কার ভুলে দুর্ঘটনা?

  তাওহীদুল ইসলাম

১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০৯:১৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিমান দুর্ঘটনার পেছনে সাধারণত দুই ধরনের কারণ থাকেÑ এক. কারিগরি ব্যর্থতা এবং দুই. মানবসৃষ্ট ত্রুটি। যান্ত্রিক ত্রুটিকে বলা হয়ে থাকে কারিগরি ব্যর্থতা বা টেকনিক্যাল ফেইলিওর। আর মানবসৃষ্ট ত্রুটি বা হিউম্যান এরর বলতে বোঝায়Ñ যারা বিমান চালনায়, ফ্লাইট পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং উড্ডয়ন ও অবতরণের প্রাক্কালে প্রয়োজনীয় চেক-আপ করেন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের ভুল বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা।
গত সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় অর্ধশত প্রাণহানির পর প্রাথমিকভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতদৃষ্টে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার জন্য মানবসৃষ্ট ত্রুটি বা হিউম্যান এরর-ই দায়ী বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়Ñ কার ভুলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল? পাইলটের, নাকি ত্রিভুবন বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে (এটিসি) দায়িত্ব পালনকারীদের? দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে যেসব বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা এ নিয়ে আলোচনা করছেন, তাদের কথায় আপাতদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক বিমানবন্দরের এটিসিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন যারা, তাদের ভুলেই এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। আর এ ধারণা জোর বাতাস পায় এমন বার্তা থেকে যে, নেপালের ওই বিমানবন্দরটির এটিসিতে দায়িত্ব পালনকারীরা প্রায়ই ভুল বার্তা দিয়ে বৈমানিকদের বিভ্রান্ত করে থাকেন। অতীতে এমন অনেক ঘটনার নজির খোদ নেপালের পত্রপত্রিকায়ও উঠে আসে।
নেপালের গণমাধ্যম জানিয়েছে, ছয় কর্মকর্তাকে বিমানবন্দরের এটিসি কার্যালয় থেকে বদলি করা হয়েছে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, ওই দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তাদের মানসিক আঘাত প্রশমনে এ ব্যবস্থা। তবে ইউএস-বাংলা এ বদলিকে সঙ্গত কারণেই সন্দেহের চোখে দেখছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্ল্যাকবক্সের তথ্যাদি যাচাই করার পর বিষয়টি হয়তো পরিষ্কার হবে, কার ভুলে ঘটল এমন দুর্ঘটনা। প্রসঙ্গত প্রতিটি উড়োজাহাজে একটি ব্ল্যাকবক্স থাকে, যা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটি প্রকৃতপক্ষে এমন একটি যন্ত্র, যেটি ককপিটের যাবতীয় কথাবার্তা, পাইলটের নির্দেশনা, ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে তার কথোপকথনসহ বিমানের প্রয়োজনীয় কারিগরি তথ্য রেকর্ড হয়ে থাকে। এটিকে ফ্লাইট রেকর্ডারও বলা হয়ে থাকে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন বা আইকাও) বিধি অনুযায়ী, যে দেশে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই দেশ তা তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত। বাংলাদেশ থেকে দুটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যেই নেপালে গিয়ে পৌঁছলেও দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। তারা মূলত প্রয়োজন সাপেক্ষে সে দেশের তদন্ত কমিটিকে সহায়তা করতে পারবে। বিমান দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সেদিন রাতেই ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নেপাল সরকার। ইতোমধ্যেই কমিটি তদন্তে নেমেও পড়েছে। তবে কবে নাগাদ তারা অনুসন্ধান শেষ করতে পারবেন এবং এর পর প্রতিবেদন দেবেন, সে বিষয়টি পরিষ্কার নয়।
গত সোমবার ঢাকা থেকে রওনা হয়ে নেপালের কাঠমান্ডু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের আগমুহূর্তে ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজ ৬৭ যাত্রী ও চার ক্রুসহ মোট ৭১ আরোহী নিয়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এতে ৫০ আরোহীর প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে বাংলাদেশি ২৬ জন। অবশিষ্ট ২১ আরোহী বর্তমানে রাজধানী কাঠমান্ডুর কেএমসি হাসপাতাল, নরভিক হাসপাতাল এবং ওএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনার পর বেঁচে যাওয়া ১০ বাংলাদেশির মধ্যে তিন থেকে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ত্রিভুবন বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার।
ড্যাশ এয়ারক্রাফটটির ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান দুর্ঘটনার পর প্রাণে রক্ষা পেলেও পরদিন অর্থাৎ গতকাল সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এতে করে পাইলটসহ ৪ কেবিন ক্রুর প্রত্যেকেই ঝরে পড়লেন। গতকাল বিকালে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।
এদিকে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় বাংলাদেশ থেকে টিম যেতে প্রস্তুত থাকলেও পাঠাতে হয়নি বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালের বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।
বাংলাদেশের দুটি প্রতিনিধি দলের মধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামালের নেতৃত্বাধীন দলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে রয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশনস) চৌধুরী জিয়াউল কবির এবং সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমডোর মোস্তাফিজুর রহমান। এ দলের আগের দিন দুর্ঘটনাস্থলে গেছেন ইউএস-বাংলার ক্যাপ্টেন লুৎফর রহমান এবং বেবিচকের পরামর্শক গোলাম সারওয়ার।
কাঠমান্ডু পৌঁছে গতকাল দুপুরেই ত্রিভুবন বিমানবন্দরে দেশটির সিভিল এভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিমানমন্ত্রী। এ সময় কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং এ দেশের সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তারাও সঙ্গে ছিলেন। সেখানে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিহতদের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর, আহতদের চিকিৎসার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর পর দুর্ঘটনায় আহত ইয়াকুব আলীকে দেখতে নরভিক হাসপাতালে যান মন্ত্রী। পরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন বিমানমন্ত্রী। তিনি জানান, বিমান বিধ্বস্তের কারণ সংশ্লিষ্টদের তদন্তের পর জানা যাবে। এ ছাড়া নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ কীভাবে দেশে নিয়ে আসা হবে, তা বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদারকি করছে বলে জানান তিনি। জানা গেছে, আজ বুধবার তিনি নেপালের চিফ অব স্টাফের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমান দুর্ঘটনায় পুড়ে যাওয়ায় নিহতদের লাশ শনাক্ত করা খুবই জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল সকালে একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে আরোহীদের আগ্রহী স্বজনদের দুর্ঘটনাস্থলে নিয়ে গেছে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ। এই সম্ভাবনা থেকে যে, তাদের কেউ কেউ হয়তো শরীর বা পোশাকে নানা উপসর্গ থেকে স্বজনদের চিহ্নিত করতে পারবেন।
এদিকে বেসামরিক বিমানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন দলটি কাঠমান্ডু পৌঁছার পর সেখানকার আকাশে তাদের বহনকারী উড়োজাহাজটিকেও ঘণ্টাখানেক অতিরিক্ত উড্ডয়ন করতে হয়েছে ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে ল্যান্ডিংয়ের ক্লিয়ারেন্স না দেওয়ায়। এত বড় একটি দুর্ঘটনার পর দিনই এমন কা-ে ওই বিমানের অনেক যাত্রীর মধ্যে চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার ইউএস-বাংলার বিধ্বস্ত হওয়া প্লেন বিএস২১১ ফ্লাইটের সংগৃহীত ব্ল্যাকবক্স বা ডেটা রেকর্ডারের তথ্যাদি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ কথা জানিয়েছেন ত্রিভুবন বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজকুমার ছেত্রী। তার বরাত দিয়ে নেপালের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও এ তথ্য জানিয়েছে।
নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার প্রকৃত রহস্য জানা যাবে ব্ল্যাকবক্স থেকে। যদিও ব্লাকবক্সের তথ্য প্রাপ্তির আগে থেকেই তারা দাবি করে আসছেন, ফ্লাইট ২১১কে রানওয়ের দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণ করতে বলা হলেও পাইলট উত্তর দিক থেকে অবতরণ করেন। তবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ নেপালি কর্তৃপক্ষের দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের ভাষ্যÑ কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে পাইলটকে ভুল নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এদিকে নেপালের ইংরেজি দৈনিক নেপালি টাইমস কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে পাইলটের সর্বশেষ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডের কথোপকথন ছেপেছে। দৈনিকটি বলছে, কন্ট্রোলরুম থেকে ভুল বার্তা দেওয়ার কারণেই দ্বিধায় পড়েন পাইলট।
হতাহতদের বিষয়ে বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশন অথরিটির (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান বলেছেন, আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্সের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। কোনো প্রয়োজন হলে তারা সাহায্য করবে। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মৃতদেহ শনাক্ত করা। অনেক দেশের যাত্রী সেখানে ছিল, শনাক্ত করা দরকার যাত্রী কোন দেশের।
তিনি আরও বলেন, ইউএস-বাংলা স্বজনদের নেপালে নিয়ে গিয়ে কাজটি ভালো করেছে। যাত্রী ও উড়োজাহাজের বীমা রয়েছে। দুর্ঘটনার তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। নেপাল টাওয়ারের সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের রেকর্ড প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, আমিও ইউটিউব থেকে শুনেছি। কিন্তু এগুলো ভেরিফায়েড নয়। আমরা এনালাইসিস করছি। এখনই মন্তব্য করা যাবে না। আমাদের একটা তদন্ত কমিটি আছে, যদিও তদন্ত কমিটি বলা যাবে না। নেপালের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। মূল কাজটি করবে নেপাল। ব্ল্যাকবক্সের তথ্য উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হলে তারা তথ্য উদ্ধার করতে পারবে। তখন অনেক তথ্য বের হয়ে আসবে। কোনো কিছুই গোপন থাকবে না। তবে কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে এটা বলা মুশকিল। তবে রিজন বের করব, যাতে এর রিপিটিশন না হয়।
উড়োজাহাজটির কোনো ক্রটি ছিল কিনা এ প্রসঙ্গে নাইম হাসান বলেন, সিভিল এভিয়েশনের সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো উড়োজাহাজ চলতে পারে না। উড়োজাহাজটি নেপালে যাওয়ার আগেও একটি ফ্লাইট করে আসছে। আমরা অনেক সময় টেস্ট ফ্লাইট দিই, উড়োজাহাজ ঠিক আছে কিনা চেক করা হয়। ওইদিন সকালে একবার ও পরে দুপুরে একবার উড়োজাহাজটি গিয়েছিল ফ্লাইটে। অতএব উড়োজাহাজটি ভালো ছিল, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। উড়োজাহাজের প্রত্যেক তথ্য আমাদের ফ্লাইট সেফটি বিভাগে থাকবে। একটি বিষয় হচ্ছে বিমান কখনো পুরনো হয় না। উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের লাইফ সার্কেল রয়েছে। লাইফ সার্কেল শেষ হলে ইঞ্জিন পরিবর্তন করলেই হয়।
ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গতকাল ব্রিফিং করে বলা হয়েছে, উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় যারা আহত হয়ে কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদের চিকিৎসার সব খরচ ইউএস-বাংলা বহন করবে।
দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির জিএম (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে ইউএস-বাংলা খুবই সচেষ্ট আছে। প্রত্যেক যাত্রীর জন্য বীমা সুবিধা নিশ্চিত করা ছিল।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে