অরফানেজ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ

খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী

  রহমান জাহিদ

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০১:৩৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

আর্থিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক গতিকে ব্যাহত করে এবং এর বাজে প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রমিত হয়। তাই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাতের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ৬ আসামিই রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের দুর্নীতির মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এমনই অভিমত দিয়েছেন।
এখন রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করবেন খালেদা জিয়া। এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, চলতি সপ্তাহেই হাইকোর্টে আপিল করা হবে। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া জানিয়েছেন, আপিলের প্রস্তুতি চলছে। আশা করছি মঙ্গলবারই (আজ) আপিল করতে পারব।
এর আগে গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে রায়ের অনুলিপি সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়ার কাছে হস্তান্তর করেন পেশকার মো. মোকাররম হোসেন। এদিন দুর্নীতি দমন কমিশনকেও রায়ের অনুলিপি দেন আদালত। কমিশনের পক্ষে মোশারফ হোসেন কাজল অনুলিপি নেন।
অনুলিপি গ্রহণের পর এক প্রশ্নে কাজল বলেন, কমিশন আপিল করবে কিনাÑ এ সম্পর্কে এখনো আমাদের কিছু বলা হয়নি। রায়ের অনুলিপি কমিশনকে দেব। এরপর তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেভাবে অগ্রসর হব।
এর আগে ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামান ৮ ফেব্রুয়ারি রায় দেন। রায়ে খালেদা জিয়ার ৫ বছর সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়। এ ছাড়া অন্য আসামিদের দেওয়া হয় ১০ বছর সশ্রম কারাদ-। রায় ঘোষণার দিনই খালেদা জিয়ার পক্ষে রায়ের অনুলিপি চেয়ে আবেদন করা হয়। সোমবার রায়ের অনুলিপি দিলেন আদালত।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এই মামলার আসামিগণকর্তৃক যোগসাজশে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩/৮০ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। পরিমাণের দিক থেকে তার বর্তমান বাজারমূল্য অধিক না হলেও তর্কিত ঘটনার সময়ে ওই টাকার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। আসামিদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া ওই সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আসামি কাজী সলিমুল হক কামাল সংসদ সদস্য ছিলেন। আসামি কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী সরকারি কর্মচারী হয়েও আসামি খালেদা জিয়াকে সরকারি এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব খুলতে সহায়তা এবং পরবর্তী সময়ে ওই হিসাব থেকে ২টি প্রাইভেট ট্রাস্টের অনুকূলে সরকারি অর্থের চেক বেআইনিভাবে দেওয়া বর্ণিত ২ আসামিকে অপরাধ করতে সহায়তার শামিল। আসামি তারেক রহমান, মমিনুর রহমান ও শরফুদ্দিন আহমেদ কৌশল অবলম্বন করে সরকারি তহবিলের টাকা একে অপরের সহযোগিতায় আত্মসাৎ করতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে এই মামলার ৬ আসামির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন মর্মে অত্র আদালত মনে করেন।
দুই ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলেও একটি ধারায় দ- প্রদান সম্পর্কে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে খালেদা জিয়া ও ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী মিনস রিয়ো নিয়ে সরকারি এতিম তহবিলের টাকা দুই ভাগে ভাগ করে দুটি ট্রাস্টের অনুকূলে হস্তান্তর করেন, যার মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট অন্যতম। ওই ট্রাস্টে ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা স্থানান্তরের পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর সেখানে জমা হয়। আসামি তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান ট্রাস্টের নামীয় এসটিডি ৭ নং হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে প্রথমে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ২ দশমিক ৭৯ একর জমি কেনেন। অবশিষ্ট টাকা প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তর করেন। তৎপরবর্তী সময়ে কাজী সালিমুল হক কামাল ও গিয়াস উদ্দিনের হাত হয়ে আসামি শরফুদ্দিনের হাতে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা চলে যায় এবং তা আত্মসাৎ করা হয়। এগুলো সবই আসামিদের মিনস রিয়ো ইঙ্গিত করে। ফলে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (১) ধারায় বর্ণিত ক্রিমিনাল মিসকনডাক্টের উপাদান যেমন এই মামলায় উপস্থিত আছে, ঠিক তেমনি আসামিদের মিনস রিয়োসহ রংফুল গেইনের উদ্দেশ্য বর্ণিত পরিমাণ টাকা বিভিন্ন পন্থায় রূপান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন মর্মেও আদালত মনে করেন। খালেদা জিয়া এ মামলায় আত্মপক্ষ শুনানিতে বক্তব্য প্রদানের সময় নিজ জবানীতে স্বীকার করেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে দ-বিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় তাকে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই। আদালত মনে করেন, আসামিরা একে অপরের সহায়তায় যেভাবে টাকা আত্মসাৎ করেন তার একটি প্রিসামটিভ ভ্যালু রয়েছে এবং যা এই মামলা নিষ্পত্তির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
আরও বলা হয়, আসামিদের মধ্যে একজন ব্যতীত অপর সবাই সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করেন। দ-বিধির ৪০৯ ধারার বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই ধারায় সংঘটিত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- বা যে কোনো বর্ণনার কারাদ-, যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং অর্থদ-ে দ-নীয় হওয়ার বিষয়েও বিধান রয়েছে। প্রসিকিউশনপক্ষ থেকে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় আসামি খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মমিনুর রহমান, কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে কাজী কামাল এবং ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী উভয় আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। তবে ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৬ ধারার বিধান বিবেচনায় গ্রহণ করে পূর্বে বর্ণিত ৫ আসামিকে যে কোনো একটি আইনে দ-িত করে আদেশ প্রচার করা বিধেয় হবে বলে আদালত মনে করেন।
সব আসামি সরকারি কর্মচারী এবং মার্চেন্ট কীভাবে হলোÑ এ সম্পর্কে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দ-বিধির ৪০৯ ধারার বিধান পর্যালোচনায় লক্ষ করা যায়, এই ধারায় কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করতে হলে তাকে সরকারি কর্রচারী, ব্যাংকার, মার্চেন্ট বা এজেন্ট হতে হবে। আগেই দেখা গেছে, এই মামলায় আসামি খালেদা জিয়া এবং কাজী সালিমুল হক ওরফে কাজী কামাল ঘটনার সময় জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। জাতীয় সংসদ সদস্য বিদ্যমান আইন অনুসারে সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য। আলোচনায় দেখা গেছে, আসামি তারেক রহমান এবং মমিনুর রহমান প্রাইভেট ট্রাস্ট এবং ট্রাস্টি হলেও বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট, আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুসারে ট্রাস্টিগণ সরকারি কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হন। আসামি শরফুদ্দীন আহমেদ মার্চেন্ট বা এজেন্ট হিসেবে গণ্য হন। ফলে তাদের সবার বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯ ধারার বিধান প্রয়োগযোগ্য হবে বলে এই আদালত মনে করেন। সরকারি এতিম তহবিলে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাতের আসামিদের একে অপরের সহায়তা করায় দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক সবাই শাস্তি পাওয়ার যোগ্য মর্মে এই আদালত মনে করেন। আসামি শরফুদ্দীন আহমেদ ব্যতীত সব আসামি সরকারি কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা প্রয়োগযোগ্য বলেও এই আদালত মনে করেন। আসামি শরফুদ্দীন আহমেদের ক্ষেত্রে ঐ আইনের ৫(২) ধারা প্রয়োগযোগ্য না হলেও দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারা প্রয়োগযোগ্য হবে। ফলে এই আসামি ছাড়া অপর আসামিদের ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে ৫(১) ধারায় বর্ণিত সকল শর্তাবলী প্রযোজ্য হবে বলে এই আদালত মনে করেন। যুক্তিতর্ক শুনানির সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী মওদুদ আহমদ বর্ণনা করেনÑ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(১) ধারায় বর্ণিত ৫টি শর্ত ঐ আসমির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে তিনি তার আলোচনার এক পর্যায়ে বলেন, তর্কের খাতিরে হলেও ঐ আইনের ৫(১) (ডি) ধারায় বিধান প্রয়োগ করতে চাইলে উহার শর্তাবলী প্রসিকিউশন পক্ষের আসামি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে; কিন্তু বিজ্ঞ কৌঁসুলি ওই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন বলা যায়। কেননা উক্ত ধারায় আইনের ৫(১)(ডি) ধারার বিধান এই মামলায় প্রয়োগ করা যায়।
রায়ে ৫ ও ১০ বছর দ- প্রদানের বিষয়ে বলা হয়, দ-বিধির ৪০৯ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন অথবা যে কোনো বর্ণনার কারাদ-, যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। আসামিগণ একে অপরের সহযোগিতায় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন এবং সে কারণে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। তবে আসামিদের বয়স ও সামাজিক অবস্থা এবং আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ বিবেচনায় গ্রহণ করে তাদের যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া সমীচীন হবে না মর্মে অত্র আদালত মনে করেন। আসামিদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া এদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। তা ছাড়া তিনি একটি রাজনৈতিক দলের কর্ণধার। তিনি একজন বয়স্ক মহিলা। ফলে তার শরীরিক অবস্থা, বয়স এবং সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করে দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারায় তাঁর ৫ বছর সশ্রম কারাদ- দেওয়া সমীচীন বলে মনে হয়। বাকি ৫ আসামিকে তাদের বয়স ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া উচিত মর্মে এই আদালত মনে করেন। দ-বিধির ৪০৯ ধারায় আসামিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সশ্রম বা বিনাশ্রম দ- স্পষ্ট উল্লেখ নেই। সেখানে শুধু দ-ের কথা উল্লেখ আছে। এমতাবস্থায় আইনের ব্যাখার সূত্র অনুসারে সকল আসামিকে সশ্রম কারাদ- প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদের জরিমানা দ-েও দ-িত করা প্রয়োজন। তবে যে টাকা আত্মসাৎ করেছেন, তা জরিমানা দ- হিসেবে বিবেচিত হবে।
রায়ের আদেশে সকল আসামির দ-ের পাশাপাশি ২ কোটি, ১০ লাখ, ৭১ হাজার, ৬৪৩/৮০ টাকা অর্থদ-ের পাশাপাশি উক্ত অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, যা ৬০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রের অনুকূলে আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামীয় সোনালী ব্যাংক, গুলশান নিউ সার্কেল শাখায় রক্ষিত এসটিডি-৭ নং হিসাবে জমাকৃত সাকুল্য টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।    
আত্মসাৎকৃত টাকা দিয়ে ট্রাস্টের নামে জমি ক্রয় সংক্রান্তে আসামি পক্ষের দাবি বিষয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসামি শরফুদ্দিনের কাছ থেকে ট্রাস্টের নামে ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ জমি কেনার বায়না করার দাবি করেন আসামিপক্ষ। আসামি শরফুদ্দিন ওই জমির মালিক মর্মেও দাবি করা হয়। কিন্তু আশুলিয়া মৌজার ওই জমির কোনো দলিল আদালতে দাখিল করতে পারেননি। ফলে ধরে নেওয়া যায়, আসামি শরফুদ্দিন আদৌ ৭৪ দশমিক ৫ শতক জমির মালিক ছিলেন না। ওই জমি ক্রয়ের জন্য জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সঙ্গে কোনোদিন কোনো বায়না চুক্তিও হয়নি। আসামি শরফুদ্দিন মানি মামলায় মিথ্যা সোলেনামা দাখিল করে সরকারি এতিম তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ করার প্রক্রিয়া মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
আরও বলা হয়, আসামি শরফুদ্দিনের কাছ থেকে বায়নার টাকা আদায়ের মানি মামলাটি একটি সৃজিত মামলা বলে অত্র আদালত মনে করেন এবং উহা অত্যন্ত কৌশলে আইনজীবী এমএম মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে দাখিল করেন। সত্যিকার অর্থেই যদি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং আসামি শরফুদ্দিনের মধ্যে জমি কেনাবেচার বয়না চুক্তি সম্পাদিত হতো এবং চুক্তির মেয়াদের মধ্যে আসামি শরফুদ্দিন যদি বায়নার টাকাসহ জমির সাকুল্য মূল্য গ্রহণ করে দলিল সম্পাদন করে দিতে ব্যর্থ হয় তবে সে ক্ষেত্রে ট্রাস্টের পক্ষে আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকনের উচিত ছিল সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে মামলা করা। কিন্তু তিনি তা দায়ের না করায় এটা ধরে নেওয়া যায় যে, তারা প্রকৃতপক্ষে জমির কোনো কেনাবেচার চুক্তি আসামি শরফুদ্দিনের সঙ্গে সম্পাদন করেননি। তাই মানি মামলাটি একটি দুরভিসন্ধিমূলক মর্মে ধরে নেওয়া যায়।
রায়ে বলা হয়, আসামিপক্ষ দাবি করে, ক্রিমিনাল বিচ অব ট্রাস্টের ক্ষেত্রে ক্রিমিনাল মিসএপ্রোপ্রিয়েশন অব প্রপারটি এবং ইনট্রাস্টমেন্ট প্রমাণ করতে হয় কিন্তু এই মামলায় উক্ত উপাদানের কোনোটিই নাই। কিন্তু নথি পর্যালোচনা করে অত্র আদালত মনে করে, ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে ১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলারের ডিডি নিজ দলে নেওয়ার মাধ্যমে এর ওপর আসামি খালেদা জিয়ার ডমিনিয়ন চলে আসে এবং পরে ওই টাকা হিসাবে জমা রাখা এবং আরও পরে উহা এফডিআর করে রাখার ফলে ওই টাকার উপর তাঁর ইনট্রাস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত টাকা যখন দুই ভাগ করে তিনি তাঁর সচিব ড. কামাল সিদ্দিকীর মাধ্যমে বে-সরকারি দুইটি ট্রাস্টের অনুকূলে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রদান করলেন তখন তিনি ক্রিমিনাল মিসএপ্রোপ্রিয়েশন অব প্রপারটি এর অপরাধে জড়িয়ে পড়েন মর্মে অত্র আদালত মনে করেন। কেননা সরকারি এতিম তহবিলের টাকা দেশে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানায় বসবাস কিংবা সরকারি অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানায় অবস্থান করা এতিমদের জন্য খরচ করা উচিত ছিল। কিন্তু আসামি বেগম খালেদা জিয়া তা করতে ব্যর্থ হন।
রায়ে আরও বলা হয়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে কোনো এতিমখানার অস্তিত্ব আজ অবধি পাওয়া যায়নি। সেখানে কোনো এতিম বসবাস করে না। এতিমখানার দালান কোঠা বা স্থাপনা নেই। ৬, মইনুল রোড, ঢাকা সেনানিবাস কিংবা বগুড়া জেলার গাবতলী দাড়াইল মৌজায় ওই ট্রাস্টের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই দিনে অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ১৭টি দলিলের মাধ্যমে ওই ট্রাস্টের নামে ক্রয়কৃত ২ দশমিক ৭৯ একর জমি আজ অবধি ধানি জমি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই আসামি খালেদা জিয়া আইন ভঙ্গ করেন নাই মর্মে আসামিপক্ষের যুক্তি সঠিক নয়। আসামিপক্ষ থেকে দাবি করেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৬ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে হয়েছে। টাকা খরচ করা হয় নাই। উহার বহু গুণে বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রিমিনাল মিসএপ্রোপ্রিয়েশন অব প্রপারটি হয়নি। কিন্তু আসামিপক্ষের উক্ত যুক্তি আইনের মাপকাঠিতে টেকে না। কেননা সরকারি অর্থ অনির্ধারিত সময় ধরে খরচ না করে আটক রাখা দ-বিধির ৪০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।   

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে