কোটা নিয়ে ফের উত্তেজনা

৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম আন্দোলনকারীদের # ৩ নেতাকে চোখ বেঁধে তুলে নেওয়ার অভিযোগ # জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল : ডিবি

  নিজস্ব ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:৫৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর অনেকটা ঝিমিয়ে পরলেও গতকাল তিন নেতাকে ‘তুলে’ নেওয়ার ঘটনায় আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের পাশাপাশি পরিবারে সদস্যদেরও হয়রানি করছে পুলিশ। তবে ডিবির দাবি, তাদের তুলে নেওয়া হয়নি। তদন্তের প্রয়োজনে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে স্বাধীনতাবিরোধীরা ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের ‘অপচেষ্টা’ রুখতে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনকারীরা বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে। পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক নূর এ সময় বলেন, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও উপাচর্যের বাসভবনে হামলার ঘটনায় করা সব মামলা দুই দিনের মধ্যে প্রত্যাহার না করলে আবার রাজপথে নামব আমরা।
সাধারণ শিক্ষার্থীরাই এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, দাবি করে তিনি বলেনÑ এই আন্দোলন যারা করেছে, তাদের হয়রানি করবেন না। যদি তাদের হয়রানি করা হয়, তা হলে আমরা আবারও আন্দোলন করব।
ওই সংবাদ সম্মেলনের পর পরই চানখাঁরপুলে যাওয়ার পথে পরিষদের তিন যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক নূর, ফারুক হাসান ও মুহম্মদ রাশেদ খানকে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা ধরে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন আহ্বায়ক হাসান আল মামুন। তিনি জানান, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফটকের সামনে রিকশা থেকে তাদের মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নেয় সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা। পরে দুই ঘণ্টার মধ্যে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, তাদের তদন্তের প্রয়োজনে নিয়ে আসা হলেও জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় যেসব তথ্য-উপাত্ত পুলিশ পেয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্যই ওই তিনজনকে আনা হয়েছিল।
পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার পর গতকাল বিকাল সোয়া তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ফের সংবাদ সম্মেলন করেন ওই তিন নেতা। এ সময় নূরুল হক নূর বলেন, গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে পৌনে একটার দিকে আমাদের একটি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি জানান, চোখ খুলে দেওয়ার পর দেখেন তারা একটি কক্ষে। সেখানে তাদের বলা হয়, ‘তোমাদের ওপর হামলা হতে পারে তাই তোমাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখানো হবে।’ কিন্তু তাদের কিছুই দেখানো হয়নি। পরে তাদের নাম-ঠিকানা নিয়ে পৌনে তিনটার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে তাদের নেওয়া হয়েছিল। তবে এ সময় তাদের কোনো নির্যাতন করা হয়নি।
বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে আন্দোলনকারী তিন নেতা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। তাদের দেখে অন্যরা ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিয়ে স্বাগত জানায়।
আন্দোলনকারী তিন কেন্দ্রীয় নেতা সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, তারা ও তাদের পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করতে এসে আজ একদিকে আমরা হত্যার হুমকি পাচ্ছি, অন্যদিকে পুলিশও আমাদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অসুস্থ আন্দোলনকারীদের দেখতে গেলে অনেক মানুষের সামনে থেকে তুলে নেওয়ায় হয়তো আমরা বেঁচে ফিরতে পেরেছি। তবে সামনে অন্য কোনো জায়গা থেকে তুলে নিয়ে গেলে আমাদের কে বাঁচাবে?
তারা বলেন, আমরা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তও মেনে নিয়েছি। তার পরও নাটকীয়ভাবে আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পরিষদের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক বিন ইয়ামিন জানান, সংবাদ সম্মেলন শেষে বেলা পৌনে একটার দিকে তারা কয়েকজন ঢাকা মেডিক্যালের দিকে যাচ্ছিলেন। রাশেদ, নুরুল্লাহ ও ফারুক এক রিকশায় ছিলেন। আর তিনি ছিলেন পেছনের রিকশায়। ওই তিনজনকে বহনকারী রিকশাটি ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশের ফটকের কাছে এলে পেছন থেকে কয়েকটি মোটরসাইকেল রিকশাটির সামনে গিয়ে গতিরোধ করে। পরে পেছন থেকে আরেকটি সাদা রঙের হাইএস মডেলের মাইক্রোবাস এসে সেখানে থামে। গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে রিকশা থেকে তিন নেতাকে নামিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। এ সময় হালকা ধাস্তাধস্তি হয়।
যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান অভিযোগ করেন, আমার আব্বা নবাই বিশ্বাসকে তুলে নেওয়া হয়েছে এবং তাকে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করছে পুলিশ। তাকে জোর করে এটা বলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, তার ছেলে (রাশেদ) জামাত-শিবিরের লোক। আজ আমি রাজনীতির সাথে জড়িত নই বলেই কি আমাকে জামায়াত-শিবিরের ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে? আমাকেসহ আমার আত্মীয়স্বজনকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি আশঙ্কা করছি, তাদের ওপর আক্রমণ হতে পারে। সরকারের কাছে আমার আব্বার গ্রেপ্তারের বিচার চাই। বর্তমানে তিনি ঝিনাইদহ সদর থানায় আছেন।
ফারুক হোসেন বলেন, আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সবার হাতে রিভলবার ছিল। আমাদের কাছে তথ্য চাইলে আমরা তাদের সঙ্গে গিয়ে তথ্য দিয়ে আসতাম। কিন্তু এভাবে চোখ বন্ধ করে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো কেন?
সংবাদ সম্মেলনের পরে আটকের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এক প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে এসে শেষ হয়।
২৪ এপ্রিল মহাসমাবেশের
ডাক মুক্তিযোদ্ধাদের
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে স্বাধীনতাবিরোধীরা ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। এই ‘অপচেষ্টা’ রুখতে আগামী ২৪ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন তারা।
জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবদুল আহাদ চৌধুরী।
মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশ বাস্তবায়ন পরিষদ আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আবদুল আহাদ বলেন, তথাকথিত কোটা সংস্কারের নামে স্বাধীনতাবিরোধীদের ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টার দিকে তাকালে আমরা অনুধাবন করতে পারি। দেশপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধারা এ পরিস্থিতিতে চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। স্বাধীনতাবিরোধীদের এই হীন চক্রান্তকে প্রতিহত করা এখন ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজন এবং তা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা আগামী ২৪ এপ্রিল দুপুর ২টায় শাহবাগ চত্বরে মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছি। ওইদিন আমরা জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রিয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার লক্ষ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করব।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে