• অারও

১৭ বাংলাদেশির লাশ শনাক্ত

  তাওহীদুল ইসলাম, কাঠমান্ডু থেকে

১৮ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৮, ০৯:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইউএস-বাংলা বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ৪৯ যাত্রীর মধ্যে ২৮ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ বাংলাদেশি, ১০ নেপালি ও একজন চীনা নাগরিক। নিহতদের শরীরের বিভিন্ন অংশের ধরন এবং পোশাক ও ব্যবহার্য উপাদানের বিবরণ বিশ্লেষণ করে গতকাল সন্ধ্যায় এ শনাক্তকরণের তথ্য স্বজনদের জানিয়েছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় ও টিচিং হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।
এদিকে গতকাল স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছে আহত ইমরানা কবির হাসিকে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন; শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। এর আগে গতকাল সকালে ঢাকায় নেওয়া হয় অপর আহত যাত্রী রাশেদ রুবায়েতকে। এদিকে ঢাকা থেকে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন এম রহমতুল্লাহর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত দল বাংলাদেশ থেকে নেপালে আজ আসার কথা রয়েছে।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন হাসপাতালে ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই পরিচয় শনাক্ত হওয়া যাত্রীর মধ্যে রয়েছেÑ বিলকিস আরা, জামান অনিরুদ্ধ, তাহিরা তানভিন শশী রেজা, মিনহাজ বিন নাসির, রকিবুল হাসান, মতিউর রহমান, রফিকুজ্জামান, আকতারা বেগম, হাসান ইমাম, এসএম মাহবুবুর রহমান ও শিশু তামারা প্রিয়ন্ময়ী, সাংবাদিক ফয়সাল, সানজিদা ও নুরুন্নাহারের লাশ। আর দুর্ঘটনাকবলিত ক্রু চারজনের মধ্যে ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশিদ, খাজা হোসেন মোহাম্মদ শাফির পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। ক্রু নাবিলাসহ ১২ জনের পরিচয় গতকাল পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি। তবে আজ আবার চেষ্টা করা হবে। তাতেও সম্ভব না হলে ডিএনএ টেস্ট করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে নেপালে যাওয়া ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. সোহেল মাহমুদ।
গতকাল সন্ধ্যায় নিহতদের স্বজনদের কাছে পরিচয় তুলে ধরেন ত্রিভুবন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। এ সময় বাংলাদেশি চিকিৎসক দলও উপস্থিত ছিলেন। এর পর তাদের মরদেহ দেখতে সুযোগ দেওয়া হয় স্বজনদের। দুর্ঘটনার পর নেপালে গেলেও স্বজনরা এই প্রথম দেখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রিয়জনকে একনজর দেখার আশায় গতকাল সকাল থেকেই ভিড় করেন তাদের স্বজনরা। পোস্টমর্টেমের পর লাশ শনাক্ত করতে তাদের দেখতে দেওয়া হবে এমন ঘোষণায় তারা যান সেখানে। নিহতদের স্বামী, স্ত্রী, ভাই, বোন এ রকম কাছের মানুষগুলো ছিলেন সেখানে। একান্ত মানুষকে হারানো এসব স্বজনের অবস্থা দেখে চোখের কোনায় পানি জমে যায় অন্য সাধারণ মানুষেরও। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে যায় কাঠমান্ডুর বাতাস। প্রিয়জন হারানো এসব বাংলাদেশির চোখমুখ দেখে মনে হয় এটিই যেন অশ্রুশিক্ত বাংলাদেশ।
ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুগামী বিমানটি বিমানবন্দরে এসে বিধ্বস্ত হওয়ার পর দিনই নেপালে ছুটে আসেন আহত-নিহতদের স্বজনরা। তাই গতকাল টিচিং হাসপাতালে যাওয়া এসব মানুষ আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। দুর্ঘটনায় নিহত ৪৯ যাত্রীর মধ্যে ২৬ বাংলাদেশি, ২২ নেপালি আর একজন চীনের নাগরিক। সবার মরদেহই কাঠমান্ডুর বিমানবন্দরসংলগ্ন টিচিং হাসপাতালে রাখা। তাই তারা জড়ো হয়েছেন সেখানে। কাছের মানুষকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তারা। মনকে বোঝাতে পারছেন না আপনজনকে হারিয়ে কীভাবে কাটাবেন বাকি জীবন। কেউবা আদরের সন্তানের এই অকাল মৃত্যুতে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সবার মনেই ক্ষত। কে কাকে সান্ত¦না দেবেন। এর মধ্যেই দিনভর চলে ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারের কাছে আপনজনের চেহারার চুলচেরা বিশ্লেষণ। শরীরের বিশেষ চিহ্ন, গঠন, পরনের পোশাক, সঙ্গে থাকা উপকরণ যা মনে পড়ছে সবই তুলে ধরা হয় ডাক্তারদের কাছে। উদ্দেশ্যÑ তবু যেন আপনজনের লাশ শনাক্ত করা যায়। চিরতরে হারালেও তার মরদেহ যেন চিহ্নিত করে নেওয়া যায় জন্মভূমিতে।  
দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন পিয়াস রায়। এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্নশিপের আগমুহূর্তে পাঁচ দিনের জন্য নেপাল রওনা হয়েছিলেন। নেপালের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন ঠিকই তবে জীবন হারিয়ে। অন্যের জীবন বাঁচানোর আশায় ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সব চূর্ণবিচূর্ণ করে তিনি এখন হিমঘরে। স্কুলশিক্ষক বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায়ের এক ছেলে ও এক মেয়ে। দুজনই মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে কাঠমান্ডু যেতে দেরি হয়েছে পাসপোর্টের অভাবে। গতকাল ছেলের ছবি দেখাচ্ছিলেন হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকের কাছে। তখনই বলছিলেনÑ ‘এখানে আসতে হয়েছে ছেলের লাশ নিয়ে যেতে। বাবা হিসেবে এটি যে কত কষ্টকর তা ভুক্তভোগী মাত্র বলতে পারবেন।’
দেরিতে খবর পেলেও একমাত্র ভালোবাসার মানুষকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়াল দেন বিলকিসের স্বামী আজিজ। ওদিকে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু গিয়ে এক হন নিহত বিলকিসের একমাত্র ভাই মাসুদ। আজিজ ২০১৪ সালে বিয়ের পর ২০১৬ সালে স্ত্রীকে নিয়ে যান সেখানে। দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়ে নেপাল এসেছিলেন স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রী তারা দুজনই কর্মজীবী।
বিলকিসের স্বামী আজিজ জানান, তার স্ত্রী কারো ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। এত পছন্দের এই মানুষটাকে রেখে একাই পরপারে চলে যাবেন বিলকিস তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি স্বামী। বিলকিসের মা-বাবা দুজনেই রাজশাহী থাকেন; একমাত্র ভাই মাসুদ ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। বোনকে হারিয়ে মাসুদ কথা বলতে পারছিলেন না। কেবল ডাক্তারের কাছে বোনের বিবরণ দেওয়া ছাড়া কোনো বাক্য নেই। মা-বাবার কাছে কত দ্রুত আদরের বোন বিলকিসের মৃতদেহ নিয়ে যেতে পারবেন এটিই এখন বড় টার্গেট। কখন দেখতে পাবেন বোনটি এ জন্য হাসপাতালে ছটফট করছিলেন। হাসপাতালের চিকিৎসক এবং কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন সকাল থেকে লাশ চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও চেহারা দেখতে স্বজনদের ডাকতে বেলা গড়াতে পারে।
ফটোগ্রাফার এফএইচ প্রিয়ক পাঁচজনসহ নেপাল গিয়ে মরদেহ হয়ে আছেন কন্যা প্রিয়ন্ময়ীকে নিয়ে। তার লাশ চেনাতে মর্গের আশপাশে হাঁটাহাঁটি করছেন মামাতো ভাই সোহান। প্রিয়কের আপন ভাইবোন না থাকায় তিনি এখন অভিভাবক হিসেবে এসেছেন। প্রিয়কের অপর তিন আহত আত্মীয়কে আগের দিন ঢাকায় পাঠিয়েছেন তিনিই। ভারী গলায় সোহান বলছেন, ‘বিভিন্ন স্যাম্পল সরবরাহ করা হয়েছে ডাক্তারদের। তবে কখন প্রিয়ক ভাই আর তার মেয়েকে দেখা যাবে জানি না। প্রিয়কের বাবা বেঁচে নেই; মা এখনো জানেন না তার ছেলে চলে গেছে তিন বছরের সন্তানকে সঙ্গে করে না ফেরার দেশে। বেঁচে যাওয়া স্ত্রী অ্যানীকে না বলেই চলে গেলেন তিনি।’
খুলনার আলিমুজ্জামানও নেপালের উদ্দেশে উড়াল দিয়েছিলেন। ইউএস-বাংলার বিমানে চেপে অবতরণের আগমুহূর্তে তিনিও হারান জীবনপ্রদীপ। এই জগৎ থেকেই যে চিরতরে উড়াল দেবেন আলিম তা জানতেন না তার মামা শাহাবুর রহমান। বোনের কাছে কী বলবেন, সান্ত¦নার ভাষা কী খুঁজে পাচ্ছেন না জাগতিক অভিধান থেকে। তাদের মতো অনেকেই এখন কষ্ট বুকে নিয়ে ছুটে চলেছেন হাসপাতালের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত।
বাংলাদেশিদের মতো নেপালিদের কাছেও টিচিং হাসপাতাল আলোচিত নাম। এখানে মর্গে রাখা সৈয়তা থাপা। তার মা উর্মিলা প্রবান মেয়েকে পড়তে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি মেডিক্যালে। মেয়ে এমবিবিএস পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন। তার জন্য মা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করে ওপরের দিকে তাকিয়েছিলেন ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটির দিকে। চোখেমুখে ছিল আনন্দের ঝিলিক। মুহূর্তেই তা বিষাদে পরিণত হয় যখন তিনি দেখেন প্লেনটিতে আগুন ধরে যায়। এর পর থেকে খানাপিনা তার বন্ধ। হাসপাতালে ঘুরছেন কখন দেখবেন তার একমাত্র মেয়েকে। ডিভোর্সি উর্মিলার বুকের ধন এভাবে হারাতে হবে তা ভাবতে পারেননি বলে কাঁদতে থাকেন। এর পর হাসপাতালের বোর্ডে টানিয়ে রাখা ছবি দেখাচ্ছিলেন এই প্রতিবেদককে। একইভাবে সন্তানের ছবি দেখাতে ব্যস্ত নেপালি নাগরিক প্রদীপ বড়ান। তার মেয়েও ডাক্তারি পড়ত বাংলাদেশে। ছারু বড়াল মেয়েটির নাম। এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তাদের আরেক সহপাঠী নিগা মহার্জন। একত্রে লাশ হওয়া ১১ ছাত্রীর একজন তিনি। তার মামা রাজন বলেন, ভাগ্নে আমার অনেক মেধাবী ছিল। স্বপ্ন ও চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবে। আর এখন তার লাশ দেখতে হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। গতকাল দুপুরের মধ্যেও লাশ দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ নেপালের স্বজনরা ৩ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন কর্তৃপক্ষকে। এ নিয়ে সময় প্রয়োজনীয়তার কথা বলে গতকাল সন্ধ্যায় পরিচয় প্রকাশ করতে সক্ষম হয় দেশটির হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আজও একইভাবে শনাক্তকণের চেষ্টা করা হবে স্বজনদের দেওয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে