অর্থদণ্ড স্থগিত

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:৫৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সাজা বাতিল চেয়ে খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে খালেদা জিয়াকে দেওয়া অর্থদদণ্ডের আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের বেঞ্চ খালেদা জিয়ার আবেদনের শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন।

আদেশে আদালত বলেছেন, ‘আমরা আপিলটি শুনব। মামলার নথি তলব করা হলো। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থদ- স্থগিত করা হলো। একই সঙ্গে আদেশের কপি হাতে পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে মামলার যাবতীয় নথি হাইকোর্টে পাঠাতে বিচারিক আদালতের বিচারকের প্রতি আদেশ দেওয়া হলো।’

আপিল শুনানির জন্য গ্রহণের পর খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদনটি উত্থাপন করেন তার আইনজীবীরা। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী রবিবার শুনানির জন্য রাখা হয়। ওই দিন বেলা দুইটায় জামিন আবেদনের শুনানি করা হবে বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট।

গতকাল শুনানির শুরুতে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন দাঁড়িয়ে বলেন, আমাদের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা উপস্থিত রয়েছেন। তবে আপিলটি শুনানি করবেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী। এ পর্যায়ে এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডম্যান্ট অ্যাক্ট ১০ (১) ধারায় আপিলটি করা হয়েছে। এ ধারা অনুযায়ী অটোমেটিক্যালি আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ হয়ে যায়। এটা একটা প্রথা। আমি আপিল শুনানির জন্য গ্রহণের আবেদন করছি। আপিল গ্রহণ হলে জামিন আবেদন দাখিল করা হবে। ৪০৯ ধারায় আপিলকারীকে সাজা দিয়েছে ওই আদালত।

এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আপিল গ্রহণের আবেদনে অন্য কোনো প্রেয়ার (আবেদন/প্রার্থনা) আছে, না শুধুই আপিল অ্যাডমিশন (শুনানির জন্য গ্রহণ) চেয়েছেন? অ্যাডমিশনের পর আর কী প্রেয়ার আছে? এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, একটা আপিল অ্যাডমিশনের আবেদনে নরমালি যা যা থাকে আমরা তাই চেয়েছি। নথি দেখে আদালত বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সেনটেন্স (দ-) স্থগিতের বিধান আছে। কনভিকশন (দোষী সাব্যস্ত) কি স্থগিত করা যায়? ক্রিমিনাল অ্যাক্ট ল অ্যামেন্ডম্যান্ড অ্যাক্টে কনভিকশন স্থগিতের বিধান নাই। আপনারা তো কনভিকশনও স্থগিত চেয়েছেন।

এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, এটা সেনটেন্সই হবে। এটা ঠিক করে দেব। তা ছাড়া আমরা সেনটেন্স বা কনভিকশন স্থগিতের ওপর তত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না। আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। এর পর আদালত আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে আদেশ দেন।

এর পর খালেদার জামিনের আবেদন উত্থাপন করে আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, ১৫ দিন ধরে তিনি কাস্টডিতে আছেন। যেহেতু তাকে শর্ট সেনটেন্স (কম সাজা) দেওয়া হয়েছে, সে জন্য আমরা তার জামিন চাচ্ছি। বয়স, সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় তিনি জামিন পাওয়ার হকদার। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ইতোমধ্যে আদালত আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন। আজকে (বৃহস্পতিবার) সকালে আমরা জামিন আবেদন পেয়েছি। রেকর্ড আসার পরই বিষয়টি কার্যতালিকায় এনে শুনানি করা হোক।

এ সময় আদালত বলেন, আপিলকারীর সাজা তো কম। আদালতের প্রথা আছেÑ সাজা কম হলে জামিন দেওয়ার। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মামলার নথি আসুক, শুনানি করতে চাই। এ মামলায় মেরিট আছে। এ কারণে এটা আমরা কার্যতালিকায় এনে শুনানি করতে চাই।

এ সময় দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, আমরা আপিল গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে শুনানি করতে পারি নাই। আদালত বলেন, যখন শুনানির প্রয়োজন তখনই আপনাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পর দুদক আইনের ৩৩ (৫) ধারা দেখিয়ে খুরশীদ আলম বলেন, এ ধরনের বিশেষ আইনের মামলার ক্ষেত্রে দুদককে যুক্তিসঙ্গত সময় দিয়ে জামিন আবেদনের শুনানি করতে হবে। আমরা আজ ৯টা ৩১ মিনিটে জামিনের আবেদনের কপি পেয়েছি। আদালত বলেন, তারা তো অন মেরিট জামিন চাচ্ছে না। পুরো রেকের্ডের কি দরকার আছে শুনানির সময়?

খুরশীদ আলম বলেন, ফৌজেদারি আইন ব্যবস্থায় নারী বলে আদালত জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু দুদক আইনে সে সুযোগ নেই। জামিনের আবেদন অনেক বড়, গ্রউন্ডও অনেক। এ সময় আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি (হেসে) বলেন, এ কারণেই তো টকশোতে আপনি অনেক আলোচনার সুযোগ পেয়েছেন।

খুরশীদ আলম বলেন, আমরা চাচ্ছি কার্যতালিকায় এনে শুনানি করা হোক। এজে মোহাম্মদ আলী এ সময় বলেন, সাধারণত কম সাজা হলে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করলে জামিন দিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় আদালত বলেন, আপিল বিভাগের অনেক আদেশ আছে কম সাজা হলে জামিন দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো বিশেষ আইন প্রণয়নের আগে। যেহেতু দুদক আইনে আছে তাদের যুক্তিসঙ্গত সময় দেওয়ার, তাই আমরা রবিবার দুপুর ২টায় শুনানির জন্য রাখলাম।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করে। রায়ে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করে দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারায় পাঁচ বছর সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়। রায়ে তারেক রহমানসহ অপর পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়। সব আসামির দ-ের পাশাপাশি ২ কোটি, ১০ লাখ, ৭১ হাজার, ৬৪৩/৮০ টাকা অর্থদ- দেওয়া হয়। এই অর্থ ৬০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রের অনুকূলে আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয় রায়ে। গতকাল খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এই অর্থদ- স্থগিত করেন হাইকোর্ট।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতের এই রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। পরের দিন মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেন। মূল রায়সহ ১২শ ২৩ পৃষ্ঠার আপিল আবেদনে ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে খালেদা জিয়ার খালাস চাওয়া হয়। আপিলটির গ্রহণযোগ্যতার শুনানির জন্য সেদিনই বিচারপতি ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মেনশন (উত্থাপন) করেন। আদালত পরে বৃহস্পতিবার আপিলের গ্রহণযোগ্যতার শুনানির দিন ধার্য করেন।

এরই মধ্যে গতকাল সকালে খালেদা জিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল একটি জামিনের আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে স্বাক্ষর করেন ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। ৮৮০ পৃষ্ঠার এই জামিনের আবেদনে ৩১টি যুক্তি তুলে ধরা হয়। জামিন আবেদনে বলা হয়, আবেদনকারীর বয়স ৭৩ বছর। তিনি শারীরিকি বিভিন্ন জাটিলতায় ভুগছেন। তিনি ৩০ বছর ধরে গেঁটে বাত, ২০ বছর ধরে ডায়াবেটিস, ১০ বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপ ও আয়রন স্বল্পতায় ভুগছেন। ১৯৯৭ সালে তার বাম হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হয় এবং ডান পায়ের হাঁটু ২০০২ সালে প্রতিস্থাপন করা হয়। হাঁটু প্রতিস্থাপনের কারণে তার গিঁটে ব্যথা হয়, যা প্রচ- যন্ত্রণাদায়ক। এমনকি হাঁটাহাঁটি না করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ রয়েছে। শারীরিক এসব জাটিলতার কারণ বিবেচনায় তার জামিন মঞ্জুরের সবিনয় আরজি জানাচ্ছি।

আরেকটি যুক্তিতে বলা হয়েছে, উপমহাদেশ এবং দেশের উচ্চ আদালতগুলোয় দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যখন আসামি একজন নারী হয় তখন তার অনুকূলে জামিন বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আবেদনকারীর জামিন আবেদন মঞ্জুর করা হোক। আরেক যুক্তিতে বলা হয়েছে, ২০০৭-০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের নির্মূলে যে পদক্ষেপ নিয়েছিল এ মামলাটি তারই অংশ।

তা ছাড়া মামলার প্রথম অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা জামিন আবেদনকারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেন। দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ও প্রভাবিত হয়ে তাকে আসামি করেন। জামিন আবেদনকারী বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন। বিচারিক আদালত তার এ বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। তা ছাড়া যে মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাকে হয়রানি করার জন্য।

গতকাল সকালে জামিন আবেদন উত্থাপন করেন ও আপিল শুনানির বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। আদালত তখন দুপুর ১২টায় শুনানির সময় নির্ধারণ করেন।

শুনানি শুরু হওয়ার আগেই বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের বেঞ্চে আইনজীবীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুই পক্ষের আইনজীবীদের আদালতে উপস্থিত দেখে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, যেহেতু দুই পক্ষই উপস্থিত আছে, সেহেতু আগেই শুনানি শুরু হতে পারে। কিন্তু আসামিপক্ষ এ সময় একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার কথা বলে। এ অপেক্ষার মধ্যেই বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের ব্যাপক ভিড়ের কারণে আদালতে হট্টগোল হয়। খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদেরও ওই ভিড় পেরিয়ে এজলাসে পৌঁছতে বেগ পেতে হয়। সংবাদকর্মীদের শেরভাগকেই বাইরে অপেক্ষা করতে হয়।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল দাঁড়িয়ে আদালতকে বলেন, এভাবে শুনানি করা সম্ভব নয়। তিনি দুই পক্ষেই আইনজীবীর সংখ্যা সীমিত করে দিতে অনুরোধ করেন। বিচারক এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনিও সহমত প্রকাশ করেন। আদালত এর পর ১৫ মিনিট সময় দিয়ে এর মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলেন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে দুপুর ১২টায় আপিলের গ্রহণযোগ্যতার শুনানি শুরু হয়। আদালত আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে নথি তলব করেন। এখন খালেদার আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি হবে। তবে কবে এই আপিলের শুনানি হবে সেই তারিখ ধার্য করেননি হাইকোর্ট। আইনজীবীরা বলছেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এই আপিলের শুনানি করতে হলে বেশ সময় লাগবে। বেশ কয়েক বছরও লাগতে পারে।

শুনানিকালে খালেদা জিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন, ছানাউল্লাহ মিয়া, বদরুদ্দোজা বাদল, রাগীব রউফ চৌধুরীসহ অনেক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে