জামায়াত গেলে যাক

জোট ছাড়া প্রসঙ্গে বিএনপির মনোভাব

  নজরুল ইসলাম

০৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৮, ০৮:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

আগের কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থিতা নিয়ে জামায়াতের দরকষাকষিতে অসন্তুষ্ট বিএনপি। তখন থেকেই জোটের প্রধান দুই শরিকের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়। এবার সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণায় তাদের ‘বাড়াবাড়ি’ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। বিষয়টি নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এমনই বিরক্ত যে, জামায়াত জোট ছেড়ে গেলে বিএনপি বরং খুশিই হবে। দলের অধিকাংশের ভাষ্য, ‘তারা চলে গেলে চলে যাক।’

বিএনপির শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতা এবং সাধারণ নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন মনোভাব জানা গেছে। দলটির কাছে খবর, জামায়াতের বড় একটি অংশের সঙ্গে সরকারের গোপন সম্পর্ক আছে।

সিলেটে জামায়াতের প্রার্থিতা বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস আমাদের সময়কে বলেন, জামায়াত বাড়াবাড়ি করছে। তারা যা করছে তা ঐক্য বোঝায় না, ঐক্য থাকে না। তিনি বলেন, ঐক্য ভাঙার দায়িত্ব জামায়াত নিতে পারে, তারা তা করতেই পারে। ২০০৮ সালে জামায়াতের চাপে নির্বাচনে যেতে হয়েছিল, তার ফল এখনো ভোগ করতে হচ্ছে বিএনপিকে।

মির্জা আব্বাস ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, যখন দেশ থেকে একটি বোঝা দূর করতে আন্দোলন চলছে, সেখানে নতুন সমস্যা তৈরি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য ও এক যুগ্ম মহাসচিব মনে করেন, জামায়াত নিয়ে অনেক হয়েছে; ওরা যদি যেতে চায় চলে যাক। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক থাকুক- এটা ভারতসহ পশ্চিমা দেশগুলোও চায় না। কারণ, ভারতের ধারণা; এটা পাকিস্তানপন্থি দল। সম্প্রতি ভারত সফরকালে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ে কর্তাব্যক্তিদের সফরেও জামায়াতের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে।

গত বছর চারেক ধরে জামায়াত ও বিএনপির তেমন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন নেই। বিএনপির যেমন গাছাড়া ভাব রয়েছে, জামায়াতের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলার চেষ্টাও দূরত্ব তৈরি করেছে।

সিলেটে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আরিফুল হককে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় জামায়াত

তাদের সিলেট জেলা আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে প্রার্থী ঘোষণা দেয়। নির্বাচনের মাঠে তিনি সক্রিয় আছেন এখন পর্যন্ত।

জানতে চাইলে এহসানুল মাহবুব আমাদের সময়কে বলেন, শেষ পর্যন্ত তিনি মাঠে থাকবেন। তার প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের সুযোগ নেই। এতে জোটের ক্ষতি হবে না। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও ৫টি আসন দুই জোটের জন্য উন্মুক্ত ছিল। তখনও সমস্যা হয়নি। এটি পারস্পরিক বোঝাপাড়ার বিষয়। আর মূলত জোট হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের জন্য।

বছর দুয়েক আগে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়েও জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনকেন্দ্রিক ঝামেলা তীব্র হয়। এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত মাঠে না থাকায় ক্ষুব্ধ ছিল নেতাকর্মীরা।

সবকিছু মিলিয়ে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সংগঠন জামায়াত জোট ছাড়তে চাইলে তাদের ‘ধরে’ রাখতে কোনো চেষ্টা করবে না বিএনপি। জামায়াত ছাড়া অন্য শরিক দলের মত একই রকম।

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন জামায়াতের প্রার্থিতা নিয়ে বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে আমাদের সময়ের কথা হয়। সবাই স্পষ্ট করে বলছেন, জামায়াতের কারণে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি তারা অনেক আগেই অনুধাবন করেছেন। কিন্তু জোটের ঐক্যের কারণে কিছু বলা যায়নি।

কয়েকদিন ধরে দলের সিনিয়র নেতাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আসে। স্থায়ী কমিটির দুই নেতা তো দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বলেছেনই, জামায়াতকে ছেড়েই দেন। আর কত।

দলটির একাধিক নেতার ভাষ্য, দেশ ও দেশের রাজনীতি একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ। এই সময়ে জামায়াত নানা ইস্যুকে সামনে এনে তারা সেই ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিএনপির নেতাদের ধারণা, ‘সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক’ তৈরি করে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থায় রাখতেই জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এসব করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের প্রতিক্রিয়াশীল অংশের মতামতে জামায়াতকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে বিএনপি। ওই সময়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নেতারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ওই নির্বাচনে জয়লাভ করে জামায়াতের আমির রাজাকার মতিউর রহমান চৌধুরী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রী বানানো হয়। এ নিয়ে বিএনপিকে ঘরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

বিএনপিতে এখন বলাবলি হচ্ছে, দেশে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জামায়াত-ই বড় বাধা। তারা যুদ্ধাপরাধীদের দল। তাই তাদের সঙ্গে থেকে কেউ ঐক্য করতে চাইছে না।

দলটির নেতারা বলেন, ২০০১ সালে চারদলীয় জোট গঠনের পর জামায়াত তাদের আসল রূপ প্রকাশ করে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল, বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর হামলা নির্যাতনসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকা-ে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদের অত্যাচারে কোথাও কোথাও বিএনপিও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। জামায়াত যে একটি সুবিধাবাদী দল সেটা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় ওয়ান-ইলেভেনের সময়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলে জামায়াতের কাছে বিবৃতি চাইলে তখন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান তৎকালীন বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিবের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। বলেন, দুর্নীতি করবেন আপনারা, বিবৃতি আশা করেন কীভাবে?

বিএনপির শীর্ষ নেতারা জানান, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তাদের ভূমিকা ছিল অপ্রত্যাশিত। ওই নির্বাচনে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া না যাওয়ার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। সেবারও আলী আহসান মুজাহিদ খালেদা জিয়ার সঙ্গে এক বৈঠকে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কাগজ-কলম ছুড়ে ফেলে খালেদা জিয়াকে মুজাহিদ বলেছিলেন, আপনি নির্বাচনে না গেলেও জামায়াত নির্বাচনে অংশ নেবে। জামায়াত ও প্রতিক্রিয়াশীল কিছু বুদ্ধিজীবীর চাপে ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে খালেদা জিয়ার পরাজয়ের আশঙ্কা সঠিক হয়।

দলটির নেতারা মনে করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একই প্র্যাকটিস শুরু করেছে জামায়াত। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের আন্দোলনের জন্য বিএনপি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। বিএনপি নেতাদের আশঙ্কা, তারা নির্বাচনের আগে যে আন্দোলনের কথা ভাবছেন, সেই আন্দোলনে জামায়াত যাবে না। সরকারের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে তারা নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
ashomoy-todays_most_viewed_news