাকার কথা ছিল। মিনার চত্বরে থাকবে রক্তমাখা পায়ের ও কালো রঙের পায়ের ছাপ। কমপ্লেক্সে ম্যুরাল, জাদুঘর ও পাঠাগার স্থাপনের কথাও ছিল। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ অবধারিতভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬২ সালে মূল নকশার পরিবর্তে একটি সংক্ষিপ্ত নকশার ভিত্তিতে মিনারের কাজ তড়িঘড়ি করে সমাপ্ত করা হয়। ১৯৬৩ সালে উদ্বোধন করা হয় শহীদ মিনার। শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম এটি উদ্বোধন করেন।

১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলার জনগণের ওপর হিংস্র আক্রমণ চালায়। তাদের সেই বর্বর আক্রমণ থেকে রেহাই পায় না বাঙালির চেতনার প্রতীক শহীদ মিনারও। পাকিস্তানি সৈন্যরা শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। তারা সেখানে লিখে রাখে মসজিদ কথাটি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আবার শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৩ সালের সংক্ষিপ্ত নকশার ভিত্তিতেই স্থাপনাটি সম্পন্ন করা হয়। ১৯৮৩ সালে শহীদ মিনারের চত্বর বাড়িয়ে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়।

শহীদ মিনার আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা এবং ভাষাশহীদদের অমর স্মৃতির প্রতীক। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সারাদেশে ছড়িয়ে আছে শহীদ মিনারের অসংখ্য প্রতীকী স্থাপনা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে