গাড়ির হেলপার নুরুল এখন শতকোটি টাকার মালিক

  হাসান আল জাভেদ

০৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৩ জুন ২০১৮, ১১:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  টেকনাফ থেকে

০৩ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৩ জুন ২০১৮, ১১:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নুরুল হুদা। একদা ছিলেন গাড়ির হেলপার। লোকজন ডাকত নুরা বলে। অপর পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ছোট দুজনকে নিয়ে নাফ নদীতে জাল ফেলতেন তাদের বাবা। তিনজন পরের জমিতে

লবণ শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু যাদের জমিতে কামলা দিতেন, কয়েক বছরের মাথায় ইয়াবা ব্যবসার বদৌলতে সেই জমিই কিনে নেন নুরুল হুদা। মহাসড়কের ধারে গড়ে তোলেন দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। তার পর একেক ভাইয়ের জন্য বানান একেকটি প্রাসাদ। ওঠাবসা করেন এমপি, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে। পরে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পদে নির্বাচন করেন। দলীয় মার্কা না থাকলেও অর্থ আর ক্ষমতাসীনদের সমর্থনে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে বনে যান নেতা। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদ ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার হন নুরুল হুদা।

স্থানীয় এবং বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এককালের সেই হেলপার নুরা আজ শতকোটি টাকার মালিক। হ্নীলার টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কের পাশেই তাদের ছয় ভাইয়ের নামে ৬টি নান্দনিক বাড়ি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে তাদের বাড়ির সংখ্যা ১৪। টেকনাফের হোছ্যারখালের উত্তর পাশে, হ্নীলা আলীখালী, লেদাবাজার এলাকায় হুদার নিজেরই তিনটি বাড়ি। নিজে বসবাস করেন পুরান লেদায়। ফ্ল্যাট আছে চট্টগ্রামে। তবে হ্নীলার দমদমিয়া বিজিবি চেকপোস্টঘেঁষে সবচেয়ে ব্যয়বহুল পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করেন ছোট ভাই নূর মোহাম্মদ। ২০১৪ সালে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন নূর মোহাম্মদ।

গতকাল সরেজমিন গিয়ে কাজ চলতে দেখা যায় নূর মোহাম্মদের বাড়িতে। এ ছাড়া হ্নীলা লেদায় শত একর জমি কিনে নিয়েছে এই ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেড নুরুল হুদা। তবে আসামি থাকা অবস্থায়ই ২ কোটি টাকা ব্যয় এবং ক্ষমতার জোরে মেম্বার নির্বাচিত হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হ্নীলার জাদিমুড়া থেকে খারাংখালী এলাকা পর্যন্ত নাফ নদীর দুই পাশে ইয়াবার সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন নুরুল হুদা। জাদিমোড়া, নয়াপাড়া, মোচনী, লেদা, রঙ্গীখালী, নাটমোড়া পাড়া, হ্নীলা সদর, ওয়াব্রাং ও খারাংখালী পয়েন্ট হয়ে প্রতিদিন মিয়ানমার থেকে তার নামে ইয়াবার চালান আসত। সন্ধ্যার পর এসব খোলা বিলে লোকজনের উপস্থিতি না থাকায় ইয়াবা চোরাচালানের একটি অন্যতম রুটে পরিণত হয়। তার কর্মতৎপরতায় তুষ্ট হন স্থানীয় জননেতা আবদুর রহমান বদি। ফলে বদির ঘনিষ্ঠজন হয়ে ওঠেন নুরুল হুদা। বদির আশীর্বাদে নুরুল হুদার ছেলে নুরুল আলম ফাহিম হ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি বনে যান। অবশ্য গত ৩১ মে ফাহিম গ্রেপ্তার হন।

২০১৪ সালে ভাই নিহত হওয়ার সময় গ্রেপ্তার হন নুরুল হুদাও। ছাড়া পেয়ে আবার জড়িয়ে পড়েন আগের ব্যবসায়। নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড ও লেদার নন-রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নারী, শিশুদের ব্যবহার করে ইয়াবার চালান নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ছাড়া পাহাড়ি পান-সুপারির গাড়ি, লবণের কাভার্ডভ্যান, শুঁটকি ও কাঁচামাছের গাড়ি এবং পুরনো পরিবহন বন্ধুদের দিয়ে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে আসছেন।

পুলিশ জানায়, নুরুল হুদা হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সরওয়ার কামাল হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। তিনি ও তার সব ভাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন-পুরনো সবকটি তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী। নির্বাচনে প্রতিপক্ষ মেম্বারপ্রার্থী মোহাম্মদ আলীর মা ছবুরা খাতুনের ওপর হামলা করেন। ইয়াবাসহ এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা রয়েছে। ২০১৬ সালের ১১ মার্চ থানা পুলিশ তার লেদার বাড়িতে গিয়ে গ্রেপ্তার করে। হাতকড়া পরিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করার সময় হঠাৎ পুলিশের ওপর ইটপাটকেল, লাঠিসোটা, রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে আত্মগোপনে থেকে মেম্বার নির্বাচিত হলেও শপথ নিতে পারেননি। পরে ২০১৬ সালে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে শপথ গ্রহণের চেষ্টা করেন। অবশ্য এক সরকারি কর্মকর্তা বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে শপথ পড়ার ব্যবস্থা করান।

পুলিশ জানায়, এরা পারিবারিকভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ী। দ্বিতীয় ভাই শামসুল হুদা যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। নুরুল কবির, সরওয়ারসহ অন্য ভাইরাও ফেরার। তবে নুরুল হুদার সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীর যোগাযোগ থাকলেও মোবাইলে আড়িপাতার যুগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে খুঁজে পাচ্ছে না।

টেকনাফ থানার ওসি রনজিত বড়–য়া বলেন, নুরুল হুদাসহ তার সব ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় মামলা আছে। সে গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক আগে থেকেই ফেরার। আমরা তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে