ভাস্কর্যে বীর

  শান্তা মারিয়া

১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একজন বীর যুদ্ধজয় করে ফিরে আসছেন নিজ বাসভূমে। তিনি আহত, তার কাঁধে অস্ত্র। অদম্য তার মনোবল। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই অদম্য সাহসকেই তুলে ধরা হয়েছে বীরের প্রত্যাবর্তন ভাস্কর্যে।

মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু হলো ‘বীরের প্রত্যাবর্তন’। গুলশান-২ নম্বর ঘেঁষে ভাটারা ইউনিয়নে অবস্থিত বীরের প্রত্যাবর্তন। এর শিল্পী গোবিন্দ পাল। ২০০৮ সালে ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়। মোজাম্মেল হক বীরপ্রতীকের উদ্যোগে এটি স্থাপিত হয়েছে। ভাস্কর্যটির বেদির উচ্চতা ৪১ ফুট। ৫৯ ফুট ৬ ইঞ্চি উঁচু ভাস্কর্যে এক মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব ফুটে উঠেছে। ২৮ ফুট উঁচু এ যোদ্ধা অস্ত্র কাঁধে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসছেন। বেদির চারপাশে পোড়া মাটির ফলকে তুলে ধরা হয়েছে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ৭ই মার্চের ভাষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ভাস্কর্যটির নিচে আছে একটি পাঠাগার। সেখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বই। চারপাশের দেয়ালে লাগানো রয়েছে যুদ্ধকালীন পত্রিকা।

মুষ্টিমেয় কয়েকটি ভাস্কর্য স্বাধীনতার অমর বাণী প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো জাগ্রত চৌরঙ্গী, অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, সাবাশ বাংলাদেশ ইত্যাদি।

‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ হলো মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য। এটি গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর চৌরাস্তার ঠিক মাঝখানে সড়কদ্বীপে অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ প্রথম ব্যাপক আকারে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ গড়ে তোলেন গাজীপুর, জয়দেবপুরের সংগ্রামী মানুষ। তাদের স্মরণে এই ভাস্কর্য নির্মাণ করেন বরেণ্য শিল্পী আবদুর রাজ্জাক। ১৯৭৩ সালে এই ভাস্কর্য সৃষ্টি হয়। বেদিসহ জাগ্রত চৌরঙ্গীর উচ্চতা ৪২ ফুট ২ ইঞ্চি। এখানে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে ধরা হয়েছে যার ডান হাতে গ্রেনেড বাম হাতে রাইফেল। এ ভাস্কর্যের বেদিতে ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ নম্বর সেক্টরের ১০০ জন এবং ১১ নম্বর সেক্টরের ১০৭ জন শহীদ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধার নাম উৎকীর্ণ করা আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে অবস্থিত যে ভাস্কর্যটি শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করে সেটির নাম ‘অপরাজেয় বাংলা’। এর ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। এই ভাস্কর্যটির নির্মাণ শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। ডাকসুর তৎকালীন ভিপি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস মাহবুব জামানের উদ্যোগে ভাস্কর্যের নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণ শেষ হয় ১৯৭৯ সালে। ৬ ফুট বেদির ওপর নির্মিত ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট প্রস্থ ৮ ফুট এবং ব্যাস ৬ ফুট। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারী-পুরুষ সকলেই অংশ নিয়েছেন এই উপজীব্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত শিল্পকর্মটিতে দুজন পুরুষ ও একজন নারীকে দেখা যায় দৃপ্ত ভঙ্গিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসির সড়ক দ্বীপে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’। এটির ভাস্কর হলেন শামীম সিকদার। ১৯৮৮ সালে এটি নির্মিত হয়। এখানে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বীরত্ব এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের দৃশ্য রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’ ফুটিয়ে তুলেছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যিনি যুদ্ধে এক পা ও এক হাত হারিয়েছেন তবু অদম্য ভঙ্গিতে যুদ্ধ করে চলেছেন মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য। এর ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। ১৯৯০ সালে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়।

১৯৭১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারী পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে শহীদ হন। অধ্যাপক হবিবুর রহমান তাদের অন্যতম। অধ্যাপক হবিবুর রহমান হলের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের স্মরণে ২০১১ সালে নির্মিত হয় ভাস্কর্য ‘বিদ্যার্ঘ্য’। এর শিল্পী শাওন সগীর সাগর।

‘অদম্য বাংলা’ হলো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নির্মিত ভাস্কর্য। এটি ২৩ ফুট উঁচু। এর ভাস্কর হলেন গোপাল চন্দ্র পাল। ২০১১ সালে শুরু হয়ে ২০১২ সালে ভাস্কর্যের নির্মাণ শেষ হয়। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে রয়েছে ভাস্কর্য ‘চেতনা ৭১’। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অর্থায়নে এই ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। এর শিল্পী হলেন মোবারক হোসেন নৃপাল। এই ভাস্কর্যে পতাকা হাতে এক তরুণ এবং সংবিধান হাতে এক তরুণীর অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত ভাস্কর্য ‘বিজয় ৭১’ স্থাপিত হয়েছে ময়মনসিংহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। এর শিল্পী শ্যামল চৌধুরী। ২০০০ সালে এই ভাস্কর্য নির্মিত হয়। এই ভাস্কর্যে পতাকা হাতে একজন কৃষক, রাইফেল হাতে নারী এবং গ্রেনেড ছোড়ার ভঙ্গিতে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন একজন ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধে বাংলার সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণকে বোঝানো হয়েছে এই ভাস্কর্যে।

মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক অনেকগুলো ভাস্কর্য। এখানে ৪৪টি ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। এখানে মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ, নিয়াজীর আত্মসমর্পণসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের ভাস্কর্য রয়েছে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে