খালেদা-তারেকবিহীন বিএনপি চায় আ.লীগ

  আলী আসিফ শাওন

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি মামলায় এখন কারাগারে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আলোচনায় ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে দলটির ভাঙন। বিএনপি অখ- থাকবে কিনা তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ায়। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, দুর্নীতিবাজমুক্ত দল গড়তে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাদ দেওয়া উচিত। পরিচ্ছন্ন ইমেজের কাউকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করা উচিত দলটির। ক্ষমতাসীন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে এমনটি জানা গেছে।

দলটির নেতাদের মতে, খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের কৃতকর্মের জন্যই বিএনপিতে ভাঙন দেখা দেবে। দলটির শীর্ষনেত্রী জেলে যাওয়ার পর নেতাকর্মীদের মনোবলে চিড় ধরেছে। বিশেষ করে, নৈতিক দৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়ছেন বিএনপির নেতাকর্মী। কারণ খালেদা জিয়া রাজনৈতিক মামলায় নয়, দুর্নীতির মামলায় কারাগারে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা মনে করেন, খুব শিগগিরই বিএনপির মধ্যে যারা পরিচ্ছন্ন রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতি অনুরাগ থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন; তাদের মোহ কেটে যাবে এবং অনেকেই হয়তো বেরিয়ে যাবেন দলটির রাজনৈতিক বলয় থেকে। বিএনপির এমন ভাবনাসিদ্ধ অংশটি গণতান্ত্রিক ধারায় আগ্রহী এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রভাবশালী এক নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বিএনপি এমন একজন লোককে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বানাল, দলের মধ্যেই যার গ্রহণযোগ্যতা নেই। বিএনপির সিনিয়র নেতারাও তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, জমিরউদ্দিন সরকার কিংবা তার মতো সিনিয়র কোনো রাজনীতিবিদকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করলেও খালেদা জিয়া এতটা সমালোচিত হতেন না। তারেক রহমান শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দুর্নীতিবাজ ও সমালোচিত রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম অনেক দেশই তারেকের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তারা বোধ করি তারেকের নেতৃত্ব ভালো চোখে দেখছেন না।

সরকারি দলের নেতারা বলছেন, দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছর সশ্রম কারাদ-ে দ-িত খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তার জামিনের চেষ্টায় আছেন। কিন্তু তার নামে এখনো অনেক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার অপেক্ষায়; বিচারাধীন আরও কয়েকটি মামলা। এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার জামিন আইনগতভাবে কঠিনই বটে। এদিকে খালেদা জিয়ার জামিন-প্রক্রিয়ায় যত বেশি সময় লাগবে, বিএনপিতে ভাঙনের গতি তত তীব্র হবে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে দলটির যে অবস্থান এখনো রয়েছে; তা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের আগে বিএনপিতে খ-ন নিশ্চিত হয়ে যাবে। দলটির অনেক নেতাই বিএনপি থেকে বেরিয়ে এসে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।

বিএনপি ‘পাওয়ার পলিটিক্সের’ দল। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এবার আর নির্বাচনের বাইরে থাকতে চাইবেন বলে মনে করেন না আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা। খালেদা-তারেক না চাইলেও বিএনপির অনেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ইতোমধ্যে সারা দেশে বিএনপির প্রার্থীরা একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ আমাদের সময়কে গতকাল এ প্রসঙ্গে বলেন, বিএনপি ভাঙবে, কি ভাঙবে না, সেটা পরের বিষয়। এটুকু বলতে পারি, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে দলটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।

আওয়ামী লীগের আরেক সিনিয়র নেতা, সভাপতিম-লীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, বিএনপির নেতৃস্থানীয় অনেকেই তারেক রহমানকে অপছন্দ করেন। খালেদা জিয়ার জামিন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে বিএনপিতে ভাঙন দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক।

বিএনপির ভাঙনবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপিতে ভাঙনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রয়োজন নেই। এজন্য দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানই যথেষ্ট। বিএনপি ভাঙার জন্য দলটিই দায়ী হবে। আওয়ামী লীগ দলটির সংকট ঘনীভূত করবে না।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ গতকাল রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিএনপি নেতৃবৃন্দের কাছে আমার অনুরোধ, যারা মাঠে নেমে এখনো আন্দোলন করছেন, আপনারা আপনাদের এই দুর্নীতিবাজ নেতাদের পরিহার করুন। যদি আপনারা দেশের জনগণের জন্য রাজনীতি করতে চান, তা হলে দলে পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতৃত্ব নিয়ে আসুন। তবেই দেশের জনগণের আস্থা আসতে পারে।

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে হানিফ বলেন, এ ধরনের একটি রাজনৈতিক দল, যার শীর্ষনেতৃত্ব দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার থাকতে পারে না।

বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হানিফ প্রশ্ন রাখেন, কোন লজ্জায় আপনারা একজন দুর্নীতিবাজ নেত্রীর জন্য মানববন্ধন করেন? আপনারা রাজনীতি করেন বলে কি নীতি-নৈতিকতা কিছুই নেই?

বিএনপিতে ভাঙনের বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, বিএনপির গঠনতন্ত্র যে দিন সংশোধন হয়েছে, সেদিন থেকে দলটিতে ভাঙনের সুর আমরা শুনতে পাচ্ছি। বিএনপি ভাঙা এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চেষ্টা নেই, চেষ্টার প্রয়োজনও নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কবে বিএনপি ভাঙবে? এটাই এখন দেখার বিষয়।

খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার অব্যবহিত আগে দলের গঠনতন্ত্রে সংশোধনী এনে ৭ (ঘ) ধারা বাদ দেয় বিএনপি। গঠনতন্ত্রের ৭ (ঘ) নম্বর ধারায় ছিলÑ ‘সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত কোনো ব্যক্তি দলের যে কোনো পর্যায়ের কমিটির সদস্য বা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতেই দলের গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনা হয়েছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনার সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সংশোধনী এনে দুর্নীতিবাজদের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দুর্নীতিবাজদের আখড়া বিএনপি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে