শেষ সময়ে চাপে সোহাগ-জাকির

  আলী আসিফ শাওন ও সানাউল হক সানী

১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১০:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে সাইফুর রহমান সোহাগ ও এসএম জাকির হোসাইনের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সমন্বয়হীনতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি ঠেকাতে না পারা, ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের অনুপ্রবেশের অভিযোগ, জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগে বিভক্তিসহ নানাবিধ চাপের মধ্যে সময় পার করছেন সোহাগ ও জাকির। সাম্প্রতিক সময়ে এসব কারণে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডও ক্ষুব্ধ ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার প্রতি। যদিও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা বলছেন, চাপ সামলানোর অভ্যাস তাদের রয়েছে।

অনেকেই বলছেন, নানাবিধ চাপের মুখে পড়ে খেই হারিয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর ক্যান্টিনে নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মারধর করেছেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের অনুসারীরা। হামলাকারীরা সোহাগের উপস্থিতিতেই এ হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ছাত্রলীগের সহসভাপতি আরেফিন সিদ্দিক সুজন, উপ-নাট্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরুল হাসান নিশু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বুলবুল, ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাহবুব খানসহ কয়েক নেতাকর্মী মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ সভাপতিকে প্রশ্ন করেন। তারা জানতে চান, সম্মেলন প্রস্তুত কমিটি কেন করা হচ্ছে না? কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের পদধারী যারা ইন্ধন দিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? ধারাবাহিক প্রশ্নের এক পর্যায়ে ছাত্রলীগ সভাপতির পাশে বসে থাকা কেন্দ্রীয় ও হল পর্যায়ের কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাদের ওপর চড়াও হন। ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগের সামনেই মারধর করা হয় কয়েকজনকে। আহতরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হামলার শিকার ছাত্রলীগের সহসভাপতি আরেফিন সিদ্দিক সুজন আমাদের সময়কে বলেন, ছাত্রলীগের পদধারী অনেক নেতাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদল থেকে ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা? এ সময় তার সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন নেতা আমাদের ওপর হামলা করে। তিনি আরও বলেন, হামলার শিকার নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগ সভাপতির নামে অভিযোগ তুলে বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে কত টাকা পেয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ছাত্রলীগ? এ প্রশ্নের পর পর মারধরের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ আমাদের সময়কে বলেন, ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতাকর্মী মধুর ক্যান্টিনে এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চেয়েছিল। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের প্রতিহত করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রলীগে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবির থেকে অনুপ্রবেশের অভিযোগ নতুন নয়। ছাত্রলীগের সোহাগ-জাকিরের নেতৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর পরই শিবির ও ছাত্রদল কর্মীদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ ওঠে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বেও স্থান পায় ছাত্রদল ও শিবিরের সক্রিয় কর্মীরা। বিবাহিত, মাদক মামলার আসামিসহ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জ্বালাও-পোড়াও মামলার আসামিকেও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে পদায়ন করা হয়। তবে এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চাপা থাকলেও সাম্প্রতিক সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের কিছু নেতার বিতর্কিত কর্মকা- এ অভিযোগকে আরও চাঙ্গা করে তোলে। ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল অনেকেই সংগঠনে শুদ্ধি অভিযানের দাবি করেন। তার পরও অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিষ্ক্রিয়তা প্রশ্ন তোলে সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীর মনে। তাদেরই একটা পক্ষ গতকাল মধুর ক্যান্টিনে প্রশ্ন করেন ছাত্রলীগ সভাপতির কাছে।

ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন আমাদের সময়কে বলেন, অনুপ্রবেশের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর পরই সারাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া, আন্দোলনে ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভাবিয়ে তুলেছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্র্মীরা অংশগ্রহণ করে। এমনকি আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুনও ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার হাজী মুহাম্মদ মহসীন হলের সহসভাপতি।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা সামাল দিতে ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসের এতটা সক্রিয় হওয়ার পরও আন্দোলনকারীরা কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাড়িতে ভাঙচুর ও তা-ব চালাল এটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে সরকারের শীর্ষ মহলে। এ ছাড়া আন্দোলনের এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান ইশাকে তড়িঘড়ি করে বহিষ্কার, বহিষ্কারের পর ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতাদের ক্ষোভের মুখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবার স্বপদে পদায়নের ঘটনায় ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্বের দুর্বলতাকেই দুষছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন স্থবির হয়ে পড়তে বসেছিল, তখন এক পর্যায়ে অনেকটা ক্ষোভ ও অভিমান থেকেই সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের দুয়েকজন নেতা বলেন, ছাত্রলীগের অনেক শীর্ষ নেতাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের দীর্ঘসূত্রতা চেয়েছিলেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, আন্দোলনের ফাঁদে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে আটকে যাবে ছাত্রলীগের পরবর্তী জাতীয় সম্মেলন।

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে অনেকেই নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাদের মতে, সোহাগ-জাকিরের আর মাত্র ২০-২৫ দিন মেয়াদ আছে। ওদের নিয়ে বলে আর কী হবে! ওরা সম্মেলনটা দিয়ে ভালোই ভালোই বিদায় নিক এটাই আমরা চাই। এমনিতেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি তারা। এখন সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন গ্রুপ চাপে রাখছে সোহাগ-জাকিরকে। আমরা আশা করি, তারা নির্ধারিত সময়ে সম্মেলন দিয়ে সসম্মানে বিদায় নিতে পারবে।

ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতা ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের পরবর্তী জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আবেগ জড়িত। আমি আশা করি আগামী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বে যারা আসবে তারা শেখ হাসিনার আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলত ঘটাতে পারবে।

একই বিষয় জানতে চাইলে ছাত্রলীগের আরেক সাবেক শীর্ষ নেতা ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম আমাদের সময়কে বলেন, আগামী জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ আরও গতিশীল হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ছাত্রলীগের আগামী দিনের নেতৃত্ব আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভ্যানগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শীর্ষ নেতা দেলোয়ার হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ছাত্রলীগের নেতাদের উচিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মেলনের আয়োজন করা। কিন্তু সম্মেলন নিয়ে তাদের মধ্যে বেশ নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন বলেন, আশা করি ছাত্রলীগের মধ্যে উদ্ভূত সমস্যা সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নিজেরাই সমাধান করতে পারবে। ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের উচিত হবে, কোনো ব্যক্তির কথায় প্রভাবিত না হয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশমতো চলা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ আমাদের সময়কে বলেন, সম্মেলনের আগের দিন পর্যন্ত, যে কোনো ধরনের চাপ মোকাবিলার সামর্থ্য সোহাগ জাকিরের আছে। একই বিষয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন আমাদের সময়কে বলেন, আমরা কোনো চাপে নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমরা সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকলেও আন্দোলনের পক্ষে সাংগঠনিক কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের ছিল না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে