শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগে উত্তেজনা

  নিজস্ব প্রতিবেদক ও শেরপুর প্রতিনিধি

২১ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ মে ২০১৮, ০৯:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে প্রত্যাহার এবং শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফজলুল হক চাঁনসহ পাঁচ নেতাকে বহিষ্কারের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে শেরপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এ ঘটনায় স্পষ্টত দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। মূলত জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা এবং স্থানীয় রাজনীতিতে আধিপত্যের জের ধরেই এ বিভক্তি।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে প্রত্যাহার এবং শেরপুর-৩ সাংসদ ও নেতাদের বহিষ্কারের মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছে শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগ। যদিও আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা আওয়ামী লীগ এটি পারে না।

অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও হুইপ আতিউর রহমান আতিকের সমর্থকদের নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একাট্টা হয়ে মাঠে নেমেছেন মতিয়া চৌধুরী ও ফজলুল হক চাঁনের সমর্থকরা। তারা আতিকের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন এবং তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও হুইপের পদ থেকে অপসারণের দাবিতে ঝাড়– মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, জেলা কমিটি কেন্দ্রের অনুমোদন ছাড়া কোনো নেতাকে বহিষ্কার বা প্রত্যাহার করতে পারে না। শেরপুর জেলার নেতারা যা করেছেন, সেটি দলের সিদ্ধান্তের পরিপন্থী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার বিকালে। শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম থেকে মতিয়া চৌধুরীকে প্রত্যাহার এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শামছুন্নাহার কামাল, নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিয়াউল হক মাস্টার, সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলুল হক ও নকলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম জিন্নাহকে বহিষ্কার করা হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলার সভাপতি আতিউর রহমান আতিক। শনিবার বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত শহরের চকবাজারের দলীয় কার্যালয়ে শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার পাল। ওই সভায় মতিয়া চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকা নালিতাবাড়ী উপজেলা কমিটির সব কার্যক্রম স্থগিত করারও সিদ্ধান্ত নেন জেলার নেতারা। এ সময় নকলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করে প্রথম যুগ্ম সম্পাদক বোরহান উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় সভা থেকে। সভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সভার এসব সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানানো হয়। সভায় কার্যনির্বাহী কমিটির ৭১ সদস্যের মধ্যে ৫২ জন উপস্থিত ছিলেন বলেও জানানো হয়।

জেলা আওয়ামী লীগের ওই সভার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার রাতেই নকলায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দলের নির্দেশ অমান্য করে হুইপের কথায় জেলা আওয়ামী লীগের একপেশে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় পর দিন রবিবার দুপুর ২টায় জেলা সদরের খরমপুরের জেলা আওয়ামী লীগের একাংশের অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে লিখিত বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর রুমান। তিনি বলেন, হুইপ আতিক বিপুল অর্থের বিনিময়ে ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশ কাটিয়ে রাজাকারদের সন্তানদের নিয়ে একটি পকেট কমিটি করেছেন। যার প্রতিকারের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি রিভিউ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছে, যা বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে আছে। সংবাদ সম্মেলন শেষে ঝাড়– মিছিল করা হয় এবং হুইপের কুশপত্তলিকা দাহ করা হয় ও আতিকের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেন সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা। এ সময় অন্যদের মধ্যে জেলার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানোয়ার হোসেন ছানু, জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম আধার, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামছুন্নাহার কামাল, জেলা যুবলীগ সভাপতি হাবিবুর রহমান, জেলা যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক ফারহানা পারভীন মুন্নি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিউর রহমান আতিক জানান, যাদের বহিষ্কার করার ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের বারবার শোকজ করলেও তিন মাসেও জবাব দেননি এবং দলীয় কার্যক্রমে অংশ নেননি। তাই তাদের বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে, এখন কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মতিয়া চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি গতরাতে আমাদের সময়কে বলেন, এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, কোনো জেলা কিংবা থানা কমিটি কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়া কাউকে বহিষ্কার করতে পারে না। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একটি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন কেন্দ্রে। গত বছর ১ মার্চ ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে যদি কাউকে বহিষ্কার করার প্রয়োজন হয়, তা হলে বিষয়টি কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠাতে হবে। কাউকে বহিষ্কারের এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের।’ আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগ কাউকে বহিষ্কারের ক্ষমতা রাখেন না; তারা কেবল কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করতে পারেন। সিদ্ধান্ত নেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে