বেহাল সড়কে শঙ্কিত ঈদযাত্রা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২০ মে ২০১৮, ০৮:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত কয়েক দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট ভয়াবহ। যানজটের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও রাস্তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গাড়ি চালাতে হচ্ছে ধীরগতিতে। ২০ বছরের আয়ুষ্কাল ধরে নির্মাণ করা মহাসড়কটি নষ্ট হয়ে গেছে দুই বছরের মাথায়। একই চিত্র ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে। অন্য মহাসড়কগুলোর অবস্থাও খারাপ।

এ রকম সারাদেশে দেড় হাজার কিলোমিটার সড়ক গাড়ি চলাচলের অযোগ্য। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) সাম্প্রতিক জরিপে এ চিত্র মিলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে রাস্তার ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশের অবস্থা বেহাল। মহাসড়কের ৫৭ শতাংশ ভালো হলেও সারাদেশে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, চলাচল অযোগ্য। চলমান বৃষ্টিপাত রাস্তার অবস্থা আরও নাজুক করে দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় এবার ঈদযাত্রা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অবশ্য ঈদযাত্রা মসৃণ করতে তৎপর বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ৮ জুনের মধ্যে দেশের সব রাস্তা মেরামতের কাজ শেষ করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে রাস্তাঘাট চলাচলের উপযোগী করতে প্রকৌশলীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে রাস্তা মেরামত অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। তবে সার্বক্ষণিক মনিটরিং চলছে। তাই ঈদের আগে যান চলাচলে অসুবিধা হবে না।

জানা গেছে, জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সড়কÑ এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে রাস্তাকে। সওজের প্রতিবেদনে খারাপ রাস্তা বলতে বোঝানো হয়েছে যেখানে পেভমেন্ট ভেঙে গেছে, সড়কে বড় বড় ফাটল ও খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। খুব খারাপ সড়ক মানে, সেখানে যান চলাচলে খুব সমস্যা হয়। এগুলো জরুরিভিত্তিতে মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সওজের অধীন ১০টি জোনের মধ্যে রাস্তা সবচেয়ে খারাপ বরিশালে। এ জোনের ৩২০ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা খুব খারাপ, যা এ জোনের প্রায় ৩০ শতাংশ রাস্তা। বরিশালের পর ‘খুব খারাপ’ তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে রাজশাহী জোন। এ জোনের ২০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়ক ‘খুব খারাপ’ অবস্থায় রয়েছে বলে এইচডিএমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জোনের ৫০৯ কিলোমিটার সড়কে জরিপ চালিয়ে ১০৫ কিলোমিটার ‘খুব খারাপ’ অবস্থায় পেয়েছে এইচডিএম। ‘দুর্বল’ ও ‘খারাপ’ অবস্থায় রয়েছে আরও ৬৫ কিলোমিটার সড়ক। এর বাইরে চট্টগ্রাম জোনের ৫১ কিলোমিটার, কুমিল্লা ৮৬, ঢাকা ৮৮, গোপালগঞ্জ ৫১, খুলনা ১২৩, ময়মনসিংহ ৭৭ ও সিলেট জোনের ৫৯ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক ভাঙাচোরা দশায় রয়েছে।

গত বন্যায় ও অতিবর্ষণে দেশের ২২ জেলার ৬২ স্থানে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক বিলীন হয়ে যায়। ৬৭ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক বন্যায় তলিয়ে যায়। পাঁচ হাজার ১১৫ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগের চেয়ে উন্নতি হলেও সড়ক-মহাসড়কের এক-চতুর্থাংশই এখনো ভাঙাচোরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক ভাঙার জন্য অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত ওজনবাহী যান চলাচলই দায়ী নয়। নির্মাণেও বড় ধরনের গলদ রয়েছে। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের অভিযোগ সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মহাসড়কে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কিন্তু ঠিকাদাররা ব্যবহার করেন ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন। নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে গরমে তা গলে যায়। এ কারণে সড়কে গর্ত ও ফাটল দেখা দেয়।

সড়ক-মহাসড়ক ভাঙার আরেকটি কারণ সক্ষমতার অতিরিক্ত ভারী যানবাহন। তা ছাড়া মহাসড়ক ভাঙার কারণ বিকল্প সড়ক না থাকা। পিচ ঢালাইয়ের ৪৮ ঘণ্টা ‘কিউরিং টাইম’ রাখতে হয়। এ সময়ে সড়কে যান চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বিকল্প সড়ক না থাকায় বাংলাদেশে নির্মাণের পরই রাস্তা খুলে দিতে হয় যান চলাচলের জন্য। এ নিয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, মহাসড়ক টেকাতে হলে এক্সেল লোড নীতিমালা বাস্তবায়ন করতেই হবে।

জানা গেছে, সওজের অধীনে সারাদেশে প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক রয়েছে। এর মধ্যে সারাদেশের ১৭ হাজার ৯৭৬ কিলোমিটার রাস্তা জরিপ করে এইচডিএম। জরিপের ভিত্তিতে ২০১৭-১৮ সালের প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাঙাচোরা সড়ক মেরামত, পুনর্নির্মাণে আগামী পাঁচ বছরে প্রয়োজন ২১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে প্রয়োজন ১৫ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। এইচডিএমের আগের বছরের প্রতিবেদনে ১২ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে চলতি অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দ এক হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম দেওয়ায় রাস্তা আরও খারাপ হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক উদ্বোধন করা হয় ২০১৬ সালের ২ জুলাই। মহাসড়কের আয়ুষ্কাল ২০ বছর। কিন্তু এখনই এসব রাস্তা খারাপ হয়ে গেছে। এ নিয়ে বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলছেন, নির্মাণত্রুটি ছাড়া দুই বছরে রাস্তা ভাঙার কারণ নেই। আর সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাকের ওজন বহনের ক্ষমতা ১৫ টন, মালিক-শ্রমিকদের দাবির মুখে ২২ টন পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চলছে ৫০ টন মালামাল নিয়ে। তাই সড়ক টিকছে না।

সওজের এইচডিএমের জরিপ করা ১৭ হাজার ৯৭৬ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়কের মধ্যে এক হাজার ৫৪৩ দশমিক ২ কিলোমিটারের অবস্থা খুবই খারাপ। এক হাজার ৭৩ কিলোমিটারের অবস্থা খারাপ। গত বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৪০ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা ছিল খুব খারাপ। এবার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে চলাচল অযোগ্য রাস্তার পরিমাণ। গত বছরে খারাপ রাস্তার পরিমাণ ছিল এক হাজার ৯০০ কিলোমিটার। চলতি বছরে তা কমে হয়েছে এক হাজার ৭৩ কিলোমিটার।

এইচডিএমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশের ৯ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা ভালো, যা জরিপকৃত সড়কের ৫৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তিন হাজার ৬০৪ কিলোমিটারের অবস্থা মোটামুটি। দুই হাজার ১১৫ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা দুর্বল।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে