নিধিরাম সর্দার ইউজিসি

ছয় বছরেও আলোর মুখ দেখেনি উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন

  এম এইচ রবিন

১৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৮, ১৩:৫৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারছে না বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) গঠন করার কথা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁদে পড়েছে এই কমিশন আইনের খসড়া। নির্বাহী ক্ষমতাহীন কমিশনের অবস্থা তাই ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’-এর মতো হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে মানসম্পন্ন ও সময়োপযোগী উচ্চশিক্ষার বিকল্প নেই। তিনি ইউজিসির সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এটি আরও শক্তিশালী করার ওপর তাগিদ দেন। তার সেই তাগিদ এ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

জানা গেছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব আইনে পরিচালিত হয়। পাশাপাশি ইউজিসিও তদারকি করে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পৃথক আইনে পরিচালিত হয়। উচ্চশিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়ন, নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সর্বোপরি দুর্নীতি বন্ধে অভিভাবক হিসেবে ইউজিসি গঠিত হলেও নিজস্ব প্রায়োগিক ক্ষমতার অভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুনর্গঠন করে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। আইনের প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার চাহিদা নিরূপণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতি-নির্ধারণে সক্ষম হবে এই কমিশন। খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছিল, কমিশন থাকবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরাধীন। কমিশনের চেয়ারম্যান পাবেন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা। কিন্তু নতুন কমিশন হলে সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে, না প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীন কাজ করবে, এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে শিক্ষা প্রশাসনে। এইচইসি নামে আইনের খসড়াটি প্রায় ছয় বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। আইনের খসড়া ২০১৩ সালে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করার পর আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ফেরত দেয় মন্ত্রিসভা। এর পর আর আলোর মুখ দেখেনি ওই ফাইল।

ইউজিসির এক সদস্য জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আইন বাস্তবায়ন, নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতি বন্ধে ইউজিসির নিজস্ব ক্ষমতা নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে ইউজিসি তদন্ত ও এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সুপারিশ দাখিল করেই গুরু দায়িত্ব শেষ করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাঝে-মধ্যে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ে, কার্যত এর কোনো বাস্তবায়ন নেই।

তিনি বলেন, বর্তমানে ইউজিসির দায়িত্ব হচ্ছে এক বা একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর ভবন, হল, গ্রন্থাগার, পরীক্ষাগার, যন্ত্রপাতি, সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত পরীক্ষা, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিদর্শন করা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ প্রদান করা।

ইউজিসির সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষাবিদ অধ্যপক ড. মোজাম্মেল হক খান। তিনি বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দুর্নীতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে।

ইউজিসির ১৯৯৮ সালের সংশোধনী মোতাবেক বর্তমানে একজন চেয়ারম্যান, ৫ জন পূর্ণকালীন সদস্য এবং ৯ জন খ-কালীন সদস্যের সমন্বয়ে গঠন করা হয় কমিশন। কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বপ্রথম ১৯৭৩ সালে। প্রতিষ্ঠালগ্নে মাত্র ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখন সরকারি ৪০টি এবং বেসরকারি ১০১টিসহ মোট ১৪১টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে দেশে।

উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন কবে নাগাদ চূড়ান্ত হবে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন আমাদের সময়কে জানান, আইনটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আশা করি শিগগির মন্ত্রিসভায় পাঠানো যাবে।

কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান আমাদের সময়কে বলেন, ইউজিসি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৩ সাল আর ২০১৮ সালের প্রেক্ষাপট এক নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সার্বিক তদারকির জন্য ইউজিসির প্রচলিত কর্মপরিধির বিস্তৃতি এবং ক্ষমতায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি।

অন্তহীন সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টি, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও অর্থ কমিটির সভা নিয়মিত হয় না। মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আইন অনুযায়ী স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করেনি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। এখনো ভাড়া বাড়িতে, মার্কেট-ভবনে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়। এসব তদারকি করে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শুধু সুপারিশে সীমাবদ্ধ না থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যেন নিতে পারে, সে জন্য নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে ইউজিসিকে পুনর্গঠনের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে