আবর্জনায় এত মধু!

  গোলাম সাত্তার রনি ও ইউসুফ সোহেল

২১ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ মে ২০১৮, ১৩:৫৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ময়লা-আবর্জনা তথা গারবেজ (উচ্ছিষ্ট বর্জ্য) দিন দিন মূল্যবান হয়ে উঠছে। একসময় সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের (সিএবি) নিয়োগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে সব ধরনের বর্জ্য অপসারণ (ক্লিনিং) করত। এখন সেই বর্জ্য অপসারণে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে উল্টো অর্থ দেওয়া হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে- কী মধু আছে এই বর্জ্য। এ ছাড়াও বর্জ্য অপসারণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর স্থানে চলাচলের কারণে হুমকিতে নিরাপত্তাও।

দেশের অপর ২ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর- চট্টগ্রাম শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের ময়লা-আবর্জনা অপসারণের কাজ নিজস্ব জনবল দিয়ে করা হয়ে থাকে। জনবলের পেছনে প্রতিমাসে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের বেতনভাতাও।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে বিমানবন্দরের শৌচাগার, ময়লার ঝুড়ি এবং কার্গো গুদামের আবর্জনার স্তূপ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৯৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করে শুল্ক বিভাগ এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ গভীর রাতে শাহজালাল বিমানবন্দরের ময়লা-আবর্জনা রাখার ঝুড়ি থেকে দেড় কোটি টাকা মূল্যের ৩ কেজি ওজনের ৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়। এই চালানের ময়লার ঝুড়ির বর্জ্যরে সঙ্গে পাচার করার পরিকল্পনা ছিল।

এর আগে ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরের বর্জ্য থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এই স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাবেক ক্লিনিং প্রতিষ্ঠান নাহিদ ট্রেডার্সের কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অংশীদার নুরুল ইসলামকে এক মাসের কারাদ- ও জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়েক বছর আগে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে বছরে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বর্জ্য অপসারণ করত নাহিদ ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তখন দৈনিক যে পরিমাণ বর্জ্য হতো, এখন পরিমাণ সামান্য বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে টাকাও কয়েকগুণ। শাহজালাল বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণে সিএবিকে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে মাস কয়েক আগে কাজ নিয়েছে ক্রাউন প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিডিএল) নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের মালিক আলম হায়দার মিঠু। গত বছর ১ আগস্ট থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ করছে সিপিডিএল। এরই মধ্যে এর কর্মীদের বিরুদ্ধেও উঠতে শুরু করেছে নানা অভিযোগ। গত ১৭ এপ্রিল শাহজালাল বিমানবন্দরে অবৈধ পাস নিয়ে সন্দেহজনক ঘোরাফেরার সময় আটক হয় সিপিডিএলের কর্মকর্তা জুবায়ের। তাকে ৭ দিনের কারাদ- দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত ৯ এপ্রিল বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকায় অনুপ্রবেশের দায়ে গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক হন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার আবু তালেব বাবু ও সুপারভাইজার আজিজুর রহমান। সিপিডিএল ক্লিনিংয়ের কাজ নেওয়ার পর রেকর্ডসংখ্যক স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে বিমানবন্দরের বর্জ্য ও বর্জ্য রাখার পাত্র, এমনকি শৌচাগার থেকেও। কেন বর্জ্যরে ভেতর থেকে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে গেল, তা নিয়েও রহস্য ও প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহীদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে টাকা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণ করছে বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। ময়লা পরিষ্কার করার জন্য যেখানে টাকা পাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো টাকা পরিশোধ করে বর্জ্য অপসারণ করার বিষয়টি রহস্যজনক। বিভিন্ন সময় আমরা বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজের শৌচাগার, ময়লার ঝুড়ি, ট্রলির নিচে বা কার্গো গুদামের উচ্ছিষ্ট থেকে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ, মাদকদ্রব্যসহ নানা ধরনের পণ্য উদ্ধার করেছি। বর্জ্য ও বর্জ্য রাখার পাত্র থেকে এসব সোনার চালান জব্দ করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, সোনা চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে বিমানবন্দরে কর্মরত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য অপসারণকারীরা (ক্লিনার) জড়িত। ফলে ময়লার সঙ্গে স্বর্ণসহ মূল্যবান কোনো কিছু সরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বর্জ্য অপসারণকারী প্রতিষ্ঠান কী স্বার্থে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে বর্জ্য নিচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হবে। এখন থেকে তাদের কার্যক্রমও গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবে বলে জানান তিনি।

বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, বিমানবন্দরের ভেতরে বারবার স্বর্ণের চালান ধরা পড়ায় কৌশল পাল্টেছে চোরাকারবারিরা। ভেতর থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ময়লার গাড়ি বের করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণের নামে গারবেজ অপসারণ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা স্বর্ণ পাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।

শাহজালাল বিমানবন্দরে অর্থ নিয়ে বর্জ্য অপসারণ করা হলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মানের দেশের অন্য দুটি বিমানবন্দর চলছে ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। চট্টগ্রামের শাহ আমানত ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরের ম্যানেজার উইং কমান্ডার সরোয়ার ই জামান আমাদের সময়কে বলেন, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তারা অপসারণ করছেন বিমানবন্দরের বর্জ্য। অভিন্ন মন্তব্য করেন সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার (ভারপ্রাপ্ত) সাইফুল আলমও।

সিভিল এভিয়েশনের পরিচালক (এরোয়েটিএস) নুরুল ইসলাম বলেন, ময়লা অপসারণের জন্য উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করা হয়। যে প্রতিষ্ঠান সিভিল এভিয়েশনকে সবচেয়ে বেশি টাকা দেবে, আমরা তাদেরই কাজ দেব। এই কাজের আড়ালে তারা যেন কোনো অপকর্ম করতে না পারে এই বিষয়ে আমরা সচেষ্ট রয়েছি।

উল্টো প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ টাকা দিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে জানতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে হাইকোর্টে একটি রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান। রিট পিটিশন নম্বরÑ১১৮১০/১৫। এর পরিপ্র্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের ময়লা নিষ্কাশনের জন্য ইজারাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আহ্বানকৃত খোলা দরপত্র কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে তখন রুলও জারি করেন হাইকোর্ট। জনস্বার্থে দায়ের করা ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে রুলে বিমানবন্দরের বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য কেন বিশদ নির্দেশনা প্রণয়ন করা হবে না, তা-ও জানতে চান আদালত।

হাইকোর্টে রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান আমাদের সময়কে বলেন, সাধারণত টাকা দিয়ে আমরা ময়লা পরিষ্কার করাই। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরের ময়লা পরিষ্কারের জন্য উল্টো টাকা নেওয়া হচ্ছে। বর্জ্য অপসারণকারী প্রতিষ্ঠান যেহেতু টাকা দিয়ে ময়লা অপসারণ করছে, তাই বিনিয়োগ করা টাকা লাভসহ উঠিয়ে আনার চেষ্টা করবেন সংশ্লিষ্টরা। টাকা উঠিয়ে আনতে না পারলে ময়লা দিয়ে ব্যবসার পাশাপাশি তারা যে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করবেন না, তার নিশ্চয়তা আদৌ আছে কি? ময়লা পরিষ্কারের কাজ করতে ৫ লাখ টাকার ইজারার পরিমাণ এখন যদি প্রায় ৪০ টাকা হয়, তা হলে বিষয়টি সত্যিই চিন্তার এবং সন্দেহজনক। তা ছাড়া সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বর্জ্য অপসারণ না করার কারণে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। এখন পর্যন্ত রিটটি নিষ্পত্তি হয়নি। অচিরেই এ বিষয়টি আদালতের নজরে আনব এবং রিটের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

৫ লাখ থেকে লাফিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণের কাজ নেওয়ার বিষয়ে সিপিডিএলের ম্যানেজার আবু তালেব বাবু বলেন, ৪০ লাখ নয় এই কাজ পেতে আমাদের ৭০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। গারবেজ থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক, কাচজাতীয় দ্রব্যসহ নানা উচ্ছিষ্ট সামগ্রী বিক্রি করে এই টাকা উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই বর্জ্যরে আড়ালে কোনো অবৈধ মালামাল চোরাচালান হয় কিনাÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রতিটি বর্জ্য অপসারণের গাড়ি একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও এপিবিএনের সদস্যরা পরীক্ষার পর অনুমতি মিললে তবেই বিমানবন্দর থেকে বের হয়।

তবে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু ইউসুফ বলেন, বর্জ্য অপসারণের ম্যাজিস্ট্রেটরা গাড়ি পরীক্ষা করেন, বিষয়টি সত্য নয়।

গত ১৩ মে দুপুরে বিমানবন্দরের রানওয়ের এয়ার সাইট থেকে ট্রাকে করে উড়োজাহাজের বর্জ্য নিয়ে আসা সিপিডিএলের ক্লিনার আলহাজ হোসেন বলেন, তাদের এই বর্জ্যরে ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো-ন ১৭-৫৪-৪৩) দিয়ে কোনো সংস্থার পরীক্ষা ছাড়াই বিমানবন্দরের ভেতর থেকে তারা বর্জ্য নিয়ে এসেছেন।

শাহজালাল বিমানবন্দরের বিএফসিসি গেটসংলগ্ন ময়লা সংরক্ষণাগারে (ডাস্টবিন) ১৩ মে দুপুরে কথা হয় সিপিডিএলের বর্জ্য অপসারণ প্রকল্পের সুপারভাইজার মো. হারুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে দিন-রাত তারা ২২ জন কাজ (দিনে ১৮ ও রাতে ৪ জন) করছেন। রানওয়ের এয়ার সাইটে সুপারভাইজার হিসেবে আছেন আনোয়ার হোসেন। বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজে জমা হওয়া বর্জ্যগুলো কালো পলিথিনে ভরে প্রথমে জমা করা হয় রানওয়ের পাশে, পরে ৮ নম্বর গেট দিয়ে দুটি বর্জ্যরে ট্রাক বের করে আজিমপুর ও গাবতলীর ডাম্পিংয়ে ফেলা হয়। এর আগে ময়লা থেকে বাছাই করে বিক্রিজাত দ্রব্যগুলো আলাদা করা হয়। পরে সেগুলো বিক্রি করা হয়। ময়লা থেকে সংগ্রহ করা উচ্ছিষ্ট ভাঙাড়ি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা পরিশোধ করা সম্ভব কিনাÑ এমন প্রশ্নে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

এপিবিএনের অধিনায়ক মো. রাশেদুল ইসলাম খান আমাদের সময়কে বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিনই বিভিন্ন দোকানপাট, রেস্টুরেন্টের ময়লা ও বিভিন্ন এয়ারলাইনসের মলমূত্র ট্রাকে করে বাইরে আনে সংশ্লিষ্ট বর্জ্য অপসারণকারী প্রতিষ্ঠান। রাতদিন বিমানবন্দরের ৮ নম্বর হ্যাঙ্গার গেট দিয়ে বের হচ্ছে তাদের ট্রাক। কিন্তু ভেহিকল স্ক্যানার না থাকায় ওই গেটে ময়লার গাড়ি চেক করা সম্ভব হয় না। ফলে চোরাকারবারিরা সদর দরজা দিয়ে সোনা বা মূল্যবান সামগ্রী পার না করে বর্জ্যরে মাধ্যমে উল্টো পথে পাচারের কৌশল অবলম্বন করতে পারে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে