শাহ আলম হত্যায় সৈকতও জড়িত

খুনের আগে ঘুমের ওষুধে অচেতন করে কণিকা

  শাহজাহান আকন্দ শুভ ও ইউসুফ সোহেল

২০ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:৩৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মাদারটেকে জনশক্তি ব্যবসায়ী মো. শাহ আলম ভুইয়ার খুনের ঘটনায় রোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসছে। খুনের ঘটনায় লাবনি আক্তার কণিকার পাশাপাশি নিহতের ছেলে সৈকত হাসান রাজও সরাসরি জড়িত। তাদের দুজনার পরিকল্পনাতেই চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শাহ আলম ভুইয়াকে দৈহিক সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে কণিকাদের বাসায় ডেকে নেওয়া হয়। এরপর কোকের সঙ্গে ঘুমের বড়ি মিশিয়ে তা খাওয়ানো হয় শাহ আলমকে। তিনি অচেতন হয়ে পড়লে সৈকত হাসান রাজ ও কণিকা রশি দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর লাগেজে ভরে লাশ ফেলা হয় রাস্তায়। এ খুনের ঘটনায় গত বুধবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন কণিকা। আর পুলিশের হাতে আটক সৈকত হাসান রাজও খুনের আদ্যোপান্ত বলে দিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি খন্দকার নুরুন্নবী বলেছেন, প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে কণিকা রাগে, ক্ষোভে এই হত্যাকা-ে জড়িয়েছেন। কারণ তাকে কয়েকবার যৌন নিগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। এর জের ধরেই ঘটনার সূত্রপাত। এখানে সৈকতের পরকীয়া খুনের মুখ্য কোনো কারণ নয়।

কণিকা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, তার নাম লাবনি হোসেন ইমু। মা-বাবা নেই। ছোটবেলা থেকেই মানুষ হন দাদা-দাদির কাছে। এসএসসি পরীক্ষা শেষে দাদির কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন উপহারস্বরূপ পান। এই মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই সৈকত হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নিহত শাহ আলমের ছেলে সৈকত হলেন কণিকার বান্ধবী নাসরিন জাহান মলির ভাই। কণিকার মোবাইল ফোনটি নষ্ট হলে সেটি ঠিক করাতে খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় সৈকতের দোকানে যান। সেখানেই পরিচয়ের একপর্যায়ে তারা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্কও হয়। তারা দুজন ঢাকার বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছেনও। এভাবে তাদের সম্পর্কের দেড় বছর পার হয়। একপর্যায়ে কণিকা জানতে পারেন সৈকতের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আছেন। বিষয়টি জানার পর সৈকতের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দেন কণিকা। একপর্যায়ে সৈকত তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে কণিকাকে বিয়ে করার আশ্বাস দিলে ফের তাদের সম্পর্ক জোড়া লাগে।

কণিকা জবানবন্দিতে আরও জানান, একদিন তিনি সৈকতদের বাসায় গেলে তার বাবা (নিহত শাহ আলম) যেচে কণিকার কাছ থেকে তার মোবাইল নম্বর নেন। বিষয়টি সৈকতকে জানালে ছেলের কাছ থেকেই তার বাবার চরিত্রগত সমস্যার বিষয়টি জানতে পারেন কণিকা। কিছুদিন পর সৈকতের বোন পলির ছেলের জন্মদিনে গিয়ে সৈকতদের বাসায় রাতে থেকে যান কণিকা। পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় সৈকতের বাবা কণিকাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে অশ্লীল মন্তব্য করেন। এরপর থেকে তাদের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। গত ১০ মার্চ পোল্যান্ডে যাওয়ার জন্য ঢাকা-নয়াদিল্লির বিমান টিকিট কনফার্ম করে ঢাকা এয়ারপোর্টে যান কণিকা। কিন্তু সৈকতের সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি না গিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে সৈকতদের গ্রামের বাড়ি খুলনার শরণখোলার বাগেরহাটে যান। একদিন সেখানে থেকে সৈকত ও তিনি ঢাকায় চলে আসেন। বিষয়টি জানাজানি হলে সৈকত ও তার বাবার মধ্যে ঝগড়া ও মারামারি হয়। কিছুদিন পর সৈকতের বিষয়ে জরুরি কথা আছে বলে বাসাবো সিনেমা হলের সামনে কণিকাকে যেতে বলেন। পরদিন বেলা ১১টার দিকে সেখানে গেলে সৈকতের বাবা কণিকাকে একটি বাসায় নিয়ে যান। সেখানে কণিকাকে যৌন হেনস্তার চেষ্টা করেন। বিষয়টি সৈকতকে জানালে তিনি কণিকাকে সায়েদাবাদে আসতে বলেন। সেখানে গেলে সৈকত নতুন দুটি মোবাইল ফোনের সিম দিয়ে তার বাবার সঙ্গে কণিকাকে যোগাযোগ রাখতে বলেন। ৮-৯ তারিখে ঢাকায় ফিরে এর একটা ফয়সালা করার কথাও বলেন সৈকত। এরপর গ্রামের বাড়িতে চলে যান সৈকত। এদিকে সৈকতের কথামতো তার বাবার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ চালিয়ে যান কণিকা।

কণিকা আদালতে জানান, একদিন সৈকতের বাবার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয় তার। এ সময় শাহ আলম একটি মোবাইল সিম দেন কণিকাকে। পরবর্তী সময় সেই সিম নম্বর থেকে তিনি একাধিকবার কণিকাকে কুপ্রস্তাব দেন। গত ৮ এপ্রিল দুপুর আড়াইটার দিকে সৈকত কণিকাদের বাসায় আসেন। তখন সৈকতকে সব কিছু খুলে বলেন এবং মোবাইলে তার বাবার পাঠানো বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল মেসেস দেখান কণিকা। এ সময় রাজ চরম উত্তেজিত হয়ে তার বাবাকে গালাগালি করতে থাকেন। একপর্যায়ে সৈকত বলেন, কণিকা যেন তার বাবাকে বলেনÑ বাসা খালি আছে, এখনই এক বোতল কোক নিয়ে যেন শাহ আলম কণিকার বাসায় আসেন। তখন মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে সৈকতের বাবাকে খালি বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানান কণিকা। রাজি হয় সৈকতের বাবা। রাজ আগে থেকেই কণিকাকে বলে রাখেন, কোকের বোতলে যেন তিনি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখেন। এরপর সৈকত কণিকার ঘরে লুকিয়ে থাকেন। কিছু সময় পর সৈকতের বাবা কণিকার ঘরে আসেন। ঢুকেই তিনি দরজা বন্ধ করে পরিধেয় বস্ত্র খুলে ফেলেন এবং কনডম পড়েন। তিনি কণিকার বক্ষে হাত দেন এবং তার বস্ত্র খোলার চেষ্টা করেন। এ সময় সৈকতের বাবাকে শান্ত করে কোকের বোতলে ঘুমের বড়ি মেশানো কোক খেতে দেন কণিকা। কোক খাওয়ার কিছুক্ষণ পর অশ্লীল কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়েন সৈকতের বাবা শাহ আলম। এ সময় সৈকত খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে কণিকার কক্ষের জানালায় থাকা একটি প্লাস্টিকের দড়ি দিয়ে তার বাবার গলায় পেঁচিয়ে টানতে থাকলে মারা যান শাহ আলম। তখন সৈকত ঘরে থাকা একটি পুরনো বড় লাগেজ খালি করে তার ভেতরে শাহ আলমের লাশ ভরেন। একটি সিএনজি অটোরিকশা আনতে বলেন কণিকাকে। পরে সৈকত ও কণিকা লাশভর্তি লাগেজটি সিএনজি অটোরিকশায় তোলেন। পরে অটোরিকশায় লাগেজসহ একাই নন্দিপাড়ায় যান কণিকা। সেখানে ৫শ টাকায় নয়াপাড়া পর্যন্ত আরেকটি সিএনজি অটোরিকশা ঠিক করেন। পরে সিএনজি অটোরিকশাটি কিছুদূর এগোলে আটকা পড়ে যানজটে। পরে পানি খাওয়ার কথা বলে কণিকা অটোরিকশা থেকে নেমে সটকে পড়েন বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে নিহতের মেয়ে মলি দাবি করেছেন, কণিকা আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তা বানোয়াট। তারা বলছেন, ঘটনার দিন তার ভাই সৈকত হাসান রাজ ঢাকাতেই ছিলেন না। এই ঘটনায় তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জড়ানো হয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে