লাখ টাকার পণ্য কিনে কোটি টাকা লোপাট

  দুলাল হোসেন ও আসাদুর রহমান

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফি বা ইসিজির একসেট ক্লামের বাজারমূল্য ৬৯০ টাকা। অথচ তা কেনা হয়েছে ২৯ হাজার ৮৭৫ টাকায়, যা ২৯ হাজার ১৮৫ টাকাই বেশি। সেই হিসাবে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪০ টাকার মোট ৪১৬ সেট ক্লাম কিনতে নেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এতে সরকারের ক্ষতি হয় ১ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার ৯৬০ টাকা। আর একেই বলে পুকুরচুরি! ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের এ অনিয়ম জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপিত মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু ঢামেক হাসপাতালেই নয়, দেশের আরও কয়েকটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য ক্রয়, বাজারমূল্য থেকে অধিক দামে পণ্য কেনা, ঠিকাদারের কাছ থেকে ভ্যাট না কাটা ও যন্ত্রপাতি মেরামত না করেই বিলের নামে টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ এসেছে।

২০১৭ সালের নভেম্বরের শুরুর দিকে দশম জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির কাছে প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়। এতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিএমএসডিসহ কয়েকটি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২৬ কোটি ২৪ লাখ ৩৪ হাজার ৬০৭ টাকা ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। এর পরই ২১ নভেম্বর স্থায়ী কমিটির ৭৩তম বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঢামেকে এক্সরে ফিল্ম কেনা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ১ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ টাকা অপচয়ের ঘটনায় যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে তদন্তপূর্বক ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় বৈঠকে। সেই সঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে লোপাটের অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

বেশি এক্সরে ফিল্ম কেনায় সোয়া কোটি ক্ষতি : ঢামেক হাসপাতালে ২০০৭-০৮ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেসব এক্সরে ফিল্ম কেনা হয়, ২০১০ সালের ডিসেম্বরেই ১২ লাখ ৬০ হাজার ৪০০ টাকার পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ও ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায় আরও ১ কোটি সাড়ে ১০ লাখ টাকার এক্সরে ফিল্ম। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কেনার কারণেই সরকারের ১ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ টাকা ক্ষতি হয়।

ভ্যাট না কাটায় ক্ষতি ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা : ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশের সরকারি ছয়টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ও স্থাপনকারীর বিল থেকে ভ্যাট কাটা হয়নি। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয় ২ কোটি ১৫ লাখ ৩৮ হাজার ১৭৭ টাকা। এর মধ্যে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১ কোটি ২৭ হাজার ২২৯, সিলেট এমএজি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২ লাখ ৭৮ হাজার ১৫, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৪৮৭, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৪৫ লাখ ৬৯ হাজার ২২৮, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২৩ লাখ ১২ হাজার ৬৭২, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২৯ লাখ ১ হাজার ৫৪৫ টাকা রয়েছে। অডিট আপত্তির পর চারটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিলেও রংপুর ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ তা করেনি।

যন্ত্রপাতি মেরামতের নামে সোয়া কোটি টাকা লোপাট : ২০০৯-১০ অর্থবছরে ঢামেক হাসপাতালে কোনো ইনফ্যান্ট ইনকিউবেটর মেশিন মেরামত করা হয়নি। অথচ ৯৪টি মেশিন মেরামত দেখিয়ে চারটি বিলের মাধ্যমে ১৯ লাখ ৯০ হাজার ২৬০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সিটিস্ক্যান মেশিনে যন্ত্রপাতি সংযোজন না করেই নেওয়া হয় ২৬ লাখ সাড়ে ৭২ হাজার টাকা। অটোক্লেভ মেশিনের যন্ত্রাংশ সংযোজনসহ মেরামত বিলের নামে ৯ লাখ ৬০ হাজার ৪৮০ টাকাসহ ৫৬ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ টাকা আত্মসাৎ করা হয় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে। অর্থাৎ ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হাসপাতালটিতে যন্ত্রপাতি মেরামত না করে ইন্টারনেট অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) খাতে এবং অব্যবহৃত এক্সরে ফিল্ম স্টক লেজারে কম দেখিয়ে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দরপত্র ছাড়াই ১৮ কোটি টাকার পণ্য ক্রয় : ২০০৭-০৮ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে বিধি অমান্য করে দরপত্র ছাড়াই ঢামেক, রংপুর ও দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এমএসআর সামগ্রী কেনা হয়। কোটেশনের মাধ্যমে কেনা এসব পণ্য বাবদ ব্যয় হয় ১৭ কোটি ৮৯ লাখ ৬৩ হাজার ৫৯৫ টাকা।

হেপারিন ক্রয়ে কোটি টাকা লোপাট : ঢামেক হাসপাতালে ২০০৭-০৮ ও ২০০৯-১০ সালে ৩১টি কার্যাদেশের মাধ্যমে ৭ হাজার ৪০৯টি হেপারিন ইনজেকশন কেনা হয়। প্রতিটি ইনজেকশনের বাজারমূল্য ৩৫০ টাকা হলেও ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ২ হাজার ৯০ টাকা করে। ফলে বাজারমূল্য থেকে ১ হাজার ৭৪০ টাকা বেশি দিয়ে কেনায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৯১ হাজার ৬৬০ টাকা।

ভ্যাকসিন কিনে কোটি টাকা ক্ষতি : কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে ২০০৭-০৮ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে বিকল্প শর্তপূরণ সত্ত্বেও অনিয়মের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাকে নন-রেসপনসিভ করে হজযাত্রীদের জন্য ৮০ হাজার ৫০০ ডোজ মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন কেনায় সরকারের ১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার ৬৭০ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ২০০৭-০৮ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বাজারমূল্য থেকে উচ্চমূল্যে ইউরিন প্লাস্টিক কনটেইনার কেনায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
close