প্রতিহিংসা বা রাগ নেই

  শাবিপ্রবি প্রতিনিধি

১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৮, ০১:১৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা সিএমএইচে ১১ দিন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে গতকাল নিজ ক্যাম্পাসে ফিরেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে জাফর ইকবাল যেমন উদ্বেলিত তেমনি ক্যাম্পাসও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বইছে স্বস্তির হাওয়া।

বুধবার বেলা সোয়া ১টার দিকে পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন জাফর ইকবাল। সামনে পেছনে পুলিশের গাড়িবহরের মধ্যে সাদা একটি মাইক্রোবাসে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন তিনি। গাড়িতে ড্রাইভারের পেছনের সিটে ডান দিকে জানালার পাশে জাফর ইকবাল বামে তার মেয়ে ইয়েশিম ইকবাল ও সহধর্মিণী ড. ইয়াসমীন হক বসেছিলেন। ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে গাড়িবহর সোজা শিক্ষক কোয়ার্টারে দিকে চলে যায়। পরে বিকাল ৪টার দিকে বিশ^বিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তিনি।

এর আগে সকালে ঢাকা সিএমএইচ ত্যাগ করেন জাফর ইকবাল। এ সময় তার চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাকে বিদায় জানান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগামী সাত দিন তাকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে বলেছেন। আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম শাম্মী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে খবরটি জানানো হয়।

বিকালে মুক্তমঞ্চের সামনে হাজারো শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জাফর ইকবাল বলেন, ‘যখন আমি বেঁচে ফিরে এসেছি, বারবার ঘুরে ফিরে অভিজিৎ, অনন্ত, নিলয়, দ্বীপন, ওয়াসিক, হুমায়ুন আজাদের কথা মনে পড়েছে। আরও অনেকের কথা মনে পড়েছে, যাদের নাম হয়তো এ মুহূর্তে মনে আসছে না। তারা সবাই আস্তে আস্তে স্মৃতি হয়ে গেছেন। আমার নামটাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারত, কিন্তু বেঁচে গেছি। যারা আমাদের মধ্যে ফিরে আসেনি, তাদের পরিবারের প্রতি সম্মান জানাচ্ছি।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট কিছু ছাত্র শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলেছিল। এর পর এক ধরনের মনঃকষ্ট থেকে নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। ছাত্রছাত্রীদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি আমার ভুল বুঝতে পারছি। ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বলছি, আমি তোমাদের, তোমাদের সঙ্গেই থাকব।’

হামলাকারী ফয়জুল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তার (ফয়জুল) প্রতি আমার বিন্দুমাত্র প্রতিহিংসা বা রাগ নেই। তার জন্য শুধু মায়া, করুণা হয়। সে এ কাজ করেছে বেহেশতে যাওয়ার জন্য। তাকে এটা বুঝানো হয়েছে, সে যদি আমাকে মারতে পারে তা হলে বেহেশতে যেতে পারবে। এত সুন্দর একটি পৃথিবীকে সে উপভোগ করতে পারছে না ভেবে তার জন্য আমার মায়া হয়।’

তিনি বলেন, এখানেও হয়তো এমন কেউ আছে, যে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে আজ পারলাম না পরে হয়তো একবার সুযোগ নেব। এমন কেউ থাকলে আমি বলব, তোমাদের মধ্যে যদি কোনো বিভ্রান্তি থাকে; দয়া করে আমার সঙ্গে দেখা করতে আস। সামনাসামনি আমার সঙ্গে কথা বল। আমি শুনতে চাই, তোমার মধ্যে কী নিয়ে এত বিভ্রান্তি।

জাফর ইকবাল আরও বলেন, আমাকে অনেকে নাস্তিক বলে। সমস্ত কুরআন শরিফ খুব ভালো করে আমি পড়েছি। কুরআনের একটি আয়াতে আছে, ‘তুমি যদি একজন মানুষ হত্যা কর, তা হলে তুমি সমস্ত মানবজাতিকে হত্যা করলে।’ আরেকটি আয়াতে আছে, ‘তুমি যদি একজন মানুষ বাঁচাও সমস্ত মানবজাতিকে তুমি বাঁচালে।’

এর আগে স্বস্তি প্রকাশ করে পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহজাদী নওরীন বলেন, জাফর ইকবাল শুধু একজন লেখকই নন, তিনি আমাদের শৈশব, আমাদের স্বপ্ন দেখার কারিগর, ভালো কিছু করার প্রেরণা। যার জন্য আমাদের অসম্ভব সাহসী হয়ে ওঠা, তরুণ সমাজ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছে। স্যারের ওপর বর্বর হামলায় আমরা ব্যথিত, ক্ষুব্ধ। আপনি ফিরে আসায় আমরা নির্ভার।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ইয়াসমীন হক, কোষাধ্যক্ষ ইলিয়াস উদ্দিন বিশ^াস, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান।

উল্লেখ্য, ৩ মার্চ বিশ^বিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ইইই ফেস্টিভ্যালের সমাপনী অনুষ্ঠান চলাকালে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন জাফর ইকবাল। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তাকে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে