খুনের পর মুক্তিপণ আদায় করে সিফাতের বন্ধুরা

স্কুলছাত্র অপহরণ হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বয়ান দুই ঘাতকের

  ইউসুফ সোহেল

২৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ০১:০৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাবিবুর রহমান সিফাত। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত মা-বাবার বাধ্যগত ছিলেন ১৭ বছরের এই কিশোর। অষ্টম শ্রেণিতে উঠতেই তার আচরণে আমূল পরিবর্তন লক্ষ করেন স্বজনরা। সবার অগোচরে ধীরে ধীরে ছেলেটি হয়ে ওঠেন ইয়াবাসেবী। শেষ পর্যন্ত সেই মরণ নেশাই গিলে খেল স্কুলছাত্র সিফাতকে। গত ৪ এপ্রিল মধ্যরাতে ডাকাতিয়া নদীতে (চাঁদপুর মোহনার অদূরে) বরিশালগামী পারাবত ৯-এর তৃতীয় তলার ২৩ নম্বর কেবিনে বন্ধুদের হাতে নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হয় এই কিশোর। ইয়াবার টোপ দিয়ে বন্ধুরা শুধু অপহরণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের আগেই তাকে ৪৫টি ঘুমের ওষুধে অচেতন করে পেট কেটে হত্যা করে। এর পর সিফাতের লাশ বস্তায় ভরে তারা ভাসিয়ে দেয় ডাকাতিয়া নদীতে।

সিফাত অপহরণের পর ১৪ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন তার বাবা মো. হারুনার রশিদ। এর ৩ দিন পর মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকা থেকে সিফাতের বন্ধু তাওহীদুল ইসলাম তামিমকে গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। এর পরদিন অর্থাৎ ১৯ এপ্রিল সকালে ঝালকাঠির নলছিটি এলাকা থেকে তামিমের বন্ধু মেহেদী হাসান নিহালকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তারা সিফাতকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। জানিয়েছে খুনের আদ্যোপান্ত। গত বৃহস্পতিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও হত্যাকা-ের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে সিফাতের দুই বন্ধু।

এদিকে ঘটনার ২০ দিনেও সিফাতের লাশের সন্ধান মেলেনি। ছেলের লাশের সন্ধানে এখন হন্যে হয়ে ঘুরছেন সিফাতের বাবা। গতকাল সোমবারও তিনি বরিশালের শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু ছেলের লাশ পাননি। ছেলের খুনিদের ফাঁসি দাবি করেন নিহতের বাবা হারুনার রশিদ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. জহিরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, নিহত সিফাত পরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকায় থাকে। একই থানা এলাকায় প্রেসিডেন্সিয়াল হাইস্কুল থেকে এবার এসএসসি পরিক্ষা দিয়েছিল সে। তার বন্ধু তামিম মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। ইয়াবার টাকা জোগাতে বন্ধু সিফাতকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করে তামিম ও নিহাল। গত ৪ এপ্রিল দুপুরে মোবাইল ফোনে সিফাতকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় তামিম। এর পর ইয়াবা খাওয়ানোর কথা বলে কাটাসুর এলাকা থেকে সিফাতকে নিয়ে যাওয়া হয় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। পারাবত-৯ লঞ্চের কেবিনে আগে থেকেই নিহাল ছিল। সেখানে ৩ বন্ধু মিলে আড্ডা দেওয়ার একপর্যায়ে শক্তিশালী ৪৫টি ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানীয় খাওয়ানো হয় সিফাতকে। ঘুমে অচেতন হয়ে পড়লে লঞ্চ ছাড়ার দেড় ঘণ্টা পর নিহালের বেল্ট দিয়ে সিফাতের পা বেঁধে তা চেপে ধরে তামিম। এর পর গামছা দিয়ে সিফাতের গলায় ফাঁস দিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে নিহাল। কেবিনে লাশ নিয়ে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে ধারালো কাটার দিয়ে সিফাতের পেট কাটে তারা। এর পর সিফাতের লাশ বস্তায় ভরে মুখ সেলাইয়ের পর রাত পৌনে ২টার দিকে চাঁদপুর মোহনার অদূরে লঞ্চ থেকে বস্তাটি ফেলে দেয় তারা। তামিম ও নেহাল বস্তা দুটি কেনে সদরঘাটের একটি দোকান থেকে। ঘুমের ওষুধ কেনে মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ মার্কেটের একটি দোকান থেকে।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, বন্ধুর লাশ নদীতে ফেলে দিয়ে ৬ এপ্রিল বিকালে সিফাতের মোবাইল ফোন থেকে তার বাবার কাছে ফোন করে তামিম বলে, সিফাতকে তারা কিডন্যাপ করেছে, তার মুক্তিপণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা দাবি করে তামিম ও নিহাল। অপরিচিত দুটি মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে তাতে দাবি করা টাকা বিকাশ করতে বলা হয় সিফাতের মা-বাবাকে। দুটি নম্বরে পৃথকভাবে ২ হাজার ও ২০ হাজার টাকাও পাঠায় সিফাতের স্বজনরা। তামিম বিকাশে পাঠানো টাকাগুলো মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রহণ করে। এর পর টাকার একটি ভাগ বিকাশের মাধ্যমেই নিহালের কাছে পাঠায় তামিম। এই ঘটনায় নিহতের স্বজনরা মামলা করলে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে মোহাম্মপুরের কাটাসুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তামিমকে। তার তথ্যের ভিত্তিতে ঝালকাঠির নলছিটি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নিহালকে। বিশাল নদীতে সিফাতের লাশ খুঁজে পেতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। তার পরও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে এসআই মো. জহির জানান।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে