স্বজনদের এখন শুধুই অপেক্ষা

লাশ ফেরত দিতে দেরি হবে # আজ নেপাল যাচ্ছে মেডিক্যাল টিম # ডিএনএ টেস্টে সহযোগিতার প্রস্তাব # উন্নত চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হবে আহতের পরিবারকে

  তাওহীদুল ইসলাম, কাঠমান্ডু ও আরিফুজ্জামান মামুন, ঢাকা

১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৮, ০৯:৫০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালে ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের এখন সময় কাটছে অপেক্ষার প্রহর গুনে। মৃতদের অনেককে রাখা হয়েছে হাসপাতালের হিমঘরে। আবার দগ্ধ অনেকের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মৃতদেহগুলো হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ বলছে, নিহতদের মরদেহ শনাক্ত করে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ অবস্থায় স্বজনদের এখন সময় কাটছে শুধু অপেক্ষা করে।

দুর্ঘটনার পর হতাহতদের স্বজনরা নেপালে গেছেন। লাশ শনাক্ত করার পরও দেখতে দেওয়া হচ্ছে না মরদেহÑ এমনটাই অভিযোগ করা হচ্ছে। দুর্ঘটনায় নিহতদের শনাক্ত করতে ও আহতদের খবর নিতে গত মঙ্গলবার থেকে নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন হতাহতের স্বজন ও বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধিরা। নেপাল সরকার নিহতদের লাশ শনাক্তকরণে খুবই ধীরগতিতে কাজ করছে বলে অভিযোগ নিহতদের স্বজনদের। তারা বলেন, অনেকেই আছেন, যাদের চেহারা বোঝা যাচ্ছে। তাদের ছবি আছে সেগুলোতে কী সমস্যা? আমাদের স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হোক আমরা কখন মরদেহ পাচ্ছি। আমাদের দেখতে দেওয়া হোক; কিন্তু কোনো কিছু করা হচ্ছে না। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে এখানে মরদেহ আছে কিনা।

এদিকে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের সবার মরদেহ শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস। গতকাল নেপালের একটি হাসপাতালে দুর্ঘটনায় হতাহতদের খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্ত শেষ করতে আরও চার দিন লাগবে। তার পর তারা স্বজনদের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য নিশ্চিত করে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করবেন। মরদেহ ফেরত পাঠাতে হয়তো আরও ২-১ দিন বেশি লাগতে পারে।

পুড়ে যাওয়ার কারণে যাদের মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ মেলানোর দরকার হবে, তাদের ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানান তিনি।

এদিকে নেপাল দূতাবাস থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, আইনগত ও ফরেনসিক টেস্টের জন্য শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্ব হবে। ফলে দ্রুত মরদেহ দেশে আসছে না। কাঠমান্ডুর বাংলাদেশি দূতাবাস মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মরদেহগুলো দেশে আনতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সাত সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম আজ বৃহস্পতিবার নেপাল যাচ্ছে। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আহত রোগীদের দেখতে এবং তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দলটি সেখানে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন বলেন, ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের তিনজন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) দুজন ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু হাসপাতাল) দুজনের মেডিক্যাল টিমটি আজ বেলা ১১টার দিকে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বে।

এদিকে ডিএনএ টেস্টের সক্ষমতা নেপালের নেই বলে জানা গেছে। ফলে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য নেপাল কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশের তরফ থেকে ডিএনএ টেস্টে সহযোগিতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি নেপাল। বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গুরুতর আহত ডা. রেজওয়ানুল হক শাওনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকাল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে নেপাল থেকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে গতকাল নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির সঙ্গে বৈঠক করেন বিমানমন্ত্রী শাহজাহান কামাল। এ ছাড়া গত রাতে হোটেল ইয়াক ইয়েতিতে নেপালের সেনাপ্রধান রাজেন্দ্র ছেত্রির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিমানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে মন্ত্রী বলেন, বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতদের বীভৎস দেহ চিহ্নিতকরণে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

জানা গেছে, বাংলাদেশিদের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর দেশে আনা হবে। ময়নাতদন্তের পর দেশে নিয়ে যাতে মরদেহ শনাক্তে কোনো বেগ পেতে না হয়, সে জন্য নেপালের বিভিন্ন দপ্তরে আলোচনা চলছে বলেও জানান বিমানমন্ত্রী শাহজাহান কামাল।

মন্ত্রী বলেন, নিহত ব্যক্তিদের ময়নাতদন্ত শেষ করতে অন্তত তিন দিন লাগবে। যাদের শনাক্ত করা যাবে, তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই মরদেহ ঢাকায় নেওয়া হবে। যাদের পরিচয় শনাক্ত করা যাবে না, তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।

শাহজাহান কামাল বলেন, কেউ যদি তাদের আহত আত্মীয়স্বজনকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে বা দেশে নিতে চান নিতে পারবেন, তবে চিকিৎসার খরচ নিজেদের বহন করতে হবে। আহত ১০ বাংলাদেশির মধ্যে কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজে (কেএমসি) আছেন আটজন। ওম হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে আছেন একজন। নরভিক হাসপাতালে আছেন একজন।
ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশন (আইকাও) বিধি অনুযায়ী, দুর্ঘটনাস্থল হিসেবে তদন্তকাজ করার কথা নেপালেরই। তবে বাংলাদেশের কোনো দল যৌথভাবে অংশ নিতে বাধা নেই; কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা গেছে, নেপালের তদন্তকাজে বাংলাদেশি প্রতিনিধির দরকার নেই বলে অভিমত দিয়েছে দেশটির সরকার। বাংলাদেশ থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা করে কথা বলেছে। ফলে দুর্ঘটনাটি কেন ঘটেছে, তা জানার জন্য তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। আর তা পেতে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ৪-৫ মাস। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছেÑ উড়োজাহাজ থেকে উদ্ধারকৃত ব্ল্যাকবক্স থেকে দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য জানার সুযোগ থাকলেও তা জনম্মুখে প্রকাশ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। সাধারণত এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে এড়াতে কিছু সুপারিশ থাকে। ব্ল্যাকবক্স থেকে সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করা না-ও হতে পারে। ফলে পাইলটের ভুল নাকি নেপাল বিমানবন্দরের এটিসির (এয়ার ট্রাফিক কনট্রোল) সিগন্যালে ভুল ছিল, তা স্পষ্ট হওয়ার ব্যপারটি প্রকাশ না-ও পেতে পারে।

বাংলাদেশের যে তিন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ বিমানমন্ত্রী শাহজাহান কামালের সঙ্গে নেপাল গিয়েছিলেন তারাও তেমন কোনো অগ্রগতি ছাড়া গত রাতে দেশে ফিরেছেন। নেপাল তদন্ত সংস্থা থেকে তদন্তের বিষয়ে কিছু জানায়নি। ইতোমধ্যে দুর্ঘটনা নিয়ে নেপাল সিভিল এভিয়েনশ ও ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করছে।

এয়ারলাইন্স নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বিমানবাহিনীর সাবেক স্কোয়াড্রন লিডার ওয়াহিদ উন নবী আমাদের সময়কে বলেন, পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে সর্বনিম্ন ৬ মাস লাগবে। কখনো কখনো ১-২ বছর লাগে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া যৌথভাবে তদন্তের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি নেপাল। এখন এককভাবে তদন্ত করছে দেশটি। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়ায় দৃশ্যত বাংলাদেশের কোনো অংশগ্রহণ থাকল না।
এ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম. নাঈম হাসান বলেন, বিমান পরিচালনা বোর্ডের সদস্য (অপারেশন) এয়ার কমডোর মোস্তাফিজুর রহমান দেশে এলে বিস্তারিত বলা যাবে। তবে নেপালের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া ভালো।
ওয়াহিদ উন নবী আরও বলেন, যখন যে দেশে বিমান দুর্ঘটনা হয়, তখন সে দেশই মূল তদন্তের দায়িত্বে থাকে। এর সঙ্গে দুর্ঘটনাকবলিত বিমান কোম্পানির একজন প্রতিনিধি অবশ্যই থাকতে হয়। এ ছাড়া যে দেশের কোম্পানির বিমান সে দেশের সিভিল এভিয়েশনের একজন বিশেষজ্ঞ এবং পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের একজন প্রতিনিধি থাকতে হয়।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে